somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: বউ সাজা

০৩ রা এপ্রিল, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আরেফিন যখন আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল তখন আমি ভেবে দেখার জন্য দুদিন সময় নিয়েছিলাম।  জীবনের এতগুলো বছর আমি অনেক কিছু নিয়ে ভেবেছি, অনেক কিছু করেওছি কিন্তু বিয়ে শাদী নিয়ে কখনোই ভাবি নি, তাই ভেবে দেখবার জন্য আমার একটু সময় দরকার ছিল। দুদিন আমি খুব ভাবলাম- আমার জীবনদর্শন,  আমার জীবন, আমার কাজ আর আরেফিনকে নিয়ে। আমার জীবনদর্শন বলে নিজের জীবনে নিজের ভাললাগার বিষয়গুলোই মুখ্য-  অন্যকে ভাললাগানোর দায়িত্ব আমার না। অন্যের চোখে আমাকে ভাল দেখাবে, তাই  নিজেকে সুন্দর করার জন্য নানাভাবে আমাকে কেন চেষ্টা করতে হবে, নিজের সময় নষ্ট করে! বরং এই সময়টা আমি কিছু শেখার বা কিছু গড়ার কাজ করতে পারি। আমি সুদর্শনা নই। আমার গায়ের রঙ কালো,  নাক বোঁচা, চোখ দুটো  ছোট ছোট। কিন্তু এই নিয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্র খেদ নেই। বরং আমি খুশি এই ভেবে যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমার নিজেকে সুন্দর  দেখাবার চেষ্টায় সময় ব্যয় করতে হয় না!

আমার বয়স আটাশ বছর। জীবনে আমি খুব বেশি কিছু চাইনি তাই মনে হয় অপ্রাপ্তির চেয়ে আমার জীবনে প্রাপ্তিই বেশি। তিনবছর আগে স্নাতকোত্তর শেয করি। আমার রেজাল্ট খুবই ভাল ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়েই যোগ দিতে পারতাম কিন্তু আমার আরো বড় পরিসরে কাজ করার ইচ্ছা ছিল তাই একটা আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগ দিলাম। আরেফিনের সাথে আমার পরিচয় ছবি তুলতে গিয়ে। আমি যে ফটোগ্রাফি ক্লাবের মেম্বার আরেফিনও সেটার মেম্বার।  ছবি তোলার হাত আমার বেশ ভাল। আমি নানারকম ছবি তুলি, নিজের ছবিও তুলি যাকে আমি সেলফি না বলে বলি সেল্ফ পোরট্রেট।  আলো-আঁধার আর নানা রঙের মিশেলে আমার তোলা ছবিগুলো হয় চমৎকার - অনেকেই দেখে মুগ্ধ হয়। মুগ্ধ হয়েছিল আরেফিনও। ছবি নিয়ে আলোচনা দিয়ে আমাদের কথা শুরু- তারপর দিনে দিনে আমরা আরো নানা বিষয়ে কথা বলতে লাগলাম, দেখা গেল অনেক বিষয়েই আমাদের আগ্রহ  মিলে যায়। আমার দিক থেকে এটা শুধুই ভাল বন্ধুত্ব ছিল- কোনদিনও আরেফিনকে বিয়ের কথা ভাবিনি। হয়তবা অবচেতনে ভয় ছিল প্রত্যাখ্যাত হবার। তাই যখন আরেফিন প্রস্তাব  দিল তখন আমি এই সবকিছু গভীর ভাবে ভাবলাম। ভেবে স্থির করলাম ওকে বিয়ে করলে মনেহয় ভালই হবে। বাবা মাকে কথাটা জানাতেই তারা খুব খুশি। মা অবশ্য একবার বলে উঠেছিলেন,'ও যে বড্ড বেঁটে- লম্বায় তোর সমান হবে তো! '

তারপর  জোরে শোরে বিয়ের তোড়জোড়  চলতে লাগল। আমাদের  বাড়িতে বেশি কারণ আমি বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। বিয়ের কদিন আগে একদিন দুজনে নানা রকম কথা বলছি, এর মধ্যে বিয়ের শাড়ীর প্রসংগ এল। আমি বললাম,
-আমার পছন্দ অপরাজিতার মত নীল- আমি সেরকম নীল শাড়ি পড়ব।
- ওই রঙে তোমাকে আরো কালো দেখাবে। আরেফিন বলে উঠল।
কথাটা খারাপ লাগলেও আমি হাসলাম,
- বেশ তাহলে তুমিই বল আমি কোন রঙের শাড়ী পড়ব!
-তোমাকে তো সব রঙেই কালো দেখায়- আচ্ছা ম্যাজেন্টা পড়তে পার।

আরেফিন আর ওর পরিবারের কয়েকজনের সাথে গিয়ে ম্যাজেন্টা বেনারসি কেনা হল বসুন্ধরা সিটি থেকে। ওর মা আর অন্যরা চলে যাবার পর আমরা দুজন কফি খেতে গেলাম। আরেফিন বল্ল,

-এই তুমি কিন্তু বিয়ের দিন ফেমিনা থেকে সাজবে।

-আচ্ছা বাবা সাজব, কিন্তু ফেমিনা থেকেই কেন? আমি তো ভেবেছিলাম আমাদের পাড়ার বিউটি পার্লার থেকেই সাজব। যদিও সাজতে আমার ভাল লাগে না, তবুও।

-ফেমিনার কানিজ ভিনাস খুব ভাল বউ সাজান, একেবারে চেহারা বদলে ফেলেন। চোখে বড় বড় আইল্যাশ লাগিয়ে মুখে এমনভাবে রঙ লাগাবেন যে বোঝাই যাবে না তুমি এত কালো, তোমার চোখ বড় বড় দেখাবে-এমনকি তোমার নাকটাও খাড়া দেখাবে। কেউ তোমার আসল চেহারাটা বুঝতেই পারবে না


উত্তেজনায় আরেফিনের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল আমার পা দুটো মাটির মধ্যে দেবে যাচ্ছে। অনেকক্ষন আমি  কোন কথা বলতে পারলাম না।

-কি।হল,চুপ করে আছ কেন?

