somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাদ্দামের স্বপ্নের সুপারগান: কেন ব্যর্থ হল প্রজেক্ট ব্যাবিলন ?

২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৫ সন্ধ্যা ৬:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১৯৯০ সালের এক রাতে ব্রাসেলসের রাস্তায় যে গুলিবর্ষণ হয়েছিল, তা শুধু একজন বিজ্ঞানীর মৃত্যু ছিল ন। এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার এক নীরব যুদ্ধ। ইতিহাসে অনেক রাজা-বাদশাহর গল্প আছে যারা অসম্ভব স্বপ্ন দেখেছেন। কেউ পিরামিড বানিয়েছেন, কেউ দেয়াল তুলেছেন। কিন্তু সাদ্দাম হুসেইনের স্বপ্ন ছিল আরও ভয়ংকর: একটি দানবীয় কামান, যা শত্রুদের ভূমিতে মৃত্যু বর্ষণ করবে। কীভাবে একটি বৈজ্ঞানিক স্বপ্ন হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন এবং কেনইবা একটি সুপারগানের জন্য একজন নিরীহ বিজ্ঞানীকে প্রাণ দিতে হয়েছিল ?

১৯৮১ সালে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো ইরাকের পারমাণবিক চুল্লি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। সাদ্দাম হুসেইন তখন বুঝতে পারেন, প্রচলিত অস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলকে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তিনি তার উপদেষ্টাদের বলেন, "আমার এমন কিছু চাই যা ইসরায়েলের গভীরে গিয়ে আঘাত করতে পারবে, কিন্তু তারা আটকাতে পারবে না।" তখনই তার কাছে এক অদ্ভুত প্রস্তাব আসে: একজন কানাডীয় বিজ্ঞানী এমন একটি কামান বানাতে পারেন, যার গোলা ১০০০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়বে। শুনতে পাগলামি মনে হলেও সাদ্দাম আগ্রহী হন। তাকে জানানো হয়, এই কামানটি হবে প্রায় ১৫৬ মিটার লম্বা, যা একটি ফুটবল মাঠের চেয়েও বড়। এই ছিল তার খোঁজা সমাধান।

জেরাল্ড বুল ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম ছিলেন। তিনি জুল ভার্নের "From the Earth to the Moon" বইটি পড়ে স্বপ্ন দেখতেন যে রকেটের চেয়ে কামান দিয়েই সহজে মহাকাশে পৌঁছানো যাবে। ১৯৬০-এর দশকে তার একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প রাজনৈতিক কারণে বন্ধ হয়ে যায়, যা তাকে হতাশ করে। তবে তিনি জানতেন, একদিন সুযোগ আসবে। সেই সুযোগ আসে ১৯৮৮ সালে, যখন সাদ্দামের প্রতিনিধিরা তার কাছে এক অভূতপূর্ব প্রস্তাব নিয়ে আসেন যেখানে অসীম অর্থ এবং সর্বোচ্চ গোপনীয়তার বিনিময়ে এমন একটি কামান বানাতে হবে যা ইসরায়েলকে আঘাত করতে পারবে। বুল রাজি হয়ে গেলেন, কারণ এটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ।

প্রকল্পটি দুটি ধাপে শুরু হয়: পরীক্ষামূলক বেবি ব্যাবিলন এবং আসল দানব বিগ ব্যাবিলন। বিগ ব্যাবিলন ছিল ১৫৬ মিটার লম্বা, ১ মিটার ব্যাসের এবং ২১০০ টন ওজনের একটি বিশাল কামান, যার পরিসর ছিল ১০০০+ কিলোমিটার। এত বড় কামানের যন্ত্রাংশ কেনা সহজ ছিল না। বুল একটি জটিল নেটওয়ার্ক তৈরি করেন এবং ব্রিটেন, জার্মানি, ইতালি, সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে 'শিল্প যন্ত্রাংশ' হিসেবে কামানের অংশগুলো গোপনে অর্ডার করেন। কিন্তু ১৫৬ মিটার লম্বা একটি কামান লুকিয়ে রাখা অসম্ভব ছিল। ইরাক দাবি করে এটি 'মহাকাশ গবেষণা প্রকল্প' হলেও, গোয়েন্দারা বোকা ছিলেন না।

ইউরোপীয় কাস্টমস কর্মকর্তারা সন্দেহজনক চালানগুলো লক্ষ্য করেন। একই সময়ে, সৌদি ঠিকাদার মোহাম্মদ বিন আওয়াদ বিন লাদেন (ওসামা বিন লাদেনের বাবা ) ইরাক-সৌদি সীমান্তে এই গোপন প্রকল্পের কথা জানতে পারেন। তিনি এই তথ্য ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কে দেন। ইসরায়েলের জন্য এটি ছিল জাতীয় নিরাপত্তার এক বিশাল হুমকি, কারণ এই কামান ১০০০ কিলোমিটার দূর থেকে ইসরায়েলের যেকোনো জায়গায় রাসায়নিক অস্ত্র বহনকারী ২ টনের গোলা নিক্ষেপ করতে পারত।

