
গতকাল সমকালের একটা নিউজ পড়ে যে অবস্থা হয়েছে, তাতে রাতভর চোখে ঘুম আসেনি। বারবার একটাই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল—যদি সত্যি সত্যি এই ঘটনা ঘটে যায়, তাহলে তো পুরো দুনিয়ার বারোটা বেজে যাবে! সমকালের প্রতিবেদনে যা লেখা ছিল, তা পড়ে মনে হলো বিশ্ব রাজনীতি এখন আর রাজনীতি নেই, হয়ে গেছে একটা অ্যাকশন মুভির স্ক্রিপ্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনকে তুলে নিয়ে আসতে পারেন! এই কথাটা শুনে প্রথমে তো মনে হলো চোখে ভুল দেখছি কিনা, কিন্তু না, কাগজে সাদা কালো অক্ষরে লেখা। এটা যে কল্পনা করাও পাপের পর্যায়ে পড়ে, সেটা কি সমকাল জানে?
ভ্লাদিমির পুতিন কি নিকোলাস মাদুরোর মতো চুনোপুঁটি কেউ যে তাকে হুটহাট তুলে নিয়ে আসা যাবে? পুতিন হইলো গিয়ে বিগ ফিশ, সাগরের তিমি মাছ, যাকে ধরতে গেলে নিজেরই নৌকা ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কোনো বিশ্বাস নেই, এর মাথায় গন্ডগোল আছে, এ তো সবাই জানে। এদিকে আজকে দেখি ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রীও ভ্লাদিমির পুতিনকে অপহরণ করে নিয়ে আসতে চান! মানে, পুরো বিশ্বের মাথাই আউলা হয়ে গেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাদুরোকে তুলে নিয়ে আসার ঘটনায়। ট্রাম্প যখন মাদুরোকে তুলে আনার হুমকি দিয়েছিল, তখন সবাই ভেবেছিল এটা আরেকটা ট্রাম্পিয় বকবক, কিন্তু না, এই একটা ঘটনা পুরো দুনিয়ার নেতাদের মাথায় একটা আইডিয়া ঢুকিয়ে দিয়েছে। এখন সবাই নিজ নিজ শত্রুদের অপহরণ করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন, যেন এটা কোনো অনলাইন শপিং, ক্লিক করলেই ডেলিভারি চলে আসবে।
কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তব কি এক জিনিস? একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নিয়ে আসা মানে তো আর মুদির দোকান থেকে চাল-ডাল কেনা নয়। এর পরিণতি কী হতে পারে, সেটা কি কেউ ভেবে দেখছে? কিন্তু না, এখন তো ভাবনা-চিন্তা করার যুগ নেই, এখন তো অ্যাকশনের যুগ। এদিকে পাকিস্তানের মাথামোটা প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ট্রাম্পের কাছে আবদার জানিয়েছেন যাতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে তুলে নিয়ে আসে আমেরিকা। আমেরিকা মনে হয় পাকিস্তানের মামা লাগে, তাই মামার বাড়ির আবদার করছেন তিনি।
খাজা আসিফ হয়তো ভাবছেন, ট্রাম্প একবার মাদুরোর পেছনে লেগেছিল, এখন নেতানিয়াহুর পেছনে লাগাতে কী সমস্যা? কিন্তু ইসরায়েল আর ভেনিজুয়েলা কি এক? নেতানিয়াহুকে ছোঁয়ার চেষ্টা করলে তো মধ্যপ্রাচ্যে এমন আগুন লাগবে যে সেই আগুন নেভাতে আটলান্টিক মহাসাগরের পানিও কম পড়ে যাবে। কিন্তু এসব কথা খাজা আসিফের মাথায় আসবে কেন, উনার তো শুধু একটাই চিন্তা: ট্রাম্প যদি একবার করে দেয়, তাহলে তো হয়ে গেল।
এদিকে নেতানিয়াহু নিজেও ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখেছেন যে আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স নাকি ইরানের খোমেনিকে অপহরণ করে নিয়ে চলে গেছে। এই স্বপ্ন এত মধুর ছিল যে উহার নাকি স্বপ্নদোষ পর্যন্ত ঘটে গেছে। নেতানিয়াহু সকালে ঘুম থেকে উঠে হয়তো একটু হতাশ হয়েছেন যে এটা স্বপ্ন ছিল, বাস্তব নয়। কিন্তু আশা তো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, তাই না? তিনি হয়তো এখনও আশা করছেন যে একদিন না একদিন এই স্বপ্ন সত্যি হবে।
