
"যাবা নাকি- মেয়ে দেখতে যাচ্ছি।"
খুব মন দিয়ে কাজ করছিলাম; কখন বস ফাহিমা ম্যাডাম সামনে এসে দাড়িয়েছেন খেয়ালই করি নি। কথা শুনে মুখ তুলে তাকিয়েই উনাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম।
"কোন মেয়েকে দেখতে যাচ্ছেন?"
"ওই যে, বাতেন একটা মেয়ে দেখতে গেল না, মেয়েটাকে দেখে ওর খুব পছন্দ হয়েছে, কিন্তু মেয়েটা নাকি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াবার সময় বাঁ হাত দিয়ে চেয়ার টেনেছে- তাই বাতেন ভাবছে মেয়েটার ডানহাতে কোন সমস্যা থাকতে পারে; আমাকে বলেছে যাচাই করতে। যাবে তো চল।"
আমি খুব উৎসাহের সাথে স্কেল,পেন্সিল গুছিয়ে বললাম,
"চলেন যাই।"
ফাহিমা ম্যাডাম আমার বস। সরকারি চাকরি বলে আমাদের সবারই আমরা সবাই রাজা অবস্থা, অফিসে শুধু জানিয়ে দিয়ে যখন খুশি বেড়িয়ে যাওয়া যায়, বসের সাথে তো বেরোতেই পারি। ফাহিমা ম্যাডাম অফিস আওয়ারে বের হন শুধু অফিসিয়াল কাজেই, এখন অবশ্য বেরোচ্ছেন ঘটকালি করতে। উনি দাপ্তরিক কাজে যতটা চৌকশ ততটাই চৌকশ ঘটকালিসহ আরো নানারকম কাজে। কি করে এতরকম কাজ সামলে সারাক্ষণ এমন সেজেগুজে ঝলমল করেন আমি ভেবেই পাই না। যারই পরিচিত বিবাহযোগ্য পাত্রপাত্রী আছে সেই ফাহিমা ম্যাডামের কাছে বায়োডাটা দিয়ে রাখে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, কলিগদের মধ্যে কতজনের যে জোড়া মিলিয়ে দিয়েছেন! এখন বাতেনভাইয়ের ঘটকালি করছেন, পাত্রী আমাদের অফিসের শফি ভাইয়ের ভাগ্নি- দিলখুশার একটা ব্যাংকে ভাল পদে সম্প্রতি জয়েন করেছে। বাতেনভাই আমাদের সংস্থাতেই অন্য অফিসে কাজ করেন; বুয়েটের গ্রাজুয়েট আর এআইটির মাস্টার্স করা বলে উনার বেশ অহংকার আছে। আড়ালে সবাই উনাকে মাংকি বলে ডাকেন- প্রাণীটির সাথে উনার অনেক মিল আছে সেজন্য। বাতেন ভাই এই মেয়েকে দেখেছেন ব্যাংকে গিয়ে, একাউন্ট খোলার উছিলায়। আমাদের অফিস থেকে ব্যাংকটা কাছেই- যেতে যেতে ম্যাডামকে জিজ্ঞেস করলাম,
"মেয়েটার ডানহাত যদি অকেজো হয় তাহলে ও চাকরি করছে কি করে?"
"আমিও তো তাই ভাবছি, কিন্তু খটকা মনে নিয়ে তো বাতেন বিয়ে করতে পারে না- দেখেই আসি কি ব্যাপার।"
ব্যাংকে পৌঁছে মেয়েটাকে খুঁজে বের করলাম। ম্যাডাম পরিচিতি দিলেন আমরা শফিভাইয়ের কলিগ বলে। মেয়েটা দেখতে খুব মিষ্টি, আমাদের সাথে কিছুক্ষণ হাসিমুখে কথা বল্ল, আপ্যায়ন করে ডানহাতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। ম্যাডাম নিশ্চিন্ত হলেন, এর হাতে কোন সমস্যা নেই। অফিসে গিয়ে বাতেনভাইকেও ফোন করে নিশ্চিন্ত করলেন। পরদিনই শফিভাইকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠানো হল। ভাগ্নির মাবাবা প্রস্তাব পেয়ে খুশি মনে রাজি হলেন কিন্তু ভাগ্নি নাকি সরাসরি প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে, বলেছে বাতেনভাইকে তার পছন্দ হয়নি! যখন শফিভাই ম্যাডামকে এসব বলছিলেন আমি সামনেই ছিলাম। দেখলাম ম্যাডামের মুখ মূহুর্তের জন্য ম্লান হয়েই ঠিক হয়ে গেল।
"বেশ বলেছে! রিজেক্ট করার অধিকার কি শুধু ছেলেদেরই একচেটিয়া নাকি!"