মোসাদ প্রথমে বুলকে সতর্ক করার চেষ্টা করে, কিন্তু তিনি এ সব উপেক্ষা করেন। শেষ পর্যন্ত মোসাদ তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় এবং 'অপারেশন বিগ পিনেস' শুরু করে। ১৯৯০ সালের ২২শে মার্চ, বুল নিজের ফ্ল্যাটের দরজায় পৌঁছালে পেছন থেকে একটা ছায়া এগিয়ে এল। তার সাথে ছিলো সাইলেন্সার লাগানো ৭.৬৫ মিমি পিস্তল। মাথায় তিনটি, গলায় দুটি গুলি। তাৎক্ষণিক মৃত্যু। হত্যাকারী নিঃশব্দে মিলিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে। পুলিশ এসে দেখল: ব্রিফকেসে ২০,০০০ ডলারের বেশি অর্থ অক্ষত, কোনো ডাকাতির চিহ্ন নেই এবং কোনো আঙুলের ছাপও নেই। এটা স্পষ্টত একটি পেশাদার হত্যাকাণ্ড।

সুপারগানের কিছু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল, যেমন: এটি একবার বসালে সরানো যেত না, নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে পারত না এবং লোড করতে অনেক সময় লাগত। তবে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতা। এত বড় একটি প্রকল্প সম্পূর্ণ গোপন রাখা সম্ভব ছিল না। আওয়াদ বিন লাদেনের তথ্য ফাঁস, ইউরোপীয় কাস্টমসের সন্দেহ এবং মোসাদের সতর্ক নজরদারি সব মিলে প্রকল্পটি ব্যর্থ হতে বাধ্য ছিল।

বুলের মৃত্যুর পর ইরাকি কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন যে প্রকল্পটি এখন অসম্ভব। এর কয়েক মাস পর, ব্রিটিশ কাস্টমস বিগ ব্যাবিলনের মূল অংশগুলো আটক করে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর জাতিসংঘের পরিদর্শকরা ইরাকে গিয়ে প্রজেক্ট ব্যাবিলনের সব অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করে দেন। সাদ্দামের স্বপ্নের সুপারগান কখনোই গুলি করেনি, কিন্তু এর জন্য যে মূল্য চোকাতে হয়েছিল, তা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল থেকে যাবে।

তথ্যসূত্র: Arms and the Man: Dr. Gerald Bull, Iraq, and the Supergun by William Lowther/ Bull's Eye: The Assassination and Life of Supergun Inventor Gerald Bull by James Adams/PBS FRONTLINE: "The Man Who Made the Supergun'' ।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৫ রাত ৮:৪৮
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আর্কাইভ থেকে: ঈশ্বর ও ভাঁড়

লিখেছেন অর্ক, ২৮ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:১০




বিরাট কিছু চাইনি। পরিপাটি দেয়ালে আচানক লেগেছিলো একরত্তি দাগ। কোনও ঐশী বলে মুছে যেতো যদি—ফিরে পেতাম নিখুঁত দেয়াল। তাতে কী মহাভারত অশুদ্ধ হতো কার! (সে দাগ রয়ে গেছে!)

পাখিদের মতো উড়বার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মতভেদ নিরসন ছাড়া মুসলিম আল্লাহর সাহায্য পাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:০৩



সূরাঃ ৩ আলে-ইমরান, ১০৫ নং আয়াতের অনুবাদ-
১০৫। তোমরা তাদের মত হবে না যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নিজেদের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি করেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘স্বপ্নের শঙ্খচিল’ কে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা….

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ৭:৪৬



আজ সকালে ল্যাপটপ খুলেই উপরের চিত্রটা দেখলাম। দেখে মনটা প্রথমে একটু খারাপই হয়ে গেল! প্রায় একুশ বছর ধরে লক্ষাধিক ব্লগারের নানারকমের বৈচিত্রপূর্ণ লেখায় ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সমৃদ্ধ আমাদের সবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনু গল্প

লিখেছেন মোগল সম্রাট, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



(এক)
দশম শ্রেণির ছেলে সাদমান সারাদিন ফোনে ডুবে থাকত। বাবা-মা বকাঝকা করলে প্রায়ই অভিমান করে ভাত খেতো না। একদিন রাতে ঘরের দরজা বন্ধ। ভোরে দরজা ভেঙে সবাই স্তব্ধ। খবরের কাগজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের গল্প - ১০০

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫



আমার সাথে একজন সাবেক সচিবের পরিচয় হয়েছে।
উনি অবসরে গেছেন, ১০ বছর হয়ে গেছে। এখন উনি বেকার। কোনো কাজ নাই। বাসায় বাজার করেন অনেক বাজার ঘুরে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×