somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমরা কি সত্যিই দেখি, নাকি যা বিশ্বাস করি কেবল সেটাই দেখি ?

২৩ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


গাজীপুরের কালিয়াকৈরে কমলা বেগম ঈদের সকালে গোরুর মাংস রান্না করতে বসেছিলেন। গতবছর কোরবানির ঈদে মানুষের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা মাংস, মাসের পর মাস পাশের বাড়ির ফ্রিজে থাকা, এখন হাঁড়িতে টগবগ করে ফুটছে। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন মাংসের একটা টুকরো ডুবছে না। বারবার চামচ দিয়ে ঠেলা দিচ্ছেন, তবু ভাসছে। গরম পানি থেকে তুলে হাতে নিলেন, ঠান্ডা লাগছে। পাশ থেকে কেউ একজন বলে উঠলেন, "আরে, এর গায়ে তো আরবিতে আল্লাহ লেখা !" মুহূর্তেই রান্নাঘরের সাধারণ পরিবেশ বদলে গেল। রান্নার হাঁড়ি একপাশে পড়ে থাকল, আর কমলা বেগমের উঠান যেন হয়ে উঠল হাজার মানুষের মিলনমেলা।

এখন একটু থামা দরকার। গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া দরকার। এবং জিজ্ঞেস করা দরকার যে একটা পুরনো, চর্বিযুক্ত, মাসের পর মাস ফ্রিজে থাকা গোরুর মাংসের টুকরো কীভাবে হঠাৎ ঐশ্বরিক বার্তাবাহক হয়ে গেল। মাংস ভাসছিল কারণ চর্বি পানির চেয়ে হালকা, এটা পদার্থবিজ্ঞানের ঘনত্ব বা density-র একদম প্রাথমিক পাঠ। ঠান্ডা লাগছিল কারণ গরম পানি থেকে বের করলে বাষ্পীভবন বা evaporation-এর কারণে ঠান্ডা অনুভূত হয়। সেদ্ধ হচ্ছিল না কারণ বয়স্ক গোরুর মাংস সহজে সেদ্ধ হয় না, বিশেষত মোটা চর্বির টুকরো। এই তিনটি স্বাভাবিক কারণ মিলিয়ে যে "অলৌকিক" তৈরি হলো, সেটার পুরো রহস্য একটি হাইস্কুলের বিজ্ঞান বই দিয়েই বোঝা সম্ভব। কিন্তু সেদিন হাজার মানুষের ভিড়ে বিজ্ঞানের চেয়ে আবেগ আর বিশ্বাস অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।

মানুষের মস্তিষ্ক আসলে এক বিস্ময়কর যন্ত্র। লক্ষ বছরের বিবর্তনে এই যন্ত্রটি একটি কাজ খুব নিখুঁতভাবে শিখেছে-যেকোনো এলোমেলো জিনিসের মধ্যে পরিচিত আকৃতি খুঁজে বের করা। ঝোপে নড়াচড়া দেখলে সাপ ভাবা বা অন্ধকারে ছায়া দেখে মানুষ ভাবা আমাদের টিকে থাকার সহজাত প্রবৃত্তি। বিজ্ঞানে এই ঘটনার নাম প্যারেডোলিয়া (Pareidolia), যেখানে মস্তিষ্ক যেকোনো এলোমেলো নকশায় পরিচিত রূপ খুঁজে পায়। এটি আসলে টপ-ডাউন প্রসেসিং (top-down processing) পদ্ধতিতে কাজ করে, যেখানে আমাদের মন আগে থেকে একটি সিদ্ধান্ত তৈরি করে রাখে এবং চোখ কেবল সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার মতো তথ্য খোঁজে।