ম্যাডামের মুখ দেখে আমি অবশ্য বুঝতে পারলাম না উনি কি সত্যিই খুশি হয়েছেন নাকি ঘটকালির ব্যর্থতায় দুঃখ পেয়েছেন! এরপর আরো কয়েকবার ম্যাডামের ঘটকালি দেখলাম, আমারও খুব ইচ্ছা করত একটা ঘটকালি করতে। কিন্তু তখন আমার বয়স মাত্র বিশের কোঠায়, আবার বিয়েও হয়েছে বেশিদিন হয়নি- হয়ত এসব কারণে ঘটকালি করার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। অবশেষে সুযোগ এল অভাবিতভাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী সাইফ কোন কাজে মতিঝিলে এসে কাজ শেষে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। কথায় কথায় বল্ল ওর বড়ভাইয়ের জন্য পাত্রী দেখতে। ভাই ছয় ফিট লম্বা, তাই পাত্রী হতে হবে অন্তত সাড়ে পাঁচ ফিট; ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট, কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেয়েছে,তিনমাস পর ইংল্যান্ড যাবে পি এইচ ডি করতে। এই স্কলারশিপে বউয়ের খরচাও দেয় তাই সে চাচ্ছে বিয়ে করে বউ নিয়ে যেতে। বউটির শিক্ষাজীবন সমাপ্ত হলে ভাল, আর যদি মেরিট লিস্টে নামওয়ালা ভালছাত্রী হয় তবে খুবই ভাল। আমার মনে পড়ে গেল কদিন আগে কলিগ আকরাম ভাই দুঃখ করছিলেন ছোট বোন মিলির জন্য পাত্র পাচ্ছেন না বলে। মিলিকে আমিও দেখেছি, খুবই ভাল মেয়ে। ঢাবির বিজ্ঞান অনুষদের এক বিভাগে থেকে ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট হয়ে সদ্য পাশ করেছে কিন্তু উচ্চতা পাঁচ ফিট সাত ইঞ্চি বলে সবদিকে মানানসই পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না। সাইফকে মিলির কথা বল্লাম- শুনে ও খুব উৎসাহ দেখালাম । বল্ল আকরামভাইয়ের থেকে মিলির বায়োডাটা আর ছবি নিয়ে রাখতে- ও পরদিন এসে নিয়ে যাবে। আরো বল্ল ওর একমাত্র ভগ্নিপতিও আমাদের সংস্থাতেই কাজ করেন, বেশ উচ্চপদে। নাম বল্ল কিন্তু আমি চিনতে পারলাম না। সাইফ চলে যাবার পর আমি গেলাম আকরামভাইর কাছে। সব শুনে উনি মহাখুশি। কারণ সবদিক মিলিয়ে এমন যোগ্য পাত্র তো সহজে পাওয়া যায় না। আমি নিজের সাফল্যে নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেছি- এবার চললাম ম্যাডামকে নিজের কৃতিত্ব জানান দিতে। সব বললাম, সাইফের দুলাভাইয়ের নামও বললাম। ম্যাডাম হাসি হাসি মুখে সব শুনলেন, বললেন দুলাভাইকে উনি চেনেন, এছাড়া আর তেমন কিছু বললেন না। পরদিনই আকরামভাই ছবি আর বায়োডাটা এনে দিলেন কিন্তু সেদিন সাইফ এল না, তারপর দিনও এলো না- এলো সাতদিন পর ভাইয়ের বিয়ের কার্ড হাতে আমাকে দাওয়াত দিতে। পরদিন আসবে বলে আর কেন সাইফ এল না তা ভেবে আমি আকুল হয়েছি এই কয়দিন। যোগাযোগ করতে পারছিলাম না কারণ ওর বাড়ির ফোন নাম্বার জানতাম না, তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিল না।
আকরাম ভাই এরমধ্যে দুদিন জিজ্ঞেস করেছেন ওরা কিছু বলেছে কিনা- আমি শুকনা মুখে বলেছি, "সাইফ তো আর আসল না।"
ভেবেছিলাম ম্যাডাম কিছু জিজ্ঞেস করবেন, কিন্তু উনি মনে হয় ভুলেই গেছিলেন আমি যে উনাকে বলেছি আমি একটা ঘটকালি করছি। এখন সাইফের থেকে কার্ড নিয়ে বললাম,
" আমাকে একবার জানিয়ে দিলেই পারতে যে তোমরা অন্য মেয়ে দেখছ- তাহলে আমি আকরামভাইকে আগেই বলে দিতে পারতাম।"
সাইফ খুব অবাক হল, "কেন তুমি জান না এই বিয়ে ঠিক হয়েছে? তোমার ম্যাডামইতো ঘটকালি করেছেন, তাই আমি ভেবেছি তুমি জান।"
এবার আমি অবাক হলাম, "ম্যাডামতো তোমাকে চেনেনই না, উনি কিভাবে বিয়ে ঠিক করলেন?"
