

অনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্র গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ - কথাটি বলেছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ লেবার পার্টির এমপি ক্রিস রিচার্ড ! সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় প্রশ্ন করা হয়েছিল কারা বেশি শক্তিশালী? আমলাতন্ত্র নাকি রাজনীতিবিদ! জরিপের ফলাফল থেকে জানা যায় জরিপে অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৬০ ভাগ লোক মনে করে বর্তমানে সবচেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে আমলাতন্ত্র। প্রশ্ন হইলো এই আমলাতন্ত্রের ছায়াতলে থাকা আমলারা আসলে রাজনীতিবিদদের তুলনায় কতটা শক্তিশালী? এই আমলাতন্ত্র কিভাবে সরকারকে প্রভাবিত করে নিজেদের সুযোগ সুবিধা বাগিয়ে নেন সেইটা আগে দেখা যাক ।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতায় আসেন অন্তরবর্তীকালীন সরকার। এই সরকারের প্রধান হলেন নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস। অভ্যুত্থানের প্রধান শক্তি ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসাবে বর্তমান সরকারে নিয়োগ পেয়েছেন তিনজন ছাত্র। কিছু রয়েছে সুশীল সমাজ এবং সর্বশেষ যাদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে তারা হচ্ছেন আমলারা ! খাদ্য উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ পিয়েছেন কেবিনেট সচিব আলী ইমাম মজুমদার, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন। জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা না রেখেও সরকারে আমলাদের নিয়োগ দেখে অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। কিন্তু সরকারের প্রধান ১/২ জন উপদেষ্টা ড. ইউনূস, আসিফ নজরুলরা অবশ্যই জানতেন বর্তমান সরকার কে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে আমলাতন্তের সাহায্য প্রয়োজন । তাই উপদেষ্টা পরিষদে আমলাদের উপদেষ্টা হওয়া খুব অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। সাধারণত আমলারা রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে থাকেন। এর বিনিময়ে পুরস্কার স্বরূপ তারা অবসর শেষে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ, রাজনীতি অথবা ব্যবসায়ী বনে যান রাজনৈতিক দলগুলোর আশীর্বাদে। অর্থাৎ আমলাদের চাকুরিকালীন আমলা পরিচয়, চাকুরি শেষে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী পরিচয় জনগণের জন্য একধরণের সমস্যা সৃষ্টি করেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে বিরাট শূণ্যতা দেখা যায়। মূলত আওয়ামী লীগের চাটুকার আমলারা শেখ হাসিনার পতনের পর অনেকেই পলায়ন করেছেন। সে সুযোগে প্রশাসনে চেয়ার দখলের জন্য উঠেপড়ে লাগেন বিএনপি-জামাত পন্থী বিগত ১৫ বছরে পদন্নোতি বঞ্চিত আমলারা। মূলত আলী ইমাম মজুমদার শুরুতে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারি হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো আমলাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য। সে সুযোগে আওয়ামী লীগের যে সব আমলা পালাতে পারেনি তারা লেনদেনের মাধ্যমে বঞ্চিত আমলাদের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলে তদবীর শুরু করে। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসে কালবেলা পত্রিকার প্রতিবেদন ' ডিসি নিয়োগে ঘূষ কান্ড' খবরের মাধ্যমে। এরপর একের পর প্রকাশ হতে থাকে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে অনিয়ম ও ঘুষকান্ড নিয়ে প্রতিবেদন! এক্ষেত্রে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোখলেসুর রহমান ও যুগ্ন সচিব জিয়াউদ্দিনের ফাঁস হয় মোবাইল স্কীনশট । স্কীনশট হতে দেখা যায় জনপ্রশাসন সচিব ডিসি নিয়োগের জন্য ৫ কোটি চেয়েছেন। কিন্তু যুগ্ন সচিব ১০ কোটি দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কাদের নিয়োগ দিতে হবে, কারা ঝামেলা করতে পারে, তাদের উপর অভিযোগ আসলে কার উপর দায় চাপাতে হবে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া এই ঘটনায় অন্য আরেকজন যুগ্ন সচিব আলী আযমের নাম ও বারবার উঠে আসে। পরে কালবেলার নিউজে এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় এবং বৈষম্য বিরোধী ছাত্র সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে যুগ্ন সচিব জিয়াউদ্দিন ও আলী আযমের বদলি করা হয়। কিন্তু রহস্যময় কারণে জনপ্রশাসন সচিব নিজস্ব পদে বহাল রয়েছেন। উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় প্রধান উপদেষ্টা এবং মাস্টার মাইন্ড মাহফুজ আলম কে নিয়ে। কিন্তু অজানা কারণে সে তদন্তের রিপোর্ট এখনও পাওয়া যায় নি। এছাড়া দুদকে জনপ্রশাসন সচিব, যুগ্ন সচিব সহ ৬৫ জনের বিরুদ্ধে দুদকে তদন্তের আবেদন করলেও তার কোন অগ্রগতি নেই।
সম্প্রতি দুদকের চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন দূর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত আমলা মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। বিগত দূর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সাংবাদিকদের অনুসন্ধান করতে বলেন। এছাড়া নিজের সম্পদের বিবরণ ৭ দিনের মধ্যে প্রকাশ করবেন বলে জানান। আবার বর্তমান সরকার ক্ষমতায় বসার পর সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণের জন্য বারবার সময় নির্ধারণ করে দেয়া হলেও আশানুরূপ সাড়া মিলছে না। আমলাদের হাতে রাখতে সরকার আমলাদের পরিবারের নাতি/নাতনী পর্যন্ত পেনশন পাবে এমন ঘোষণা দিয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনের পক্ষ হতে পূর্ণ সহযোগিতার পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ছাড় এবং পদন্নোতির ব্যবস্থা করে দিচ্ছে বর্তমান সরকার । একজন আমলা সেজন্য গর্ব করে বলেছিলেন , শেখ হাসিনা কিছু করতে পারেনি আর এই সরকার তো খুবই দূর্বল ! আমাদের কিছুই হবে না।
একটি সফল বিপ্লবের প্রধান লক্ষ্য থাকে পুরাতন সকল অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে শুভ শক্তিকে প্রতিস্থাপন করা। দ্বিতীয় লক্ষ্য থাকে আইনের শাসন সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু আমাদের বিপ্লবীরা অশুভ শক্তি হিসাবে শুধু শেখ হাসিনাকে খুঁজে পেয়েছে। বাকি অশুভ শক্তি গুলোকে চিনতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। আবার ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচারের বিতর্কিত রায় সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হওয়ার যে স্বপ্ন তাতে একটি কালিমা লেপন করে দিলো। কিন্তু আমাদের বিপ্লবীরা এসব বিষয় নিয়ে তেমন চিন্তিত বলে মনে হচ্ছে না। এভাবেই বিপ্লবের স্পিরিট বাংলাদেশে ধ্বংস হওয়ার পথে !


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