একটু গভীর ভাবে ভাবুন । যে মানুষ আরবি হরফ কখনো দেখেনি, আল্লাহ শব্দটা কখনো পড়েনি, সে কি ওই মাংসের টুকরোয় "আল্লাহ" দেখত? কখনো না। সে শুধু একটা দাগ দেখত। একজন জাপানি বৌদ্ধ হয়তো বুদ্ধের মুখ দেখত। একজন হিন্দু হয়তো ওম চিহ্ন দেখত। একজন নাস্তিক শুধু পুরনো মাংসের texture দেখত। একই মাংস, কিন্তু চারজন চার রকম ঘটনা দেখছে। এটাই হলো confirmation bias-এর আসল চেহারা, আমরা যা বিশ্বাস করতে চাই, আমাদের চোখ ঠিক তা-ই খুঁজে নেয়। তাই প্রশ্ন জাগে, সত্যটা কি মাংসে ছিল নাকি আমাদের ভাবনায়?

ইতিহাসে এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। ১৯৯৫ সালে ভারতে গণেশের মূর্তি দুধ খাচ্ছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। সারা ভারত উত্তাল হয়েছিল, দুধের দাম চারগুণ বেড়ে গিয়েছিল, অফিস আদালত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে বিজ্ঞানীরা দেখালেন এটা capillary action, পাথরের মূর্তির গায়ে surface tension-এর কারণে দুধ শোষিত হয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। সেই একই পরীক্ষায় দেখা গেল গান্ধীর মূর্তিকে মদ দিলেও পান করছে, আম্বেদকরের মূর্তিকে দুধ দিলেও পান করছে।

পদার্থবিজ্ঞান কোনো ধর্ম বা পরিচয় অনুযায়ী কাজ করে না। কিন্তু মানুষ প্রায়ই নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায় এমন ঘটনাগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। আমেরিকায় ২০০৪ সালে ফ্লোরিডার ডায়ানা ডুয়সার একটি গ্রিলড চিজ স্যান্ডউইচে ভার্জিন মেরির মুখ দেখতে পান। সেই স্যান্ডউইচ পরে eBay-তে আটাশ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। এরপর eBay ভরে গেল যিশুর মুখওয়ালা পাউরুটিতে, মেরির চেহারাওয়ালা মাছে, বিভিন্ন সন্তের আকৃতিওয়ালা আলুতে। দেশ আলাদা, ধর্ম আলাদা, কিন্তু মানুষের pattern recognition-এর প্রবণতা আশ্চর্যরকম একই ।

ধর্মীয় দিক থেকে দেখলে এই বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে সমস্যাজনক। আল্লাহ নিরাকার, তিনি মাংসের আকৃতি নেন না, সরাসরি কোনো বার্তা পাঠান না। "আল্লাহ" শুধু একটি আরবি শব্দ যা দিয়ে মহান সত্তাকে ডাকা হয়। ভাষাটা মানুষের তৈরি, ঐশ্বরিক না। তাই মাংসে আরবি হরফের মতো দাগ দেখলে সেটা অলৌকিক কেন হবে? মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম মাংসে দেখা আরও বড় সমস্যা কারণ ইসলামে তিনি মানুষ ছিলেন, অলৌকিক সত্তা নন। তাঁকে মাংসের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর ক্ষমতাওয়ালা করে তোলা তাঁর নিজের শিক্ষার বিরুদ্ধে এবং সরাসরি তাওহীদের লঙ্ঘন।

কমলা বেগমের বাড়ির ভিড়ের মধ্যে সেদিন তিন ধরনের মানুষ ছিল। একদল সত্যিই কিছু দেখেছে বলে মনে করেছে;তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বলেনি, কিন্তু হয়তো pareidolia এবং confirmation bias-এর প্রভাব কাজ করেছে। আরেকদল নিজে স্পষ্টভাবে কিছু না দেখেও অন্যদের কথা শুনে বিশ্বাস করেছে। দলের মধ্যে থাকলে সন্দেহ প্রকাশ করা কঠিন হয়ে যায়; একে social contagion বলা হয়। তৃতীয় একটি দল ছিল, যারা হয়তো ভিন্নভাবে ভেবেছিল, কিন্তু কিছু বলেনি কারণ এমন বিষয়ে প্রশ্ন তোলা অনেক সময় অস্বস্তিকর। বিজ্ঞানে একে bystander effect বলা হয়-সবাই ভাবে অন্য কেউ বলবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই বলে না ।

