somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কৃষি ঋণ মওকুফ করলেই কি সব সমস্যার সমাধান হবে?

০১ লা মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলাদেশের রাজনীতিতে কৃষক একটি আবেগের শব্দ। নির্বাচন এলেই তাদের কথা মনে পড়ে, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছোটে, আর ক্ষমতায় গেলে কেউ কেউ সেই প্রতিশ্রুতি রাখেনও। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র দশ দিনের মাথায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের ঘোষণা দিয়েছে। প্রায় ১২ লাখ কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন, মোট ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা মওকুফ হবে। শুনতে দারুণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ঋণ মওকুফে কি সত্যিই কৃষকের জীবন বদলাবে, নাকি এটা শুধু একটি রাজনৈতিক প্রশমনের হাতিয়ার?

প্রথমেই বুঝতে হবে, এই টাকাটা কার। এটা সরকারের নিজের তহবিল নয়। এটা ব্যাংকের টাকা, যেটা মূলত সাধারণ আমানতকারীদের সঞ্চয়। যে রিকশাচালক প্রতি মাসে কয়েকশ টাকা ব্যাংকে রাখেন, যে গার্মেন্টস কর্মী বছরের পর বছর ডিপিএস করেন, তাদের টাকাই ব্যাংকের মূল পুঁজি। সরকার আসলে সেই সাধারণ মানুষের টাকা মওকুফ করে দিচ্ছে, অথচ তাদের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি, ব্যাংকগুলোর সাথে পরামর্শ হয়নি, এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকেও জানানো হয়নি।

এই শেষ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমান রাজশাহীর জনসভায় কৃষিঋণ মওকুফের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগ সব ব্যাংককে জরুরি ই-মেইল পাঠায়। চিঠিতে বলা হয়, বোর্ড অব ডিরেক্টরসের একজন সদস্যের জরুরি নির্দেশনার ভিত্তিতে এই তথ্য চাওয়া হচ্ছে। পরে জানা যায়, ওই নির্দেশনা দিয়েছিলেন পরিচালক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানতে চাইলে বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে, গভর্নরকে পাশ কাটিয়ে, একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ঘোষণার ভিত্তিতে এভাবে নির্দেশনা জারি হওয়া স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

তার চেয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছিল তখন, কারণ সেই মুহূর্তে নির্বাচনই হয়নি। তারেক রহমান তখনও রাষ্ট্রের কোনো সাংবিধানিক পদে ছিলেন না। একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এভাবে তৎপর হয়ে পড়লে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয় তা কেবল একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করে।

এরপর যা হলো সেটাও লক্ষণীয়। বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়। অর্থাৎ যে গভর্নর এই অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাকেই সরিয়ে দেওয়া হলো। বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বব্যাপী একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত, যার কাজ রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে দেশের মুদ্রানীতি পরিচালনা করা। কিন্তু এই ঘটনাক্রম দেখে মনে হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এখন কার্যত কাগজেই সীমাবদ্ধ।

এবার আসি মূল প্রশ্নে। ঋণ মওকুফ কি কৃষকের সমস্যা সমাধান করবে? উত্তর হলো, আংশিকভাবে এবং সাময়িকভাবে। যে কৃষক বছরের পর বছর ঋণের বোঝা বহন করছেন, তার মাথা থেকে সেই দায় নামলে মানসিক স্বস্তি পাবেন, ব্যাংক থেকে আবার ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু কৃষক কেন ঋণ শোধ করতে পারেননি সেই প্রশ্নের উত্তর ঋণ মওকুফে নেই। ফসলের ন্যায্য দাম নেই, মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, সেচ ও সার ও কীটনাশকের খরচ বাড়ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে কোনো বীমা নেই। এই কাঠামোগত সমস্যাগুলো থেকেই যাবে। ফলে আগামী দুই-তিন বছরে একই কৃষক আবার ঋণ নেবেন, আবার শোধ করতে পারবেন না।

ভারতের অভিজ্ঞতা এখানে শিক্ষণীয়। দেশটিতে বিভিন্ন রাজ্যে বারবার কৃষিঋণ মওকুফ হয়েছে। গবেষণা বলছে, কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদে কৃষকের হাতে কিছুটা নগদ এসেছে, আয় সামান্য বেড়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদের চিত্র হতাশাজনক। কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হওয়ায় কয়েক বছরের মধ্যেই একই কৃষক আবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। আরও বড় ক্ষতি হয়েছে ঋণ সংস্কৃতিতে। ব্যাংকগুলো ভাবতে শুরু করেছে, আবার মাফ হয়ে যাবে, টাকা ফেরত পাবো না। ফলে কৃষকদের নতুন ঋণ পেতে বেগ পেতে হয়েছে। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকও সতর্ক করেছে যে এই ধরনের ঢালাও মওকুফ ক্রেডিট ডিসিপ্লিন ভেঙে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে কৃষকের জন্যই ক্ষতিকর। এই চক্র বাংলাদেশেও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা যথেষ্ট বাস্তব।

আরেকটি নৈতিক সমস্যাও আছে। যে কৃষক কষ্ট করে, বাড়ির গরু বেচে, অনাহারে থেকে ঋণ পরিশোধ করেছেন, তিনি কিছুই পাচ্ছেন না। আর যিনি শোধ করেননি, তিনি পুরস্কৃত হচ্ছেন। এই বৈষম্য সৎ মানুষকে নিরুৎসাহিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধের সামাজিক সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই ঢালাও মওকুফে কি আদৌ কোনো যাচাই-বাছাই বা টার্গেটিং করা হয়েছে?

