somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কেন বিচার পাওয়ার আগেই মৃত্যু হলো সাইকো সম্রাটের ?

২৪ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সাভার থানা থেকে মাত্র একশো গজ দূরে, পাশে সরকারি কলেজ, দূরে সেনা ক্যাম্প, চারদিকে মানুষের ব্যস্ততা: এই পরিচিত পরিবেশের মাঝে একটা পরিত্যক্ত ভবন ছিল, যেখানে আলো পৌঁছাত না। সেই আলোহীন জায়গায়, সভ্যতার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে, একজন মানুষ মাসের পর মাস মানুষ খুন করে যাচ্ছিল। তার নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট, তবে সবাই চিনত "সাইকো সম্রাট" নামে। তার আসল নাম সবুজ শেখ, বাড়ি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং, বাবার নাম পান্না শেখ ; একটি সম্পূর্ণ সাধারণ পরিচয়, যার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ানক সাইকো কিলার ।

সে আসলে পাগল ছিল না। এটা গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের কাছে নিজেই স্বীকার করেছে সে পাগলের ভান করত, ভবঘুরের মতো ঘুরত, মানুষ তাকে দেখে সরে যেত। কিন্তু ভেতরে ছিল একটা ঠান্ডা, পরিকল্পিত মস্তিষ্ক, যে জানত কাকে বেছে নিতে হয়, কোথায় নিয়ে যেতে হয়, আর কীভাবে প্রমাণ মুছে দিতে হয়। হত্যার পর লাশ কাঁধে তুলে সিঁড়ি ভেঙে দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাওয়া, তারপর আগুন দেওয়া -এটা উন্মাদের কাজ নয়, এটা শিকারির পদ্ধতি।

তার নিজের একটা ভাষা ছিল। জিজ্ঞাসাবাদে সে বলেছিল, কাউকে অনৈতিক কাজে দেখলে সে তাদের "থার্টি ফোর" বা "সানডে মানডে ক্লোজ" করে দিত। এই কোড ওয়ার্ডগুলো শুনলে শিউরে উঠতে হয় ; কারণ এটা নিছক পাগলামি নয়, এটা একটা মানুষের হত্যাকে নিজের কাছে স্বাভাবিক করে নেওয়ার ভাষা। সে হত্যাকে ব্যক্তিগত বিচার মনে করত। নিজেকে একজন বিচারক ভাবত, আর ভিকটিমদের ভাবত অপরাধী। থানা থেকে একশো গজ দূরে, আলোর পাশে অন্ধকার -সম্রাট ছিল সেই অন্ধকারের নাম, যাকে কেউ দেখতে পায়নি, কারণ কেউ দেখতে চায়নি।

২০১৪ সালে প্রথম হত্যা, তারপর গ্রেফতার, তারপর জামিন। ২০১৯ সালে দুইবার মাদক মামলায় গ্রেফতার, তারপর আবার জামিন। একজন মানুষ যে একবার খুনের মামলায় চার্জশিটভুক্ত হয়েছে, দুইবার মাদক মামলায় ধরা পড়েছে - সে এত সহজে বারবার জামিন পায় কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয়নি, কেউ খোঁজেনি। আর সে ফিরে এসেছে, আবার সাভারে, আবার সেই পরিত্যক্ত ভবনে।

তার শিকার ছিল সমাজের একেবারে প্রান্তে থাকা মানুষেরা -ভাসমান নারী, বৃদ্ধা, ভবঘুরে যুবক। যাদের জন্য কেউ থানায় যায় না, যাদের নিখোঁজ হওয়ার খবর কেউ রাখে না। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে আসমা বেগম নামের এক বৃদ্ধাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর থেকে শুরু হয় তার শেষ অধ্যায়ের ধারাবাহিকতা : আগস্টে এক যুবক, অক্টোবরে এক নারী, ডিসেম্বরে আরেক যুবক, জানুয়ারিতে এক নারীসহ দুজন। ছয় মাসে ছয়টি হত্যা, থানার পাশেই।

এই সময়টার একটা বিশেষ প্রেক্ষাপট আছে। ২০২৪ সালের আগস্টে জুলাই অভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনী কার্যত মাঠ ছেড়ে দেয়। আইনশৃঙ্খলার যে শূন্যতা তৈরি হয়, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রান্তিক মানুষেরা। ঢাকার শ্যামলী থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায় ভাসমান যৌনকর্মীদের প্রকাশ্যে লাঠিপেটা করা হয়, তাদের টাকা ও মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়। সমাজে একটা বার্তা ছড়িয়ে পড়ে; এই মানুষগুলোর উপর যা করা হোক, কেউ জিজ্ঞেস করবে না। সম্রাট সেই বার্তাটা বুঝেছিল।

তানিয়া আক্তারের গল্পটা এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশ। উত্তরখানের একটি ভাড়া বাসায় তার মা জুলেখা বেগম পহেলা জানুয়ারি মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন, কিন্তু ভাসমান একজন মেয়ের নিখোঁজের খবর কতটুকু গুরুত্ব পায়? তারপর একদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে ; একটি পরিত্যক্ত ভবনে এক নারীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেই ভিডিও দেখে জুলেখা বেগম তার মেয়েকে চিনতে পারেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে জন্মদাগ দেখে নিশ্চিত হন এটি তার মেয়ে তানিয়া।

