somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মা, তোমাকে

১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ৮:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




মা,ঘরের বাতি নিভিয়ে দিয়ে ল্যাপটপের আলোয় তোমাকে লিখছি। আমি জানি তুমি রাতে বারবার ওঠো, কখনো আমার ঘরের সামনে দিয়ে ঘুরে যাও; তখন দরজার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা গেলেই তুমি দরজায় টোকা দিয়ে বল, "ঘুমিয়ে যা বাবা।" আমি তখন বাতি নিভিয়ে বসে থাকি যেন তুমি ভাব যে আমি ঘুমিয়ে গেছি। আমার চোখের সুদূর কোনেও ঘুমের কোন লেশমাত্র থাকে না। মা, তুমি জানতেও পারো না নিদ্রাহীন তোমার ছেলের বুকের মধ্যে কত অনুভূতির জন্ম হচ্ছে, সমাপ্তিও ঘটছে। আজ আমি বাতি জ্বালাইনি,আজ এক বিশেষ রাত। আমি চাই আজ আমি একা বসে তোমাকে অনেক কথা বলব- তাই আজ আমি চাইছি না আমার কাজে কোন ব্যাঘাত ঘটুক। তাই আজ তোমার কাছে নিজেকে ঘুমন্ত প্রমাণ করতে বাতি নিভিয়ে বসে থাকা, আর চিঠি লিখে চলা।

ছোটবেলা থেকেই আমি তোমাকে বড্ড ভালবাসি মা, তোমার হাসিমুখ দেখতে আমি করতে পারি না এমন কোন কাজ নেই। মনে আছে মা, ক্যাডেট কলেজের এডমিশন টেস্টের আগে আমার জণ্ডিস হল, তুমি বললে পরীক্ষা দেবার দরকার নেই কিন্তু আমি অসুখ নিয়েই পরীক্ষা দিলাম আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে খুব ভাল করলাম। তোমার খুশি দেখে আমার ভাল লাগছিল, কিন্তু একই সাথে মনে হচ্ছিল এই সব কিছুই অর্থহীন। বাড়ি ছেড়ে ক্যাডেট কলেজে যেতে আমার দুঃখ বা আনন্দ কিছুই হয় নি, মনে হচ্ছিল এইসব কিছু আমার জীবনে ঘটছে না; যেন কোন এক একাকী বালকের জীবনে ঘটছে আর আমি কেবল দর্শক হয়ে দেখছি। তুমি যা চেয়েছিলে তাই হয়েছিল- ক্যাডেট কলেজে আমি পড়াশোনায় আর খেলায় সবার চেয়ে এগিয়েই থাকতাম। কিন্তু এত পেয়েও আমার কিছুতেই কিছু যায় আসত না। আমার অনেক বন্ধু ছিল, সবাই বলত আমি খুব নিরহংকার। আসলেই কি তাই? আসলে আমি একাকী,  উদাসীন।

এইচ এস সির পর যেখানেই পরীক্ষা দেই দেখি ভাল রেজাল্ট করে ফেলেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উনিশ হলাম- তোমাকে বললাম বুয়েটে আর ভর্তি পরীক্ষা দিব না। তুমিও রাজি হলে আর আমি ভর্তি হলাম ঢাবিতে। মা, এখানেও সেই একই ঘটনা ঘটল- আমি সব পরীক্ষায় প্রথম হই, অনায়াসে। প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা  acmICPC তেও আমি জিতে এলাম। কলেজের মত এখানেও আমি খেলাতে ভাল- আন্তঃবিভাগীয়  ক্রিকেট টুর্নামেন্টে আমি প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট! বন্ধুদের নিয়ে বানানো ব্যান্ডে আমি গিটারিস্ট - ইউটিউবে আমার বাদন সবাই মুগ্ধ। কিন্তু কেউ কখনো  জানে না আমার মনের ভেতর শুধু একটা বাদনই বাজে আর বলে চলে, "হেতা নয় হেতা নয় অন্য কোথা, অন্য কোনখানে!"

