somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বাধীনতা বলতে আপনি কি বুঝেন ?

২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


২০২৩ সালের কথা। আমরা কয়েকজন মিলে অনলাইনে একজন ইংরেজি স্যারের কাছে কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম। একদিন ক্লাস চলছে, স্যার হঠাৎ বই থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা ছোটবেলায় যখন পড়েছিলে তখন একটা বাক্য পেয়েছিলে "I eat rice",কিংবা "আমি ভাত খাই"। মনে আছে ? আমরা বললাম, হ্যাঁ স্যার। তখন স্যার আবার জিজ্ঞেস করলেন, বলতে পারবে কেন বাংলাদেশের বেশিরভাগ ইংরেজি গ্রামার বইয়ের লেখকরা এই বাক্যটাই রাখেন? আমরা বললাম, স্যার আপনিই বলুন। স্যার একটু থেমে বললেন, আসলে বাংলাদেশের মানুষের একসময় ভাতের খুব অভাব ছিল। ভাতের প্রতি বাঙালির যে টান, সেটা কোনোদিন কমার নয়।

কথাটা মাথায় ঘুরতে লাগল। আসলেই তো। ছোটবেলায় শুক্রবার বিটিভিতে বাংলা ছবি দেখতাম। শাবানা ম্যাডামের "ভাত দে" ছবিটা বারবার দেখাত। ছবিটিতে সাধারণ মানুষের ভাতের জন্য সংগ্রামের গল্প দেখানো হয়েছিল। শাবানা ম্যাডামের সেই একটি সংলাপ আজও কানে বাজে, "ভাত চুরি করি না তো, ক্ষুধা লাগে খাই।" এই একটি লাইনে যে কষ্ট আছে, যে অপমান আছে, যে মানবিক আর্তনাদ আছে, তা বুকে লাগে।

এরপর স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে মনে পড়ে গেল নায়ক জাফর ইকবাল আর ববিতা ম্যাডামের "এক মুঠো ভাত" ছবির কথা। সেই ছবিতে একটা দৃশ্য আছে যেটা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভোলার নয়। জাফর ইকবালের মা ছোটবেলায় ভাতের অভাবে মারা যান। জাফর ইকবাল পেটের ভাত জোগাতে চোরাকারবারীদের সঙ্গে যোগ দেন, ভাতের জন্য একজনকে খুন করেন। সেই খুনের দায়ে তার ফাঁসি হয়। ফাঁসির আগের রাতে জেলার সাহেব এলেন শেষ খাবার দিতে। খাবারে ছিল শুকনো রুটি আর ভাজি। জাফর ইকবাল একটা রুটি খেলেন, আরেকটা রুটি জেল পোশাকের বুক পকেটে রাখলেন।

জেলার জিজ্ঞেস করলেন, রুটি পকেটে রাখছো কেন? জাফর ইকবাল বললেন, উপরে নিয়ে যাব। কে জানে সেখানেও যদি খেতে না পাই। জেলার সাহেব বললেন , " ঠিক আছে" । জাফর ইকবাল আবার বলা শুরু করলেন , "উপরে গিয়ে খোদাকে একটাই কথা বলব। বলব, হে খোদা, যদি মানুষ সৃষ্টি করো তবে তাকে পেট দিও না। আর যদি পেট দাও তবে তাকে ক্ষুধা দিও না। আর যদি ক্ষুধাই দাও তবে তার জন্য দুইবেলা খাবারের ব্যবস্থা করে দিও। জেলার সাহেব বললেন, তওবা করুন মিয়া, একটু পরেই খোদার কাছে চলে যাবে।

সিনেমার এই সংলাপ শুনে যার বুক কাঁপে না, সে মানুষ কিনা সন্দেহ আছে; খাবারের কষ্ট বাঙালির চিরজীবনের সঙ্গী। ইংরেজি বইয়ের লেখকরা তাই ভুল কিছু লেখেননি। এরপর মনে পড়ল ২০২৩ সালের স্বাধীনতা দিবসের কথা। প্রথম আলোতে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। এক সাংবাদিক পথশিশু জাকিরের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, স্বাধীনতা মানে কী তোমার কাছে? জাকির বলেছিল, "পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কী করুম। বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। আমাগো মাছ, মাংস আর চাইলের স্বাধীনতা লাগব।" সেই রিপোর্ট করতে গিয়ে সাংবাদিককে জেলে যেতে হয়েছিল।

ঘুরেফিরে আবার সেই ভাত। আবার সেই ক্ষুধা ; জাকিরের মুখ দিয়ে আসলে কোটি বাঙালির কথা বেরিয়ে এসেছে। ভাতের পাশাপাশি মাছ আর মাংসের কথাও সে বলেছে, কারণ এখনো এই দেশে এসব খাবার সস্তা হয়ে ওঠেনি। ২০২৬ সালে এসেও মাংস সমিতির নামে মানুষের টাকা মেরে দেওয়া হয়। এটা কিন্তু সেই পুরনো অভাবকেই চিহ্নিত করে।

এরপর গুগলে খুঁজতে গিয়ে দেখলাম আজ থেকে চোদ্দ বছর আগে সোনাভারু নামের এক ছোট্ট শিশু ভাতের অভাবে মারা গেছে। তাকে নিয়ে কত ব্লগ লেখা হয়েছে সামুতে , কত নিউজ হয়েছে । সোনাভারুর জন্মদিন তার মৃত্যুদিন হয়ে গেছে। ভাতের অভাবে আমাদের দশ বছরের সোনাভারু প্রাণবায়ু ত্যাগ করে। বাঙালি তাই ভাতের প্রতি এক বিশেষ টান অনুভব করে এসেছে, আর সেটা কোনোদিন চলে যাওয়ার নয়।