তানিয়ার বোন নাসরিন আক্তার ফারিয়া বলেছিলেন, অন্তত পরিচয়সহ দাফনের সুযোগ পেয়েছেন, এটাই তাদের বড় সান্ত্বনা। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় তানিয়া, একটি সাধারণ পরিবারের স্বপ্ন ; উত্তরখানের বড়বাগ জামে মসজিদে জানাজার পর দক্ষিণখানে বাবার কবরের পাশে শায়িত হয়েছেন তিনি। তার জন্য ন্যায়বিচার চাওয়ার মানুষ ছিল, কিন্তু যে মানুষটি তাকে খুন করেছিল, সে মাত্র পঁয়ষট্টি দিন কারাগারে থেকে মারা গেছে বিচার শুরুর আগেই।

১৮ জানুয়ারি গ্রেফতার, ১৯ জানুয়ারি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি, সেদিনই কারাগারে প্রেরণ। পুলিশ ১০ দিনের রিমান্ড চেয়েছিল। আদালত দেয়নি। রিমান্ডে গেলে জানা যেত - সে একা ছিল, নাকি পেছনে কেউ ছিল? বারবার জামিন পেয়েছিল কীভাবে? নেশার টাকা কোথায় পেত? অন্য কোথাও আরও লাশ আছে কিনা? এই প্রশ্নগুলো এখন চিরকালের জন্য হারিয়ে গেল। ২৩ মার্চ ২০২৬ সকালে কেরানীগঞ্জ কারাগারে বুকে ব্যথা অনুভব করলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, সকাল সাড়ে সাতটায় মৃত্যু হয়। কারণ তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিলো । ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এখনো প্রকাশিত হয়নি। রিমান্ড দেওয়া হয়নি, বিচার শুরু হয়নি, ময়নাতদন্ত প্রকাশ পায়নি - আর এই তিনটি শূন্যস্থান মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক নীরব প্রশ্নচিহ্ন, যার উত্তর হয়তো কখনো খুজে পাওয়া যাবে না ।

মৃত্যুর খবর শুনে তানিয়ার মা জুলেখা বেগম ও বোন নাসরিন বলেছেন "এক ধরনের নীরব বিচার সম্পন্ন হয়েছে"। তাদের কথায় স্বস্তি আছে, কিন্তু সেই স্বস্তির মধ্যে একটা অস্বস্তিও কাজ করছে । একজন মানুষ যখন রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকে, তখন তার মৃত্যু শুধু তার নিজের মৃত্যু নয় - সে মৃত্যু অনেক প্রশ্নকেও কবর দেয়। কে ছিল সম্রাটের পেছনে, কেন বারবার জামিন পেয়েছে, রিমান্ড কেন দেওয়া হয়নি - এই প্রশ্নগুলোর জবাব এখন কে দিবে ?

সাভারের পরিত্যক্ত ভবনটা এখনো আছে। থানাও আছে, একশো গজ দূরে। আলো আর অন্ধকারের সেই পুরনো সহাবস্থানও আছে। শুধু নেই সম্রাট, আর নেই তার বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো হওয়ার কথা ছিল। সত্য একদিন সামনে আসে - এই কথাটা বলা সহজ। কিন্তু সত্য যখন আসার আগেই খুনি মারা যায়, আর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ পায় না, তখন প্রশ্নটা থেকে যায় : কোন সত্যটা সামনে এলো, আর কোনটা চিরকালের জন্য অন্ধকারে হারিয়ে গেল ?

সিরিয়াল কিলার সাভারের ‘সাইকো সম্রাট’ পর্বের অবসান- যুগান্তর

https://www.jugantor.com/country-news/1080231
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:৪৪
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"আমি কিংবদন্তির কথা বলছি".......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ৩০ শে মে, ২০২৬ সকাল ৭:৫৮

আজ ৩০ মে।
বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর দিন। আজ সেই মহানায়ক, সেই সৈনিক, সেই রাষ্ট্রনায়কের শাহাদাৎ বার্ষিকী- যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নের জন্য।
তিনি শহীদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাবিকে ‘কোচিং সেন্টার’ বলা ববি হাজ্জাজের মূর্খতা নাকি অহংকার?

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ৩০ শে মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩

সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং দাবি করেছেন "নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যা গবেষণা করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৪:৫০


গত রোজার ঈদে বাংলাদেশে একটা সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল, নাম "বনলতা এক্সপ্রেস"। হুমায়ূন আহমেদের "কিছুক্ষণ" উপন্যাস অবলম্বনে বানানো, মোশাররফ করিম আর চঞ্চল চৌধুরীর মতো মানুষরা অভিনয় করেছেন। সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য লটারি: শার্লি জ্যাকসন

লিখেছেন নিবারণ, ৩০ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৫১

২৭ জুনের সকালটা ছিল একদম পরিষ্কার আর ঝলমলে। ভর গ্রীষ্মের এক সতেজ ওম চারদিকে; ফুলের দল ফুটে আছে থোকায় থোকায়, আর ঘাসগুলো একেবারে গাঢ় সবুজ। সকাল দশটা নাগাদ গ্রামের লোকজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা'র আন্তর্জাতিক খেলা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ৩০ শে মে, ২০২৬ রাত ৯:৫২



শেখ হাসিনা- একটি নাম, একটি ইতিহাস। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন খুব কম নেতাই আছেন, যাদের নাম উচ্চারিত হলে সমর্থন ও বিরোধিতা- উভয়ই এত প্রবলভাবে সামনে আসে। দীর্ঘ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×