somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী কারা

১১ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের সামনে সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কথা আসে। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী কি কেবল পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী?

আমার মনে হয়, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই আমাদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, আদিবাসী জনগোষ্ঠ এবং আদি জনগোষ্ঠী এই তিনটি ধারণাকে আলাদা করে দেখতে হবে।

পাহাড় মানেই আদিবাসী নয়, সমতল মানেই অনাদিবাসি নয়

কোনো জনগোষ্ঠী পাহাড়ে বসবাস করে বলেই তারা একটি ভূখণ্ডের একমাত্র আদি জনগোষ্ঠী হয়ে যায় না। একইভাবে সমতলে বসবাসকারী কোনো জনগোষ্ঠীকে কেবল সমতলে থাকার কারণে ঐতিহাসিকভাবে পরবর্তী আগন্তুক বলাও যুক্তিসঙ্গত নয়।

বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। আজকের রাষ্ট্রীয় সীমানা তৈরি হওয়ার বহু আগে থেকেই এই বদ্বীপ অঞ্চলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল। সময়ের সঙ্গে তাদের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, সামাজিক কাঠামো ও রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন ঘটেছে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আগমন, বসতি, স্থানান্তর এবং পারস্পরিক মিশ্রণের মধ্য দিয়েই বর্তমান বাংলাদেশের জনসমাজ গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ, আজকের বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ইতিহাসকে শুধু পাহাড়ের ইতিহাস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

তাহলে আদিবাসী বলতে কী বোঝায়? এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয়। আদিবাসী শব্দটিকে অনেকে সরাসরি যারা সবার আগে এখানে এসেছিল অর্থে ব্যবহার করেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক নৃতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় Indigenous Peoples ধারণাটি আরও বিস্তৃত। কোনো জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ভূমিসম্পর্ক, স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিচয়, নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্য এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এসব বিষয়ও বিবেচনায় আসে। তাই আদিবাসী শব্দের অর্থ কেবল প্রথম বসতি স্থাপনকারী নয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিতর্কমুক্ত নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়-এর অনন্য স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের বহু জাতিগোষ্ঠীকে Indigenous Peoples হিসেবে উল্লেখ করে। ২০২২ সালের জনগণনা অনুযায়ী এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬.৫ লাখ বলে IWGIA উল্লেখ করেছে একই সঙ্গে তারা বলছে, এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ সমতল জেলাগুলোতে বসবাস করে, বাকিরা চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে। এই তথ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর অর্থ হলো আদিবাসী পরিচয়কে শুধু পাহাড়ের সঙ্গে আবদ্ধ করা যায় না।

সমতলের জনগোষ্ঠীর ইতিহাস তাহলে কোথায়? বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলেও বহু স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ ঐতিহাসিক উপস্থিতি রয়েছে। সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, গারো, খাসি, হাজং, কোচ, মণিপুরি, রাখাইনসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী দেশের বিভিন্ন সমতল ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। সরকারি একটি উন্নয়ন সংক্রান্ত নথিতেও চাকমা, গারো, মণিপুরি, মারমা, মুন্ডা, ওরাঁও, সাঁওতাল, খাসি, কুকি, ত্রিপুরা, ম্রো, হাজং ও রাখাইনসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের বসতির মধ্যে ময়মনসিংহ, সিলেট, দিনাজপুর, রাজশাহীসহ সমতল অঞ্চলের কথাও বলা হয়েছে। অতএব, আদিবাসী মানেই পাহাড়ি এই ধারণা তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আবার উল্টো দিকটিও মনে রাখতে হবে এখানে আরেকটি ভুল করা যাবে না। সমতলে বসবাসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠীকে এক কথায় বহিরাগত বা পরে আসা জনগোষ্ঠী বলা যেমন ইতিহাসসম্মত নয়, তেমনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে কেবল পাহাড়ে এসেছে বলে তারা বহিরাগত এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। কারণ কোনো জনগোষ্ঠীর ইতিহাস কয়েক শতাব্দী বা কয়েক হাজার বছরের একটি সরল রেখা নয়। স্থানান্তর, যুদ্ধ, রাজনৈতিক পরিবর্তন, রাজ্য বিস্তার, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, অর্থনৈতিক প্রয়োজন, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসব কারণে মানুষ যুগে যুগে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গেছে।

