
তারেক রহমান যেদিন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন, সেদিন একটু কৌতূহল হয়েছিল শুনবো বলে। উনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে তেমন উচ্ছ্বসিত ছিলাম না সত্যি বলতে, কিন্তু ভাবলাম দেখা যাক জাতির জন্য কোনো দিকনির্দেশনা আছে কিনা উনার কথায়। আশ্চর্যজনকভাবে তিনি অতীতের পুরোনো ক্ষত নিয়ে খুব একটা সময় নষ্ট করলেন না। বরং বর্তমানের সমস্যাগুলো নিয়েই বেশি কথা বললেন। একটা কথা বিশেষভাবে মনে ধরল, যখন বললেন "আমরা সবাই নিরাপদে বসবাস করতে চাই"।
এই নিরাপত্তার ধারণাটা নিয়ে আসলে আমাদের দেশে বেশ মজার একটা পারসেপশন কাজ করে। ব্লগার রাজীব নুরের মতো অনেকেই বলেন, বিগত সরকারের আমলে তো আমার কিছু হয়নি, যারা দেশের ক্ষতি করতে চেয়েছিল শুধু তাদেরই শাস্তি হয়েছে। কিন্তু তারেক রহমান যখন সবার নিরাপত্তার কথা বললেন, সেটা আলাদা একটা মাত্রা পেল। তিনি প্রতিবন্ধীদের কথাও বললেন, যারা প্রায় চল্লিশ লাখ মানুষ এই দেশে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তবে বেকারত্ব নিয়ে তেমন কিছু শুনলাম না। হয়তো তার আই হ্যাভ এ প্ল্যান এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে সেই উত্তর।
ইন্টেরিম সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টা যেন একটা জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার সশস্ত্র বাহিনীকে ২০৩০ সালের মধ্যে আধুনিকায়ন করার যে প্লান ছিল, তার সাথে এখন নতুন কিছু পরিকল্পনা যুক্ত হয়েছে। ইউটিউবাররা প্রায় প্রতিদিনই এসব নিয়ে ভিডিও বানাচ্ছেন। সবার একটাই কথা, বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতেই হবে। যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে সুপার পাওয়ারগুলো যেভাবে ছোট দেশগুলো দখলের ফন্দি আঁটছে, তাতে নিশ্চিন্তে বসে থাকার কোনো উপায় নেই। ভারত আর মিয়ানমার যে কোনো সময় বড় ধরনের ক্ষতি করে ফেলতে পারে। তাই আমাদের যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে সব আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র কিনতে হবে। জাপান, জার্মানি সবাই তো প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াচ্ছে, আর আমরা দিনে দিনে পিছিয়ে পড়ছি।
ইন্টেরিম সরকারের মনোভাবও ঠিক এরকমই মনে হচ্ছে। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে টাইফুন কিনছে, চায়না থেকে জে-টেন ফাইটার কিনছে, এখন আবার পাকিস্তানের কাছ থেকে জেএফ থান্ডার কেনার আলোচনা চলছে। এছাড়া চায়নার সাহায্যে ৬৮০ কোটি টাকা খরচ করে ড্রোন কারখানা বসানো হচ্ছে। তুরস্কের সাথে সম্পর্ক ভালো হওয়ায় তারাও বাংলাদেশে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করতে বেশ আগ্রহী। কিছুদিন আগে দেখলাম সবচেয়ে কম দরে তুরস্ক থেকে শটগান কেনা হয়েছে। এসব লেনদেনে যারা মধ্যস্থতা করে, তারা বেশ ভালো কমিশন পায় বলে শোনা যায়। আবেগতাড়িত বাংলাদেশি ভুয়া জাতীয়তাবাদীদের প্রচারণায় খুশিতে আটখানা, মনে করছে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের সামরিক বাজেট বাড়িয়ে আসলে লাভটা কতটুকু?
