আমার আব্বা, চার চাচা ও এক ফুফু মিলিয়ে ওনারা মোট ছয় জন। পাঁচ ভাই এক বোন। আমার আব্বা মেজ। একমাত্র ফুফুকে বেশীদিন কাছে পাইনি। বর্তমানে মাত্র ছোট দুই চাচা জীবিত। আমাদের বংশে এমনিতেই মেয়ের সংখ্যা খুব কম। চাচাতো জেঠাতো সব মিলিয়ে বোনের সংথ্যা মোট 7 জন। সেই তুলনায় ভাইদের সংখ্যা 27 জন। তাই বোনদের আদরের কোন ঘাটতি ছিল না। আমার এক চাচাতো বোন, নাম রুবি। রুবি আমার সেজ চাচার বড় মেয়ে। শহরে মেয়েদের লেখাপড়া করার সুযোগ বেশী। তাই আব্বা গ্রাম থেকে ওকে শহরে নিয়ে আসে সেই অল্প বয়েসে। সেজ চাচা বলতে গেলে রুবিকে দত্তক হিসেবেই দিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের সংসারে মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। সেই থেকে রুবি আমাদের সাথে। রুবি আমার চাইতে দুই বছরের বড়। নাম ধরেই ডাকতাম। বিপদে না পড়লে কখনই আপা বলে ডাকতাম না। ছোটবেলা থেকেই ও আমাদের সংসারে। আমাদের সাথেই বড় হয়েছে। কখনই চাচাতো বোন মনে করিনি নিজের বোন মনে করতাম। ওর সাথে আমার প্রায়ই লেগে যেত। শুধু আমার না, আরও অনেকের সাথেই লেগে যেত। কারণ ও ছিল খুবই খুঁতখুঁতে স্বভাবের। মানুষের কোন খুঁত ওর চোখ এড়াতো না। আর এই খুঁত চচর্ার ব্যাপারে সে তার নিজের রূপ বা প্রসাধন চর্চার চেয়েও বেশী যত্নবান ছিল।
রুবি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর আর পড়াশুনার ধার দিয়ে যায়নি। দুই এক বছরের মধ্যেই বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ে হয় আমাদের এক আত্মীয় ব্যবসাযী ছেলের সাথে। বিয়ের পর থেকেই সে ময়মসিংহ শহরে স্বামীর বাড়ীতে স্থায়ী ভাবে অশ্রয় নেয়। বিয়েটা আমার বা্বা ঠিক করে দেন। আমার আব্বা সাংঘাতিক দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন এই মেয়ের জন্য কেমন পাত্র দরকার। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই মেয়ে যেন তেন ঘরে যেয়ে টিকতে পারবে না। কারণ তার থুঁত খুঁতে স্বভাব। একটা কথা প্রচলিত আছে মানুষ নাকি মরলেও তার স্বভাব বদলায় না। কয়লা ধুলে ময়লা যায়না আর কি। রুবি আপাও ঠিক সেই রকম।
যাই হোক, আমার সেই বোন বর্তমানে তিন সন্তানের মা। আগেই বলেছি তার স্বভাব হলো মানুষের থুঁত ধরা। তা যা নিয়েই হোক। খুঁত যদি সে না খুঁজে পায় তবুও তার অশান্তির শেষ নেই। কেন থুঁত নেই এই ভেবে খুঁতখুঁতানির জ্বালায় ঠিক মত রাতে ঘুমও হয় না। মনের ভেতর রীতিমত একটা খুঁত খুঁতানি ভাব থেকেই যায়। তার স্বামী মানে আমার দুলাভাই খুব ভাল মানুষ। বেচারা সব কিছু মুখ বুজে সয়ে যেতেন। উপায় ছিল না বলেই সইতে হতো। উপায় নেই, কারণ আব্বাকে সে যমের মত ভয় করতো। আর বিয়েটা যেহেতু আব্বাই দিয়েছেন তাই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। হোক সে আমার বোন, অমন বউ আমার ঘরে থাকলে হয় সন্নাসী হতাম নয়তো বৈরাগ্য সাধনে লিপ্ত হতাম। সেটা না পারলে বউকে বনবাসে (বাপের সংসারে ফেরৎ) পাঠিয়ে সংসারের পাট চিরতরে চুকিয়ে দিতাম। আবার এমনও হতে পারতো দেখা যাচ্ছ স্ত্রী হত্যার দায়ে জেলের ঘানি টানছি।