তাই একটি জনগোষ্ঠী কোনো অঞ্চলে কখন থেকে বসবাস করছে, তার উত্তর বের করতে হলে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রমাণ দেখতে হবে। শুধু লোককথা, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা বর্তমান বসতির অবস্থান দিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস আসলে বহু জনগোষ্ঠীর ইতিহাস । আমরা যদি বাংলাদেশের ইতিহাসকে একটু বিস্তৃতভাবে দেখি, তাহলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় এ দেশ কোনো একক জনগোষ্ঠীর তৈরি নয়। বাংলা ভাষাভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী এই রাষ্ট্রের প্রধান জনসংখ্যাগত ভিত্তি। একই সঙ্গে বহু ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক পরিচয় নিয়ে এই ভূখণ্ডের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।

বাংলাদেশের সরকারি একটি বক্তব্যেও দেশটিকে সাংস্কৃতিক ও জাতিগত বৈচিত্র্যের দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের ইতিহাসকে বাঙালি বনাম পাহাড়ি অথবা আদিবাসী বনাম বাঙালি এমন সরল দ্বন্দ্বে নামিয়ে দেয়া উচিত নয়।

মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত অধিকার ও সহাবস্থান । একটি জনগোষ্ঠীকে আদি বা অনাদি প্রমাণ করার প্রতিযোগিতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো আজ তারা এই দেশের নাগরিক হিসেবে কী অধিকার ভোগ করছে এবং তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি ও ঐতিহ্য কতটা নিরাপদ?

সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬
৬টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

।।মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনার রাস্ট্রীয় জঙ্গীবাদ।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮


মাদার অব ড্রাকুলা হাসিনা ভারতের প্রযোজনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদেরকে দিয়ে জঙ্গী জঙ্গী নাটক মঞ্চস্থ করতো। বহিবিশ্বকে বোঝাতো দেশে ইসলামী জঙ্গী দিয়ে ভরে গেছে এবং সেই জঙ্গীরা ইউরোপ আমেরিকার ভয়াবহ ক্ষতি করবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=শরত তুই যাস নে ! =

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৩



ভ্যাপসা গরমে নাভিশ্বাস জীবনে কেবল বৃষ্টির হাপিত্যেশ,
মেঘ বলেছে আসবো আসবো আমার উদ্দেশ,
শুভ্র মেঘেদের নাচন
উত্তাপ হাওয়ায় যায় না আর বাঁচন,
তবুও স্নিগ্ধ আবেশ মনজুড়ে,
হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটা, বাজে পাতার বাঁশি সুরে।

বিকেলের হাওয়ায় দেহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

১ কোটি চাকরি: শর্ত প্রযোজ্য, মেধার প্রবেশ নিষেধ !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:২৫


ভোটের আগে বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে প্রথম আঠারো মাসেই এক কোটি মানুষকে চাকরি দেওয়া হবে। কথাটা শুনে দেশের বেকার তরুণেরা তো মহাখুশি, কেউ ভাবল সরকারি চাকরি হবে, কেউ ভাবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বে ঋণ খেলাপিতে বাংলাদেশ ১ নম্বর এবং দেশে ঋণ খেলাপিতে শীর্ষ ২০ জনের ১৯ জনই ওনাদের!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:০৫



শাস্ত্রীয় কথায় না গিয়ে সোজা কথায় কেউ ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করলে তাকে ঋণ খেলাপি বলা হয়। আপনি জানলে অবাক হবেন যে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির ১৯ জনই... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কি ডার্ক জাস্টিসকে ফলো করছেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:১০



ছোটবেলায় দেখা একটি টিভি সিরিয়াল তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিলো। একজন বিচারক যিনি দিনের বেলায় কোর্ট রুমে অপরাধের বিচার করতেন, আর, রাতেরবেলা আইনের ফাঁক -ফোকর গলে বেরিয়ে যাওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×