এই দেশের একটা বিশাল অংশ এখন তরুণ। বিগত সরকার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। ২০১৪ সালের পর থেকে পশ্চিমাদের বিনিয়োগ ক্রমেই কমতে শুরু করে। চায়না থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার কারণে সেই ঘাটতি তখন চোখে পড়েনি। এদিকে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মেগা প্রজেক্টের নামে সহজ সরল বাঙালিকে টুপি পরিয়ে রাখা হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ব্যাংক থেকে সরকারের ঘনিষ্ঠ লোকজন ব্যবসা সম্প্রসারণের নামে হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে। আইটি সেক্টরে নামকাওয়াস্তে বিনিয়োগ হয়েছে, কিন্তু সেটা কেবল নিজেদের আখের গোছানোর কাজেই ব্যবহৃত হয়েছে। কোনো মানসম্মত হোয়াইট কলার চাকরি তৈরি হয়নি।
বিগত ষোলো বছরে সেই ৪০ বছরের পুরোনো গার্মেন্টস আর প্রবাসী রেমিট্যান্স ছাড়া ডলার আয়ের আর কোনো নতুন উৎস সৃষ্টি হয়নি। ফ্রিলান্সিং থেকে কিছু ডলার আসলেও সেটা পর্যাপ্ত নয়। ফলে একটা বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী এখন ছোটখাটো ব্যবসা করে, ফুড কার্ট চালিয়ে কোনোমতে দিন পার করছে। কাজ করে খেতে হলে ঢাকায় আসতেই হয়। সব নাগরিক সুবিধা আর আয়ের সুযোগ নির্ভর করে ঢাকার উপর। এতে করে ঢাকার পরিবেশ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরটা এখন বসবাসের অযোগ্য একটা মেগাসিটি ট্র্যাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেকারত্ব আর উন্নত জীবনের আশায় মানুষ এখন অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। এসব দক্ষতাহীন মানুষ অবৈধভাবে গিয়ে বিদেশে বাংলাদেশের সম্মান নষ্ট করছে। ইংরেজি জানার প্রমাণ হিসেবে নকল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে আরও বড় ক্ষতি করছে। এতে করে যারা আসলেই মেধাবী শিক্ষার্থী, তাদের জন্য বিশ্বের দরজা ক্রমশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপে বাংলাদেশিদের জন্য সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সারা বিশ্বে এখন ডানপন্থীদের উত্থান হচ্ছে, উন্নত দেশের মানুষ উন্নয়নশীল দেশ থেকে আসা মানুষদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে। ইউরোপে অপরাধ আর উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশিদের জড়িত থাকার কারণে এই নেতিবাচক ধারণা আরও বেড়ে গেছে।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে বাংলাদেশের তরুণদের অংশগ্রহণ, পাকিস্তানে টিটিপির সাথে যুক্ত হওয়া, এসব ঘটনা বাংলাদেশের সম্মান ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। এদিকে আমেরিকার ট্রাম্পের শুল্কের ঝড়ে পুরো বিশ্ব ব্যবস্থা তোলপাড় হয়ে গেছে। অন্যান্য দেশ তাদের উপর শুল্ক কমানোর জন্য নেগোসিয়েশন করার সুযোগ পেলেও বাংলাদেশের জন্য সেই সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। ফলে আমরা আমাদের গার্মেন্টস শিল্পকে বিপদে ফেলে দিয়েছি।
বাংলাদেশের সামনে আরও বড় একটা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন। সেই সময় এখন দ্রুত এগিয়ে আসছে। ইউরোপ আর আমেরিকা শুল্ক সুবিধা কমিয়ে দেওয়ার কথা বলছে, কিন্তু আমাদের হাতে কোনো নতুন রপ্তানি খাত নেই। পণ্য বৈচিত্র্যকরণ নেই। তাই কোনো সুযোগই আমরা ধরতে পারছি না। সীমাহীন লুটপাট আর ডলার সংকটের কারণে এলএনজি আর এলপিজি গ্যাসের সংকট গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলপিজি গ্যাসের সংকটের কারণে ছোট ফুড কার্ট ব্যবসায়ী আর রেস্তোরাঁর মালিকরা তাদের ব্যবসা বন্ধ করার মুখে দাঁড়িয়ে গেছে। এসব সমস্যা দিন যত যাচ্ছে ততই বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত, তাই