
সনজীদা খাতুন তখন ইডেন কলেজে কর্মরত ছিলেন । ইডেনের মেয়েরা 'নটীর পূজা' নামে একটা নাটক করেছিলো। সেই নাটকে একেবারে শেষের দিকে একটা গান ছিলো। তিনি ছাত্রীদের সেই গানটা শিখিয়েছিলেন। এর বাইরে নাটকের সাথে তাঁর অন্য কোনো সম্পৃক্ততা ছিলো না।
সম্পৃক্ততা না থাকলেও, এই নাটকের কারণে তাঁকে রংপুর কারমাইকেল কলেজে বদলি করে দেওয়া হয়। ইডেনের প্রিন্সিপ্যালের কাছে অভিভাবকরা এই মর্মে অভিযোগ করেছিলেন যে ছাত্রীরা ওই নাটকে ঘণ্টা বাজিয়ে পূজো করছে।
ঢাকায় পরিবার-পরিজন ফেলে রেখে সনজীদা খাতুন চলে যান রংপুরে। সেখানে তিনি যে বাড়িতে থাকতেন, সেই একই বাড়িতে রসায়ন বিভাগের তরুণ শিক্ষক কালাচাঁদ রায়ও থাকতেন। কালাচাঁদ বাবুর ছোট্ট সংসার। স্ত্রী মঞ্জুশ্রী আর এক মেয়ে সন্তান।
একাত্তর সালের মার্চ মাসে স্কুল কলেজ সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। সনজীদা খাতুন ঢাকায় ফিরে আসেন মার্চ মাসের দশ তারিখে। পঁচিশে মার্চ পাকিস্তান আর্মির ক্র্যাক ডাউনের পর সীমান্ত পেরিয়ে চলে যান ভারতে। অন্যদিকে কালাচাঁদ বাবু চলে যান গাইবান্ধায়। ভারতে যাবার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ ছিলো না। তিনি মনে করেছিলেন নকশাল আন্দোলনের কারণে পশ্চিম বঙ্গ অনিরাপদ জায়গা। এর চেয়ে দেশের মাটিতেই থাকা ভালো।
অল্প কিছুদিন পরে সরকার যখন সবাইকে কাজে যোগ দিতে বললো, তিনি রংপুরে ফিরে যান কর্মস্থলে। স্ত্রী আর বাচ্চাদের অবশ্য রেখে গিয়েছিলেন তিনি গাইবান্ধায়। কিন্তু, তাঁর স্ত্রী মঞ্জু স্বামীকে ছাড়া থাকতে পারবেন না বলে, তিনিও একদিন বাচ্চাদের নিয়ে রংপুরের দিকে রওনা দেন। এর পরই ভয়াবহ এক বিপর্যয় নেমে এসেছিলো তাঁদের জীবনে। এই দম্পতির ভাগ্যে কী ঘটেছিলো, সেটা সরাসরি সনজীদা খাতুনের লেখা "সাংস্কৃতিক মুক্তির সংগ্রাম" বই থেকে তুলে দিচ্ছি আমি। তিনি লিখেছেন,
“তখন আমি ছেলেমেয়েদের নিয়ে কলকাতায় কর্নফিল্ড রোডের এক বাসায় আছি। রাখি চক্রবর্তী এসেছিল দেখা করতে। চলে যাওয়ার সময় যখন তাকে এগিয়ে দিতে গেছি তখন হঠাৎ বলল, ‘মঞ্জুর খবর তো জানেন, কলকাতার কাগজেও বেরিয়েছে'।। বুকে হাত চেপে জিজ্ঞেস করলাম, কী? বলল, ‘পড়েননি? ওদের স্বামী-স্ত্রীকে নিয়ে গিয়ে দমদমার ব্রিজের কাছে গুলি করে মেরে পুঁতে রেখেছিল। মঞ্জুর কোমর পর্যন্ত নিচের দিকটা মাটিতে পোঁতা। ঊর্ধ্বাঙ্গে কোনো আবরণ ছিল না। পাশবিক অত্যাচারের পর হত্যা।' একমুহুর্তের জন্য জ্ঞান হারিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বালিকা কন্যার ঘাড়ে ঢলে পড়েছিলাম।"
কালাচাঁদ বাবুর কাছে যে কেমিকেলস পাওয়া গিয়েছিলো, যেটা মূলত জমিতে ব্যবহার করা সার। ওটা দেখেই পাকিস্তান আর্মি ভেবে নিয়েছিলো বোমা বানানোর সরঞ্জাম রয়েছে তাঁর বাড়িতে। এই অপরাধে তুলে নিয়ে যতে চেয়েছিলো তাঁকে। মঞ্জু তখন প্রবলভাবে বাধা দেন। তিনি স্বামীকে আঁকড়ে ধরে থাকেন। মঞ্জুর কাছ থেকে কালাচাঁদ বাবুকে আলাদা করতে না পেরে, দু'জনকেই তুলে নিয়ে যায় তারা।