নাহ্ আমার দুলাভাইয়ের বেলায় এসব কিছুই হয়নি। হওয়ার সুযোগ দেননি। যা হওয়ার সেটা খোদা তাঁর নিজের পেয়ারা বান্দা হিসেবে নিজেই করে ফেলেছেন। তিনি তাঁর নিজের কাছে নিয়ে গেছেন। বেচারা দুলাভাই, বউয়ের কাছে মনে হয় নিজের প্রাপ্তির হিসেবটা খুব যত্নসহকারে করে রেখে দিয়েছিলেন। তাই নিজের ছেলেদের ও ছেলের বউদের কি দুর্গতি হবে এই কথা আগাম ভেবে নিজেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। আল্লাহ ওনার প্রতি রহমত নাজেল করুন।
অথচ সেই অসহ্য বোনের (আল্লাহ্ মাফ করুন) নিজের মধ্যেই একশ একটা খুঁত ছিল। পড়া লেখায় তেমন ভাল ছিল না। ঘষে মেজে ইন্টারমিডিয়েট পাশ। দেখতে অবশ্য কিছুটা ভাল হলেও বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মত মোটা কিসিমের একটা ফিগার। মোটামুটি রান্নাটা একটু ভাল পারতো আর তাতেই অহংকারে মাটিতে পা পড়তো না। আর এই রান্নাটাও আমার মায়ের কাছ থেকেই শেখা। কারণ আমার মা ঢাকার মেয়ে। রান্নার হাত খুব ভাল। যা দৈবক্রমে আমিও কিছুটা পেয়েছি। পরিবারের সবাই আম্মার হাতের রান্ন্ার প্রশংসা করতো। পরিবারের বাইরের লোকেরাও প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতো। অথচ এই রুবি আপা খেতে বসলেই প্রতি ওয়াক্ত মাকে কিছু না কিছু বলতোই। চাচী আজ লবনটা একটু বেশী না হয় কম, চাচী আজ ঝালটা একটু বেশী না হয় কম। চাচী আজ মাংশটা ভাল সেদ্ধ হযনি, চাচী আজ তরকারির রঙটা বেশী সুবিধের হয়নি ইত্যাদি ইত্যাদি। ভলতেই থাকতো। মা বিরক্ত হতো না। বলতো তুই করে খাওয়াইস। অথচ আমাদের কারও মুখেই রান্নার স্বাদে এতটুকু তফাৎ ধরা পরেনি। এই হলো রুবি আপা। আপন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। উনি কদাচিৎ আমার বাসায় বেড়াতে এলে আমার বউ কখনই রান্না ঘরে পা দেবে না। বলে হোটেল থেকে কেনা খাবার আনো নয়তো নিজে রান্না কওে খাওয়াও। অগত্যা রান্নার ঝামেলা আমার ঘারেই এসে পরতো। অগত্যা ভাইয়ের কষ্ট দেখে বোন হাত লাগাতো ঠিকই। এদিক দিয়ে আপা বেশ উদার মনের। ভাল বাজার পেলে কথা নেই।
কলেজে থাকতে অনেক ছেলেই আপাকে প্রেমের প্রস্তাব দিত। সুন্দর মুখ থাকার সুবাদে প্রেম হয়েও যেত। কিন্তু কদিন পর প্রেমিকপ্রবর ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি বলে সটান পৃষ্ঠপ্রদর্শনপূর্বক পলায়নপর দৃশ্যটা দেখতে না পাওয়ার দুঃখে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে থাকতো। প্রেমিককুল পলায়নের কারণ যথারীতি সেই খুঁত চর্চা। আপনার কানের কাছে যদি আপনার প্রেমিকা অবিরত খুঁতের প্রেমময় প্যাঁচাল একের পর এক উগলাতে থাকে তবে কাহাতক আপনি সরবতের তলার চিনির মত খিতানি হয়ে জমতে থাকবেন। বলুন, না পালিয়ে উপায় আছে।
ভাগ্যিস আমার বোনটা বেশীদূর লেখাপড়া শেখেনি। উপরন্তু কম্পিউটার চালাতেও জানে না। তার চেয়ে বড় কথা সে মোটেও খবর পায়নি যে এখানে এই ব্লগে অনেক রকম পরচচর্া করা হয়। খবর পেলে আমি নিশ্চিত সে সব কিছু যেভাবেই হোক রপ্ত করে এখানে আপনাদের খুঁতগুলো ঠিকই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিত। কারণ তার স্বভাবই হলো খুঁত ধরা। আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ আমার বোনের স্বভাবটা কি করে রপ্ত করলেন আমি ভেবে অবাক হয়ে যাই। মানুষের মত মানুষ আছে তাহলে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