আমি যখন বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারছি, হাহা করে হাসছি কেউ জানতে পারছে না আমার বুকের ভেতর কোন ব্যথার রোদন বাজে; তুমিও বুঝতে পারনি মা যখন আমি থালা চেটেপুটে খেয়ে বলছি, "খুব মজার রেঁধেছ" আসলে তখন আমি খেয়ে কোন স্বাদই পাই নি! কি করব,  আমার শুধুই মনে হয় জীবনে যাই পেতে চেয়েছি তাই পেয়ে গেছি, জীবনে আর কিছুই করার নেই। জীবন কেমন একঘেয়ে অর্থহীন মনে হয়। দিনগুলো সব যেন পুনরাবৃত্তি। ভাল লাগে না কিছুই। তোমাকে বলতে গেলাম- তুমি বললে এসব চিন্তা বাদ দিতে। কিন্তু কি করে বাদ দেব সেকথা বললে না। আমি  শুন্যতার বৃত্তে বন্দী হয়ে থাকতে চাইনি কিন্তু কত জনকে বললাম তবু কেউ আমাকে এই বৃত্ত থেকে বের করে আনার জন্য সাহায্যের হাত বাড়াল না- কেউ না, কোন বন্ধু না, কোন কাজিন না। মরিয়া হয়ে একবার বন্ধুদের বলছিলাম আমার খুব ইচ্ছা করে উঁচু কোন জায়গা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মরে যাই কিন্তু নাকমুখ থেঁতলে গিয়ে বিভৎস দেখাবে বলে সেটা করি না। বন্ধুরা ভাবল আমি রসিকতা করছি, তারা খুব হাসল, তারপর বল্ল, "জিনিয়াসের চিন্তাভাবনাই আলাদা।" আরেকবার বললাম "আমার মাঝে মাঝে গলায় ফাঁসি দিয়ে মরে যেতে ইচ্ছা করে, কিন্তু তাতে জিব বের হয়ে খারাপ দেখাবে বলে মরি না।" এবারো বন্ধুরা ভাবল আমি মজা করছি, এবারো তারা হাসল খুব আর তারপর একজন বল্ল, " মুখে চওড়া টেপ পেঁচিয়ে নিস, তাহলে আর জিব বেরোবে না।" আমি তাদের এস ও এস পাঠিয়েছিলাম, তারা বুঝলই না।

এখন আমার ল্যাপটপে আমার প্রিয় গান বাজছে। খুব ভাল লাগছে মা। ফেসবুকে বন্ধুদের জন্য গানের কয়েকটা কথা লিখলাম, তোমার জন্যও লিখে দিলাম মা-

I tried so hard and got so far
But in the end it doesn't even matter.
I had to fall to lose it all
But in the end it doesn't even matter.

তোমার সবুজ ওড়নাটা তোমার ঘর থেকে নিয়ে এসেছিলাম বিকালেই। ওটা একহাত দিয়ে ধরে তোমাকে চিঠি লিখছি- মনে হচ্ছে তোমাকেই ছুঁয়ে আছি। টেপটাও আজই কিনেছি মা। এখন ওটা মুখে পেঁচাব- তারপর তোমার ওড়নাটা গলায় বাঁধব। যেতে যেতেও তোমাকেই ছুঁয়ে থাকব মা।


ছবি: অন্তর্জাল।


 
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ৯:০২
২২টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আইনের ঊর্ধ্বে কেউ না - সরকারের পদক্ষেপ প্রশংসনীয়

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৪৫




মিরপুর-১ রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে এমপি পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া সরকারের একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ বলেই মনে করি। তবে পদত্যাগের নির্দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেরারী বিকেল

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৫

বাংলা বর্ষপঞ্জীর ষষ্ঠ মাস, আশ্বিনের শুরু থেকেই দিনের ‘বিকেল বেলা’ টা আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে। আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আহ্নিক পরিবর্তনের ফলে প্রতিদিনের দৈর্ঘ্য একটু একটু... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধকারের রসায়নবিদ, Case File 02 — সিউলের অসমাপ্ত গুলি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৯


লেখকের নোট:
এই গল্পটি ১৯৭৪ সালের দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ঐতিহাসিক হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে পটভূমি হিসেবে নিয়ে নির্মিত সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম থ্রিলার। ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও ঘটনার পাশাপাশি প্রফেসর রেহান আশরাফ, তাঁর পরিকল্পনা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

নেভার গিভ আপ!!!: দেশের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের পিছনে বিনিয়োগ করুন, প্রধানমন্ত্রী!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৩

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আসসালামু আলাইকুম। আজ আমার খুব খুশির দিন হওয়ার কথা ছিলো। ব্রিটিশ একটি ভার্সিটিতে ৩য় বারের মতো মেন্টর হিসেবে সিলেক্টেড হয়েছি। এই আনন্দে বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজনদের নিয়ে পার্টি দেওয়ার কথা ছিলো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার মহাজাগতিক ভাবনাকে এআই আমার সেরা পোষ্ট হিসাবে সাব্যস্ত করেছে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:১২



মহাজাগতিক ভাবনা

মহাজগতের প্রথমের পূর্ব অবস্থান শূন্য। কারণ প্রথমের পূর্ব অবস্থান শূন্যই হয়ে থাকে।শূন্য অবস্থানে সীমাদাতা না থাকায় তাতে যা হবে তা’ অসীম হবে।সকল অসীম একত্রে মিলে এক হবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×