শুধু কালাচাঁদ বাবু একা নন, তিনিসহ চারজন হিন্দু শিক্ষককে পাকিস্তান আর্মি সেদিন তুলে নিয়ে গিয়েছিলো। বাকি তিনজন হচ্ছেন, চিত্ত রঞ্জন রায়, সুনীল বরণ চক্রবর্তী এবং রাম কৃষ্ণ অধিকারী। পাকিস্তান আর্মিকে কারমাইকেল কলেজে ডেকে নিয়ে এসেছিলো ইসলামি ছাত্র সংঘ। এরা ছিলো জামায়াতে ইসলামির ছাত্র সংগঠন। এদেরই উত্তরসূরি হচ্ছে আজকের দিনের ইসলামি ছাত্র শিবির।
ওই সময় রংপুর জেলা ইসলামি ছাত্র সংঘের প্রেসিডেন্ট ছিলো এটিএম আজহারুল ইসলাম।
২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এটিএম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলো। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। সেই আপিলের রায় বের হয় ২০২০ সালের মার্চ মাসে। জুলাই মাসে তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন রিভিউ চেয়ে আবেদন করেন।
এই রিভিউ এর সিদ্ধান্ত সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে আসে এটিএম আজহারুল ইসলামের জীবনে। আদালতের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে কয়েক বছরেও সে রিভিউ এর ফলাফল আসে না। এর মধ্যে পালটে যায় সরকার। নতুন যে সরকার আসে, সেটা রাজাকার-বান্ধব সরকার। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সর্বসম্মতি ক্রমে সব অপরাধ অস্বীকার করে তাকে খালাস করে দেয়।
একাত্তরের সব দায় থেকে মুক্তি পেয়ে এই যুদ্ধাপরাধী থেমে থাকে না। সংসদ নির্বাচনেও দাঁড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের কৃতজ্ঞ জনতা তাকে ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য হিসাবেও নির্বাচিত করে ফেলে। যার বহু আগেই ফাঁসি হয়ে যাবার কথা ছিলো ঘৃণ্য অপরাধের কারণে, সেই লোক এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সংসদ ভবনে বসে দেশের মানুষের জন্য আইন প্রণয়ন করবে।
এই সংসদে শুধু এটিএম আজহারুল ইসলামই যে নির্বাচিত হয়েছে তা নয়, আরও চারজন যুদ্ধাপরাধীর পুত্রও নির্বাচিত হয়েছে। বাবার অপরাধে ছেলেদের দোষী করাটা ঠিক না। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশে যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বাবার অপরাধের জন্য সামান্যতম অনুতাপ নেই। তারা প্রত্যেকেই গর্বিত তাদের বাবাদের জন্য এবং বাবাদের আদর্শকেই তারা অন্তরে ধারণ করে।
গণতন্ত্রের যেমন অসংখ্য ভালো দিক আছে, তেমনি এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। জনগণের ভোটে বরাহ শাবকরাও নির্বাচিত হয়ে যেতে পারে এই রাজনৈতিক ব্যবস্থায়।
হায় আমার বাংলাদেশ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও করতে পারি না। তথাকথিত মানবতার দোহাই দেয়!
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