দশ হাজার টাকা পর্যন্ত সবার ঋণ মাফ করে দেওয়ার এই ব্ল্যাঙ্কেট সিদ্ধান্তে কি এমন কেউ নেই, যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ শোধ করেননি? প্রকৃত প্রান্তিক কৃষক আর সুবিধাবাদী ঋণগ্রহীতার মধ্যে পার্থক্য করার কোনো মেকানিজম বা স্বচ্ছ প্রক্রিয়া সরকার রাখেনি। ফলে রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ প্রকৃত অভাবীর চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে চতুর ও সচ্ছলদের পকেটেই বেশি যাবে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এমনিতেই সংকটে। খেলাপি ঋণ দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, আইএমএফ সংস্কারের শর্ত দিয়েছে, কিছু ব্যাংক আমানত ফেরত দিতেই হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার আরেকটি ধাক্কা দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য বাড়তি বোঝা।

সরকার যদি বাজেট থেকে ব্যাংকগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেয়, সেই টাকা আসবে করদাতাদের পকেট থেকে। না দিলে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদ কমাবে, ঋণের সুদ বাড়াবে — শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই বোঝা বহন করবেন, শুধু ভিন্ন পথে। নতুন টাকা ছাপানো হলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে, বিদেশি ঋণ নেওয়া হলে ঋণ-জিডিপি অনুপাত আরও খারাপ হবে। যেদিক থেকেই দেখা হোক, খরচটা সাধারণ মানুষের কাছেই ফিরে আসে।

এই পুরো চিত্রটি বলছে, ঋণ মওকুফের ঘোষণাটি যতটা সহজ শোনায়, তার অর্থনৈতিক পরিণতি ততটা সহজ নয়। একটি সিদ্ধান্তের ঢেউ ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু হয়ে মুদ্রানীতি, বৈদেশিক ঋণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাজনৈতিক সাফল্য আর অর্থনৈতিক দায়িত্বশীলতা এখানে সরাসরি সংঘাতে দাঁড়িয়ে আছে।

কৃষকের উন্নতি চাইলে ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা ঋণ মওকুফে না ঢেলে কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণে, সরাসরি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায়, ফসল বীমায় এবং সেচ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করলে কৃষক স্থায়ীভাবে লাভবান হতেন। একবারের জন্য নয়, বারবার। কিন্তু সেই বিনিয়োগে ভোট নেই, সেখানে জনসভার মঞ্চে বুকে হাত দিয়ে ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেই।

ঋণ মওকুফ হলো ব্যথানাশক ওষুধের মতো। রোগ সারায় না, কষ্ট সাময়িক কমায়। বাংলাদেশের কৃষির আসল রোগ হলো কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। বিএনপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে, কৃষক সাময়িক স্বস্তি পাবেন, কিন্তু পাঁচ বছর পরে যখন নতুন নির্বাচন আসবে, তখন হয়তো আবার একই মঞ্চে একই প্রতিশ্রুতি শোনা যাবে। কারণ মূল সমস্যার সমাধান হয়নি, শুধু তার উপর একটি ব্যান্ডেজ লাগানো হয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:০৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কুকুর হইতে সাবধান

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:০৫



বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০০ মানুষকে কুকুর কামড় দেয়।
অর্থ্যাত বছরে প্রায় দুই লাখের বেশি মানুষ কুকুরের কামড় খায়। কুকুর কামড় দেয় শিশু কিশোরদের সবচেয়ে বেশি। যাদের বয়স ১৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

খামেনি কি আছেন না গেছেন? ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের রাত!

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০১ লা মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


আমার মনে হয় না ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি জীবিত আছেন। এটা শুনে অনেকের মন ভেঙে যাবে জানি, তবুও এটাই সত্যি।


যে মাত্রার হামলা হয়েছে তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

বুকের ভেতর বটবৃক্ষ, পর্ব ৭ঃ বইমেলা ২০২৬

লিখেছেন সাজিদ উল হক আবির, ০১ লা মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:৪৩



সেদিন ইউনিভার্সিটিতে টানা দুটো ক্লাস নেয়া শেষ করে আপন মন শিস দিতে দিতে হাঁটছিলাম অফিস রুমের পথে। ইউনিভার্সিটিতে ছেলেপেলের মিড এক্সাম চলছে বলে এই ভর রোজায় গলা ফাটিয়ে লেকচার... ...বাকিটুকু পড়ুন

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মারা গেছেন

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০১ লা মার্চ, ২০২৬ ভোর ৪:৫৩


ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন বলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই দাবি করেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতের পর আমেরিকা-ইসরাইলকেও যেভাবে আমরা শায়েস্তা করতে পারি

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ০১ লা মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:১০






ইসরাইল-আমেরিকার যৌথ হামলায় ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুতে বাংলার আকাশ বাতাস আজ দুঃখে ভরাক্রান্ত, আজ সকালে তার মৃত্যুর সংবাদ প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের সমস্ত আলহামদুলিল্লাহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×