সবশেষে কমলা বেগমের দিকে নজর দেয়া দরকার। তিনি হতদরিদ্র, ভিক্ষা করে দিন কাটান। সেদিন যারা তার বাড়িতে গিয়েছিলেন হয়তো কেউ কেউ কিছু টাকা দিয়েও গেছেন। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। অলৌকিক ঘটনা না হলে কি কেউ উনার বাড়িতে যেত? কমলা বেগম যদি সেদিন চুপচাপ রান্না করতেন, কোনো ভাসমান মাংস না থাকত, কোনো ভিড় না হতো, তাহলে কি কেউ জানত তিনি আট নয় মাস আগের চেয়ে আনা মাংস রান্না করছেন? কেউ কি জিজ্ঞেস করত এই ঈদে তার ঘরে কী রান্না হবে ? সম্ভবত না।

আমরা পাশের মানুষের কষ্ট তখনই দেখি যখন সেটা ভাইরাল হয়, যখন একটা ঘটনা হয়, যখন ভিড় জমে। কিন্তু যে কষ্ট নীরবে চলে, যে মানুষ প্রতিদিন চুপচাপ কষ্ট পান, তাদের দিকে তাকানোর সময় আমাদের হয় না। কমলা বেগম আমাদের পাড়ায়ই থাকেন। আমরা শুধু দেখি না । মানুষের দয়াও যেন আজ কেবল অলৌকিকতার মুখাপেক্ষী।


https://www.ittefaq.com.bd/780690 -
গরুর মাংসের টুকরায় আরবি হরফে আল্লাহর নাম - ইত্তেফাক



সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৯
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সামুর ঈদ কবে?

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ২২ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৫:০৬




সবাইকে ঈদ মুরাবক!

ঈদ কেমন গেলো? পুরো রমজানের দুআা কতটুকু কাজে লেগেছে? বৃষ্টি ভেজা, বজ্রপাতে কোনো ভোগান্তি হয়েছে : প্রিয়জন সব ঠিকঠাক আছে? আহত বা নিহত হয়েছে?? ...বাকিটুকু পড়ুন

কেন আমি ইরানের বিরুদ্ধে-৩

লিখেছেন অর্ক, ২২ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:৪৫



সারাজীবন আমি মানবতা, সত্য, শুভ, সুস্থ, সুন্দরের চর্চা করে এসেছি। আমার উপর শতভাগ আস্থা রাখতে পারেন। শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে আমি কিছু বলি না, দাবি করি না। এই যুদ্ধের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইহুদীদের ষড়যন্ত এবং আমেরিকার খনিজ সমৃদ্ধ ভূমী দখলের লীলাখেলা।

লিখেছেন রাশিদুল ইসলাম লাবলু, ২৩ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১:৪২



র্দীঘদিন ধরে ইহুদীরা মুসলিমদের সন্ত্রাসী পরিচয় তকমা দিয়ে বিশ্ব দরবারে ঘৃন্য জাতি সত্ত্বাতে পরিনত করার অপেচেষ্টায় রত ছিলো। মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী প্রথমেই ধারনা দিতে তৈরি করা হল আল কায়দা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৯১

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:৩৯

প্রিয় কন্যা আমার, আজ ইদের দিন!
একমাস ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা সিয়াম সাধনা করেছে। রমজান মাস মূলত সংযমের মাস। ফাজ্জা কাউকে আমি দেখিনি সংযম করতে। রমজান মাসে সবাই বিলাসিতা করেছে। খাওয়া দাওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি সত্যিই দেখি, নাকি যা বিশ্বাস করি কেবল সেটাই দেখি ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৩ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:২৯


গাজীপুরের কালিয়াকৈরে কমলা বেগম ঈদের সকালে গোরুর মাংস রান্না করতে বসেছিলেন। গতবছর কোরবানির ঈদে মানুষের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা মাংস, মাসের পর মাস পাশের বাড়ির ফ্রিজে থাকা, এখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×