"আমাকে চেনেন না, কিন্তু আমার দুলাভাইকে তো চেনেন- উনি দুলাভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে বিয়ে ঠিক করেছেন, পাত্রী সম্পর্কে উনার বোনঝি হয়।"
"আমি কিন্তু ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট পাত্রী ঠিক করেছিলাম!"
"তোমার ম্যাডামও ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট মেয়েই ঠিক করেছেন। মেয়ে দেখে সবার খুব পছন্দ হয়েছে। তুমি কিন্তু অবশ্যই বরকে নিয়ে যেও।" আন্তরিকভাবে বল্ল সাইফ।
আর যাওয়া! আমার তখন মাথা ঝিমঝিম করছে, পিঠ টনটন করছে পিছন থেকে মারা অদৃশ্য ছুরির যাতনায়। আকরামভাইকে সব বললাম, উনি শুনে খুব হাসলেন, তারপর উলটা আমাকেই সান্ত্বনা দিলেন।
"এই নিয়ে মন খারাপ কোর না, যার যেখানে জোড়া বাঁধা আছে তার সেখানেই বিয়ে হবে, মিলির জোড়া নিশ্চয় অন্য কোথাও আছে।"
বৌভাতে অবশ্য গেলাম, ম্যাডাম তো গেলেনই। দুই পক্ষই ম্যাডামকে খুব খাতির করছিল আর ধন্যবাদ জানাচ্ছিল- দেখে আমার গা জ্বলে গেলেও জ্বলুনি লুকিয়ে রাখলাম, বসকে তো আর কিছু বলা যায় না! এরপর কদিন অফিসে কাজের কথা ছাড়া ম্যাডামের সাথে তেমন কথা বলিনা, এই বিয়ে নিয়ে তো একটা কথাও না। দশ পনের দিন পর একদিন যখন কাজ দেখাতে গেছি, দেখি ম্যাডামের খুব মনখারাপ। আমাকে বললেন,
" খুব চিন্তায় আছি।বিয়েটা মনে হয় ভেংগেই যাবে, ছেলের বাড়ি খুবই বিরক্ত হয়ে আছে মেয়ের উপর।"
" কেন ম্যাডাম, কি হয়েছে?"
"মেয়েটা সারাদিন শুয়ে শুয়ে বই পড়ে, ঘরের কোন কাজে হাত দেয় না, স্বামীর একটু যত্ন আত্তি করবে তাও করে না। ওরা ভাবছে এই মেয়েকে ইংল্যান্ড নিয়ে গেলে ছেলের যদি কোন কষ্ট হয়- তাই ডিভোর্স দেবার কথা উঠেছে।"
আমার খুব আনন্দ হল শুনে- হয়ত একেই বলে পৈশাচিক আনন্দ; ভাবলাম হোক ডিভোর্স, ম্যাডামের একটা শিক্ষা হবে। তারপর প্রতিদিন কাজ না থাকলেও ম্যাডামের রুমে যাই, ডিভোর্সের কি হল সেই খবর নেই। শুনলাম মেয়ের বাড়ি থেকে কয়েকটা দিন সময় চাইছে; মেয়েটার বই পড়ার নেশা কমিয়ে আনবার জন্য। ছেলের বাড়িও রাজি, কারণ বইপড়ার নেশা ছাড়া মেয়ের বাকি সবই ভাল- মেয়েটা খুব মিষ্টি স্বভাবের। একদিন দেখি ম্যাডাম খুব হাস্যময়ী, বললেন ব্যাপারটা মিটে গেছে। মেয়েটা বই পড়া কমিয়েছে, আর ছেলেপক্ষের এক মুরুব্বি মত দিয়েছেন কিছুটা সময় দিলেই মেয়েটা ঠিক "সংসারী" হয়ে উঠবে।
ডিভোর্স হল না, কিছুদিন পর সাইফের ভাই বউ নিয়ে ইংল্যান্ড চলে গেল। ইতিমধ্যে অবশ্য আমার সুবুদ্ধি ফিরে এসেছিল, বুঝতে পারছিলাম যে ডিভোর্স হলে মেয়েটার সাথে একটা বড় অন্যায় হত। বইপড়া কি বউ পেটানোর মত কোন দোষ যে একেবারে ডিভোর্সই দিতে হবে? যদি নতুন জামাই শ্বশুরবাড়ি গিয়ে সারাদিন শুয়ে শুয়ে বই পড়ত তাহলে কি মেয়ের বাড়ি থেকে ডিভোর্স চাইত? চাইত না। কেন তবে বিয়ের পর একটা মেয়েকে বাধ্য করা হয় তার ছোটখাট অনেক সখ বিসর্জন দিতে?
ছবি: গুগল
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ৯:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