এত এত অপহরণ আর তুলে নিয়ে আসার ঘটনা দেখে আমাদের প্রিয় ব্লগার রাজীব নুরও স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন। তিনি দেখলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রফেসর ইউনূসকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। তিনি স্বপ্নের পুরো অংশ আমাদের সাথে শেয়ার করেননি, হয়তো বাকিটা একটু বেশি কল্পনাপ্রবণ ছিল। তিনি আরও দেখেছেন যে প্রফেসর ইউনূসকে সরিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতার মসনদে বসেছেন। এই দৃশ্য দেখে রাজীব নুর ঘুমের মধ্যে খুশিতে লাফ দিতে গিয়ে ধপাস করে বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছেন। হাত-পায়ে হয়তো একটু-আধটু চোট লেগেছে, কিন্তু তবুও তিনি আশা ছাড়তে রাজি নন। ব্যথা কী আর এমন বড় জিনিস? আশাই তো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, আর রাজীব নুর তো আশার ব্যাপারে এক্সপার্ট।
এদিকে ভারতেও অপহরণ আর তুলে নিয়ে আসার জ্বরে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে। বিজেপি বিরোধী একটি দল প্রার্থনা করেছে যাতে নরেন্দ্র মোদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তুলে নিয়ে যায়। এখন প্রশ্ন হলো, নরেন্দ্র মোদিকে ট্রাম্প তুলে নিয়ে গিয়ে কী করবে? এটা বোধগম্য হচ্ছে না। মোদি তো যোগব্যায়ামে এক্সপার্ট, হয়তো ট্রাম্পের ফিটনেস ট্রেনার হিসেবে নিয়োগ দেবেন। কিন্তু বিরোধী দলের লোকেরা এসব ভাবছেন না, তারা শুধু চাচ্ছেন মোদি যেন চলে যান। কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই।
এসব ঘটনা দেখে ডরে সৈয়দ কুতুবের হাঁটু কাঁপছে। বেচারা কুতুব হয়তো ভাবছেন, এই দুনিয়াটা কোন দিকে যাচ্ছে? একসময় যেখানে রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে কূটনৈতিক আলোচনা হতো, চুক্তি হতো, এখন সেখানে অপহরণের পরিকল্পনা হচ্ছে। কূটনীতি এখন আর টেবিলে চা খেতে খেতে আলোচনা নয়, এখন কমান্ডো অপারেশনের প্ল্যানিং।
পুরো বিষয়টা এতটাই অবাস্তব যে মনে হচ্ছে কোনো হলিউড মুভির স্ক্রিপ্ট পড়ছি। ট্রাম্প যখন মাদুরোকে তুলে আনার কথা বলেছিলেন, তখন হয়তো অনেকে হেসেছিল, ভেবেছিল এটা আরেকটা ট্রাম্পিয় ব্লাফ। কিন্তু এই একটা কথা পুরো দুনিয়ার নেতাদের মধ্যে একটা ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে গেছে। এখন সবাই ভাবছে, যদি ট্রাম্প পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না? ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভাবছেন পুতিনকে তুলে আনবেন, পাকিস্তানি মন্ত্রী ভাবছেন নেতানিয়াহুকে তুলে আনবেন, ভারতীয় বিরোধীরা ভাবছেন মোদিকে তুলে নিয়ে যাবেন, আর আমাদের রাজীব নুর ভাবছেন ইউনূস সাহেবকে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসিনাকে বসিয়ে দেবেন। এটা এখন আর রাজনীতি নয়, এটা একটা গ্লোবাল ফ্যান্টাসি লিগ হয়ে গেছে। সবাই নিজের ইচ্ছেমতো খেলোয়াড় বদলাতে চাচ্ছে, কিন্তু কেউ ভাবছে না যে এই খেলার নিয়ম কী, পরিণতি কী।
আসল কথা হলো, এই অপহরণ আর তুলে নিয়ে আসার ফ্যান্টাসি যতটা মজার মনে হচ্ছে, বাস্তবে ততটাই বিপজ্জনক। একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নিয়ে আসার চেষ্টা মানে একটা দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ, মানে যুদ্ধের ঝুঁকি, মানে আন্তর্জাতিক আইনের পুরোপুরি লঙ্ঘন। কিন্তু এসব কথা এখন আর কেউ শুনতে চায় না। এখন তো শুধু অ্যাকশনের যুগ, ভাবনা-চিন্তার যুগ নয়। ট্রাম্প একবার একটা কাজ করেছেন, এখন সবাই ভাবছে এটা একটা নতুন ট্রেন্ড। যেমন একসময় সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা চ্যালেঞ্জ ভাইরাল হতো, আর সবাই সেটা করতে শুরু করত। এখন রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে অপহরণ চ্যালেঞ্জ চলছে, দেখি কে কাকে তুলে নিয়ে আসতে পারে। পুরো ব্যাপারটা এতটাই হাস্যকর যে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

