
আজ বাদে কাল ঈদ। ঈদ-উল-ফিতর প্রতি বছর আমাদের জীবনে নতুন নতুন অনুভূতি নিয়ে ফিরে আসে, তবে এই আনন্দের জোয়ার সবচেয়ে বেশি আছড়ে পড়ে শিশু-কিশোরদের মনে। সেই ছোটবেলার কথা মনে পড়লে এখনো অদ্ভুত এক শিহরণ জাগে ; নতুন জামা আর নতুন জুতোর প্রতি কী প্রবল আগ্রহই না ছিল তখন! মনে পড়ে, নতুন পোশাক কিনলে খুব সাবধানে লুকিয়ে রাখতাম, এই ভয়ে যে কেউ দেখে ফেললে বুঝি জামা-জুতো পুরনো হয়ে যাবে।
ঈদের দিন সকালে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেমাই খাওয়া আর বড়দের কাছ থেকে সেলামি পাওয়ার সেই আনন্দের কোনো তুলনা ছিল না। সেলামির টাকা জমিয়ে কী কী কিনব, সেই পরিকল্পনা শুরু হয়ে যেত ঈদের দিন সকাল থেকেই। কিন্তু অদ্ভুত এক নিয়ম মেনে মানুষ যত বড় হয়, এই চেনা ছকগুলো ততই ছোট হতে থাকে। এক সময় যখন নিজে উপার্জন করতে শিখলাম, তখন থেকেই সেলামির প্রতি সেই তীব্র আকর্ষণটা কমতে শুরু করল - কবে যে নিজে সেলামি গ্রহীতা থেকে দাতা হয়ে গেলাম, তার হিসাব রাখার সুযোগটুকুও পেলাম না।
আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ঈদের স্মৃতিগুলো জড়িয়ে আছে চট্টগ্রামে। সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে আজও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি ; স্কুলের ম্যাডামদের বাসায় গিয়ে পর্যন্ত সেমাই খেয়েছি। অথচ ঢাকা আসার পর সেই চিরচেনা ঈদের আমেজটা আর কখনোই সেভাবে ফিরে পাইনি। আসলে এক পরিবেশ থেকে অন্য পরিবেশে এলে মানুষের খাপ খাওয়াতে অনেকটা সময় লাগে। ঢাকায় এসেও সেলামি পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু আত্মীয়-স্বজনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সেই ছোটবেলার মতো আনন্দ আর কখনোই ফিরে আসেনি।
চট্টগ্রামের স্মৃতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে সেজো মামার ইদের উপহার । মামা তখন রিয়াজুদ্দিন বাজারে সবে জামা-কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেছেন। আমি তখন খুব ছোট -মামা আমাকে দোকানে নিয়ে গিয়ে বললেন, "তোর যা ভালো লাগে নিয়ে নে।" আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "মামা, টাকা লাগবে না?" মামা যখন হেসে বললেন 'না', আমি মহাখুশিতে জামা-কাপড় নিয়ে বাসায় ফিরলাম।
পাড়ার বন্ধুদের সাথে দেখা হতেই বললাম, "জানিস, আমার মামার দোকানে ঈদের জামা পাওয়া যায় কিন্তু কোনো টাকা লাগে না!" বন্ধুরা অবাক হলো। আমি তখন তিনজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে আবার মামার কাছে গেলাম আর বললাম, "মামা, এদেরও জামা লাগবে।" মামা যখন বন্ধুদের তাদের অভিভাবকদের নিয়ে দোকানে আসতে বললেন, তখন এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল, "মামা, আপনার দোকানে জামা-কাপড় কিনতে কি আসলেই টাকা লাগে না?" মামা হেসে ফেললেন। শেষে আমার মান রক্ষা করতে বন্ধুদের প্রত্যেককে এক সেট করে পাঞ্জাবি উপহার দিলেন। বাসায় শোনার পর আম্মু খুব রাগ করেছিলেন, কিন্তু নানুর আদুরে শাসনের তোড়ে সেই রাগ আর ধোপে টেকেনি।
এই স্মৃতিগুলো মনে করলে বুকের ভেতর উষ্ণতা বাড়ে, কিন্তু আজকের ঈদের দিনে চারদিকে তাকালে দেখি আনন্দ আর বেদনার এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। আমেরিকা–ইসরায়েল সংঘাতের ছায়ায় ইরানের আকাশ আজ ভারী ; আনন্দের ঈদ সেখানে যেন নিঃশব্দ শোকের দিনে পরিণত হয়েছে। একই বেদনার স্রোতে ভেসে আছে আফগানিস্তানের সেই পরিবারগুলোও, যাদের প্রিয়জনেরা পাকিস্তানের হামলায় একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে। এই ঈদ তাই সবার জন্য খুশির নয় - বরং হারিয়ে যাওয়া মুখগুলোর স্মৃতি আর অদৃশ্য শোকের এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনি।
অথচ এই উপমহাদেশেই একদিন কবি নজরুল লিখেছিলেন: "রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।" মরুর ধর্ম, দূর আরবের সংস্কৃতির স্রোতকে বাঙালি হৃদয়ের গভীরে টেনে এনে তিনি যে আনন্দের সুর তুলেছিলেন, তা ছিল সীমান্তহীন মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ।
আজ বাস্তবতার নিষ্ঠুরতায় সেই সুর যেন কোথাও ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কৃষক মোশারফ হোসেনের কথাই ধরা যাক — এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বোনা আলুর ফসল যখন অকাল বৃষ্টির পানির নিচে তলিয়ে পচে যায়, তখন তার কাছে ঈদের চাঁদ কোনো খুশির বার্তা নিয়ে আসে না। নজরুল তাঁর 'কৃষকের ঈদ' কবিতায় যেমনটা বলেছিলেন, ঋণে-বাঁধা শির নিয়ে যারা মুমূর্ষু অবস্থায় দিন কাটায়, তাদের ঘরে ঈদের আনন্দ কেবল এক হাহাকার হয়েই ধরা দেয়। পচা আলুর গন্ধ আর ঋণের বোঝা নিয়ে যে কৃষক আজ দিগভ্রান্ত, তার কাছে ঈদের নামাজ কেবল এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। তবু নজরুলের সেই আহ্বানের মতোই আমরা অপেক্ষায় থাকি এমন এক দিনের, যখন ঈদ সত্যিই সবার জন্য আনন্দ বয়ে আনবে এবং পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই উৎসব শোকের প্রতীক হয়ে থাকবে না।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


