আমার দ্বিতীয় পরিচয়- আমি একজন মুসলমান:
আমার পরিবারের সকল সদস্যই ইসলাম ধর্মের অনুসারী এবং আমিও তাই। জন্মগতভাবেই জেনে এসেছি আমি মুসলমান এবং ক্রমান্বয়ে তা বিশ্বাস করতে শিখেছি এবং এখনও করি। অথচ ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয়েও মতাদর্শে ও চিন্তা চেতনায় ভিন্নতার কারণে আমি মুসলমান হয়েও 'সুন্নী' অন্য কেউ হয়তো 'শিয়া'। মূল আদর্শে তেমন কোন তফাৎ না থাকলেও বাহ্যিক আচরণে ও ধমর্ীয় অনুশাসনে মতবিরোধ রয়েছে। সুতরাং এখানেও পরিচয়ে ভিন্নতা।
ধর্ম নিয়ে আরও বিস্তর ভাগ ও ব্যবধান থাকতে পারে এবং আছে। যেমন কেউ হিন্দু হয়েও ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈষ্ণব, শূদ্র তথা কুলিন, হরিজন, নমশুদ্র বা অচ্ছুত হতে পারেন। কেউ বৌদ্ধ তথা ভিক্ষু বা অহিংসার ধারক বাহক হতে পারেন। কেউ খৃষ্টান হয়েও রোমান ক্যাথলিক অথবা ব্যপ্টিস্ট হতে পারেন। কেউ 'পোপ' হতে পারেন। কেউ শিখ হতে পারেন। কেউ ইহুদি হতে পারেন। কেউ অগি্ন উপাসক হতে পারেন। আবার কেউ কাফের বা নাস্তিক হিসেবেও আখ্যায়িত হতে পারেন। মোট কথা জন্ম, বিশ্বাস ও পারিবারিক নিয়মরীতি ও অনুশাসনের ভিত্তিতে যে কেউ পৃথিবীর প্রচলিত যে কোন ধর্মের অনুসারী হতে পারেন আবার পুরোপুরি ধর্মের বাইরেও থাকতে পারেন। ধর্মবোধ, ধর্মচিন্তা, ধর্ম পালন অনেকের কাছেই সম্পূর্ণ বিশ্বাসের ব্যাপার। অবশ্য ধর্ম মানেননা বা ধর্মে বিশ্বাস নেই এমন লোক বা গোষ্ঠির সংখ্যা খুব কম।
আফ্রিকার আদিমতম সমাজ যারা সভ্যতার আলো দেখেনি বহুকাল তাদের মাঝে কোন ধমর্ীয় চেতনা ছিল কিনা এ নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ আছে। তবে তাদের মধ্যে যে কিছু কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাস ছিল তা প্রমানিত সত্য। তাই আধুনিক সমাজে ধমের্র বিচারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা অনেক কম। আদিবাসীদের বেলাতেও তাই। কিন্তু সংস্কৃতি ও কৃষ্টির বিচারে তাদের নিজস্ব পরিমন্ডল স্বতন্ত্র মাত্রাযুক্ত। পশু শিকারের অস্ত্র বানানোর কৌশল থেকে মুখে ও গায়ে রঙের ব্যবহার সবকিছুই আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ধর্ম সেখানে গৌণ ও সম্পূর্ণভাবে গোষ্ঠির নিজস্ব চিন্তা চেতনার ব্যাপার ছিল। ধর্মচিন্তামুক্ত বা ধর্মে সম্পূর্ণ অজ্ঞ কোন জাতিকে বিধমর্ী বলা নিয়েও সংশয় থাকতে পারে। এখানে ধর্ম শিক্ষার বিষয়টাও বেশ গুওুত্বপূর্ণ। যে মানুষ ধর্ম কি সেটাই জানেনা তাকে বিধমর্ী বলি কিভাবে। জংলী, অসভ্য, বর্বর ও বিধমর্ী এক কথা নয় বলেই মনে হয়।
পরিবেশ, পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটের ভিন্নতায় আমি মুসলমান না হয়ে অন্য যে কোন ধর্মের অনুসারী হতে পারতাম। আমার মন মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা ও ভাবনা বদলে যেতে পারত। ভারতবর্ষ যদি কোনদিন মোঘলদের বা মুসলমান শাসনাধীন না হতো তবে আমি, আমার পিতা বা পিতামহ কোনদিনই হয়তো মুসলমান হতাম না। মূল কথা মানুষ তার সামাজিক বা সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল অনুযায়ী তার চিন্তা-চেতনা, ধ্যন-ধারণা, বিশ্বাস ও আদর্শ এমন কি মতা তাকে ধর্মের প্রতি আনুগত্য, অধিকার বা সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট করে। ধর্মের অন্তর্নিহিত মর্মবাণী যে কোন মানুষকে সেই ধমের্র প্রতি অনুরক্ত বা ধমর্ীয় শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে। মানুষ আদিকাল থেকেই নিজেদের বিভেদ, বৈষম্য ও মত পার্থক্য ভুলে চিরাচরিত ধমর্ীয় শৃঙ্খল থেকে অবমুক্ত হয়ে ধর্মকে একটা উন্নত জীবন ব্যবস্থার নিয়ামক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। সেই কারণে অনেক মহাপুরুষকে তাঁদের জীবন আত্মাহূতি দিতে হয়েছে। আধুনিক ধর্মব্যবস্থা তারই একটা পরিশীলিত রূপ।
আমার জন্ম মুসলিম পরিবারে। জন্মসূত্রে আকিকার পর একটা নাম বা পদবী পেয়েছি। পারিবাবিক রীতি, নীতি ও অনুশাসন অনুযায়ী আমি ইসলাম ধর্মের অনুসারী। আমার মত অন্যান্য ধর্মের মানুষেরাও ঠিক একই রীতি ও নিয়ম অনুসরণ করে আসছেন। এই প্রচলিত ধারাতেও অনেক সময় ব্যতয় বা বিচু্যতি ঘটে । এটা সম্পূর্ণ কারও নিজস্ব চিন্তা চেতনা, ভাবনা ও বিশ্বাসের তাগিদে। এজন্যে সরাসরি কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠিকে দায়ী করা যায় না। আমাদের চিরাচরিত সমাজ ব্যবস্থায় অনেক হিন্দু ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান বা খৃষ্টান হচ্ছেন। অনেক খৃষ্টান মুসলমান হচ্ছেন। আবার অনেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা ধমর্ীয় অনুশাসন থেকে বেরিয়েও যাচ্ছেন।
ধরুন আজ আমি কারও অবৈধ সন্তান। আমার পিতা মাতার পরিচয় জানা নেই। যেহেতু আমি মানব সন্তান সেহেতু মনুষ্য সমাজে আমার ঠাঁই হলো। কোন এক এতিমখানায় আমি বড় হতে লাগলাম। এখানে আমার কোন ধর্ম নেই, জাত নেই- আমার পরিচয় একটাই আমি এক মানব সন্তান। এখন কেউ যদি আমাকে তার সন্তান হিসেবে পালক বা দত্তক নেয় তবে যার ছত্রছায়ায় আমি মানুষ হবো। তার পরিচয়ই হবে আমার পরিচয়।
তার ধর্মই হবে আমার ধর্ম। আমি সেই একই মানুষ, শুধু স্থান কাল পাত্রে আমার পরিচয় ভিন্ন। এক্ষেত্রেও আমার প্রথম পরিচয় মানুষ কিন্তু অনঢ় এবং অক্ষত।
চলবে__
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