মানব সম্পদের সঠিক ব্যবহার না করতে পারলে দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তখন বিশাল সামরিক সক্ষমতা আর মনে সুখ দেবে না। এর প্রভাব সমাজ থেকে শুরু করে পরিবার পর্যন্ত পৌঁছাবে। জনঅসন্তোষ বাড়বে, ঘন ঘন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হবে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যেই এসব বিষয় নিয়ে তেমন কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। বরং তারা ইন্টেরিম সরকারের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর প্রতি সমর্থনই বেশি দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ অনেক কথাই বলবে, কিন্তু রাজনৈতিক দল যদি পপুলিস্ট চিন্তাভাবনা করে তাহলে দেশের মূল সমস্যা সমাধান তো হবেই না, উল্টো মানুষ উন্নত জীবনের আশায় অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে জীবন হারাবে। জালিয়াতি করে বিদেশে যাওয়ার কারণে একসময় ইউরোপ আর আমেরিকায় যাওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। ডলার সংকটে শিল্পকারখানা গড়ে না উঠলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, যার ফলে বাইরের শত্রুর চেয়ে নিজ দেশেই শত্রুর সংখ্যা বেড়ে যাবে। ঘন ঘন রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশকে বিনিয়োগের অযোগ্য করে তুলবে। তখন প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে আর কী লাভ হবে? মানুষ যদি পেটে ভাত না পায়, যদি কাজ না থাকে, যদি ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে, তাহলে কামানের গর্জন শুনে কি তারা শান্তি পাবে?
এই প্রশ্নটাই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গানস নাকি বাটার? অস্ত্র নাকি রুটি? নিরাপত্তা নাকি সমৃদ্ধি? এই দ্বন্দ্বটা কিন্তু নতুন নয়, পুরো বিশ্ব এই টানাপোড়েনে ভুগেছে। কিন্তু যেসব দেশ উন্নত হয়েছে, তারা জেনেছে যে মানুষই আসল সম্পদ। যে দেশ তার মানুষকে দক্ষ করতে পারে, শিক্ষিত করতে পারে, কর্মসংস্থান দিতে পারে, সেই দেশের প্রতিরক্ষা নিজে থেকেই শক্তিশালী হয়। কারণ একটা সমৃদ্ধ দেশকে রক্ষা করার জন্য মানুষ লড়বে, কিন্তু একটা দরিদ্র দেশে কামান কিনে রাখলেই তো হবে না, সেই কামান চালাবে কে? যে তরুণ খেতে পায় না, যার ভবিষ্যৎ নেই, সে কেন লড়বে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরের উপর। আমরা কি আমাদের তরুণদের কাজ দেব, নাকি তাদের হাতে বন্দুক তুলে দেব? আমরা কি কারখানা গড়ব, নাকি ট্যাংক কিনব? আমরা কি স্কুল বানাব, নাকি যুদ্ধবিমান আনব? এই সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে, কারণ সময় ফুরিয়ে আসছে ।
যে দেশ তার তরুণদের আইটি সেক্টরে লিডার বানাতে পারে না, যে দেশ তার বেকারদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সেই দেশ যদি হাজার কোটি টাকায় আকাশসীমা পাহারা দেওয়ার স্বপ্ন দেখে—তবে সেটা হবে একটি সুসজ্জিত কিন্তু অন্তঃসারশূন্য দুর্গ। মনে রাখতে হবে, সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক বোমায় সমৃদ্ধ ছিল, কিন্তু তাদের পতন হয়েছিল রুটির লাইনে দাঁড়ানো ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষোভ থেকে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের জানালা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের ধাক্কা খাওয়ার আগে, পুরো প্রজন্ম হতাশায় ডুবে যাওয়ার আগে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশ কি বেছে নেবে গানস, নাকি বাটার? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দেবে আমাদের আগামীর গল্প।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