-একদিনের জন্য আমার অসুন্দর চেহারাকে সুন্দর করে কি হবে?পরদিন সকাল থেকেই তো  আবার আমি চিরকাল যেমন তেমন হয়ে যাব- -
তুমি তো জানই আমি আমার চেহারা লুকাতে পছন্দ করি না!

-দেখ, আমার আত্মীয়স্বজন,  বন্ধুবান্ধবরা সবাই বিয়েতে আসবে, তোমাকে দেখবে। আমি চাই না কেউ তোমাকে দেখে খারাপ মন্তব্য করুক। বোঝার চেষ্টা  কর, প্লিজ।

-কিন্তু আরেফিন, এটাতো একধরনের প্রতারণা। আমি দেখতে খারাপ অথচ আমাকে দেখাবে খুব সুন্দরী,  পারলারের কয়েকজন বিউটিশিয়ান আর কিছু রঙের কারসাজিতে! আমি সুন্দরী  বউ সেজে বসে থাকব, অতিথিদের সাথে কথা বলব আর সারাক্ষণ  নিজের কাছে মনে হবে যারা আমাকে দেখে মুগ্ধ হচ্ছে তাদের আমি ঠকাচ্ছি!  নিজের কাছে আমি খুব ছোট হয়ে যাব।

- খুব অদ্ভুত কথা বলছ! সব মেয়েই তো নিজেকে সুন্দর দেখাতে চায়।

-চাইতে পারে, কিন্তু তুমি তো জান আমি এসব পছন্দ করি না।তাছাড়া আরো কথা আছে। পারলারে সাজাবে সহকারীরা, কানিজ ভিনাস মাঝে মাঝে এসে কিছু টাচ দিয়ে যাবেন তার জন্য আমাকে দুপুর থেকে প্রায় চার পাঁচ ঘন্টা পারলারে থাকতে হবে, কানিজ রিনাসকে দিতে হবে ত্রিশ হাজার টাকা। এটা সময় এবং অর্থের অপচয়, আমি এটা কিছুতেই করব না।

- করবে না মানে,তুমি কি চাও সবাই আমাকে বলুক আমি একটা পেত্নী বিয়ে করেছি।

আরেফিন খুব রেগে গেল।আরেফিনের রাগ দেখেও আমি শান্ত থাকলাম।

-দেখ আরেফিন আমি যেমন আমি তেমনই থাকতে চাই। আমার হাইট পাঁচ ফিট তিন ইঞ্চি,  তুমিও পাঁচ ফিট তিন ইঞ্চি। আমি কি তোমাকে বলেছি হিলওয়ালা জুতা পরতে?

-আমি বর, ছেলেদের চেহারা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।

-ঠিকই বলেছ তুমি, আরেফিন। নিজেকে সুন্দর দেখাবার কোন দায় নেই তোমার। কিন্তু আমাকে সুন্দর না দেখালে তুমি মুখ দেখতে পারবে না। ভারী মুশকিল হল দেখছি।

-সেজন্যেই তো বলছি, ভাল করে সাজগোজ কোর, কেউ যেন চিনতে না পারে।

-ঠিক আছে,  আমাকে ভাববার জন্য একদিন সময় দাও।




সময় নিলাম, কিন্তু আসলে তো ভেবে দেখার আর কিছুই নেই। সিদ্ধান্ত তো নিয়েই ফেলেছি।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০১৭ রাত ৯:৩৩
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

শরিয়াতন্ত্রের নিষ্ঠুরতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও নৈতিক দেউলিয়াপনা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৭


পৃথিবীজুড়ে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা বাড়ছে। এই বিদ্বেষ শুধু ইসরায়েল বা তার পৃষ্ঠপোষক ডানপন্থী দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কানাডার মতো তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী এবং ফিলিস্তিনের প্রতি জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন থাকা আয়ারল্যান্ডের মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দিল্লির রাজপথে তরুণদের ‘জেনজি ২.০’ অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী রূপান্তরের নির্মম বাস্তবতা

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৮

ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে যা ঘটে গেল, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সত্যিই অভূতপূর্ব। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ জনতা পার্টির... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিমানবন্দরে নির্ঘুম রাত (সাময়িক পোষ্ট)

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৭

আমার এখানে বাজছে রাত প্রায় দুটা! এখনো জেগে আছি। জেগে থাকার শানে নুযুল হলো, আমি অনেকটা ফাইসা গেছি! হায়দার সাহেবের গানের মতো, "আমি ফাইসা গেছি, আমি ফাইসা গেছি মাইনকা চিপায়!"... ...বাকিটুকু পড়ুন

×