১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের সময় এই দেশে সবচেয়ে বেশি ভাতের অভাব দেখা দিয়েছিলো। তখন কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন, "ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র চিবিয়ে খাবো।" পেটে ক্ষুধা থাকলে দেশপ্রেম আসে না, এটাই সত্যি। আর ৭৬ এর মন্বন্তরের সময় সুকান্ত লিখেছিলেন, "ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।"

একাত্তরে যারা যুদ্ধ করেছেন তাদের স্বপ্ন ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। নানা কারণে তাদের সব স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে তাদের কল্যাণেই আমরা একটি স্বাধীন দেশে বাস করি। আর সেই স্বাধীন দেশে বাস করে বাংলা ভাষায় নিজের মনের কথা বলতে পারছি, এটুকুও কম নয়।

গতকাল স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র আর মিসাইল দেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসির রোল পড়ে গেল। কেউ কেউ বললেন, আমাদের কেবল চেতনা ব্যবসা আছে, মিসাইলে আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের লজ্জা নেই বলেই মিসাইল নেই। কিন্তু একটু ভাবলেই প্রশ্নটা উল্টো হয়ে যায়। শক্তিশালী মিসাইল বেশি দরকার, নাকি মাছ, মাংস আর ভাত বেশি দরকার? মিসাইলের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করলে কি বোঝা যাবে আমরা স্বাধীন? তিন কোটি বেকারকে কর্মসংস্থান দিতে পারলে তারা বেকারত্ব থেকে স্বাধীনতা পাবে। কোনটা বেশি লজ্জার? বেকার থাকা, নাকি মিসাইল না থাকা?

স্বাধীনতা মানে আসলে এটুকুই। একটি দেশে মানুষ যদি নির্ভয়ে তার কাজগুলো করতে পারে, তাহলে সে স্বাধীন। অবশ্যই উৎপাদনশীল কাজের কথা বলা হচ্ছে। খারাপ কাজের স্বাধীনতা চাওয়া নৈতিকতার বিরুদ্ধে। চাইলেও আমরা এখন বড় শক্তি বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মুখের ওপর কথা বলতে পারি না, যদিও আমরা স্বাধীন দেশে বাস করি। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন নয়। আমরা অনুদান আর ঋণের টাকায় চলি। এসব থেকে মুক্ত হয়ে যেদিন আমরা নিজেরা কোনো দেশকে ঋণ দিতে পারব, সেদিন আরেকবার স্বাধীনতা অর্জিত হবে।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা। স্বাধীনতা দিবসে একটা লক্ষ্য ঠিক করা আর পরের স্বাধীনতা দিবসে সেটা পূরণ করে উদযাপন করা। তা না হলে আমরা সারাবছর হা হুতাশ করে বেড়াব আর কেবল তারিখ এলে অনুষ্ঠান করে স্বাধীনতা দিবস পালন করে যাব।

যারা ভাত, মাংস আর মাছ খাওয়ার স্বাধীনতা পেয়েছে তারা হয়তো একদিন এইগুলো আলোচনা করবে। কিন্তু যারা এখনো পায়নি, তাদের জন্য এসব আলোচনা কোনো অর্থ রাখে না। স্বাধীনতার সত্যিকারের উদযাপন শুরু হবে সেদিন থেকে, যেদিন জাকিরের মতো আর কোনো শিশুকে বলতে হবে না, "পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কী করুম।"
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:২১
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বেঁচে থাকাই পরম বিস্ময়

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ২৬ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৩


পথেঘাটে ঘুরিফিরি, যেকোনো সময়
পটল তুলতে পারি গাড়ির ধাক্কায়।
মাঝেমধ্যে থাকি এমনও আশঙ্কায়,
নির্মাণাধীন ভবন থেকে ইট পড়ে
মাথা ফেটে রক্তক্ষরণে প্রাণটা যায়!
এমন পরিণতিতে লোকে দুঃখ করে।
গাড়ি, ট্রেন, প্লেন, হয়তোবা ইস্টিমার
দুর্ঘটনায় প্রাণটা চলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মা'কে লেখা প্রীতিলতার শেষ চিঠি

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৬ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:০৯




আমায় তুমি পিছু ডেকো না'গো মা
আমার ফেরা সম্ভব  না।
দেশ মাতৃকায় উৎসর্গিতা আমি
আমি তো সেই ক্ষণজন্মা! 

আমায় তুমি আশীর্বাদ করো মা,
মোছো তোমার চোখের জল।
নিপীড়িতদের আর্তনাদ শুনছো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-২)

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ২:০৮



সূরাঃ ২ বাকারা, ২১ নং আয়াতের অনুবাদ-
২১। হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা তোমোদের সেই রবের ইবাদত কর যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা মোত্তাকী হও।

সূরাঃ ২... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসী - সাইন্স ফিকশন

লিখেছেন আরাফাত৫২৯, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ ভোর ৫:১০




১/
বিজ্ঞান একাডেমির প্রধাণ মহামতি গ্রাহাম উনার অফিসের বিশাল জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সময়টা প্রায় শেষ বিকেল। সন্ধ্যার রক্তিম আভা দূর আকাশে দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে পুরো আকাশটাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমাম, মুয়াজ্জিন, কুরআনের শিক্ষক ও দ্বীন প্রচারকদের বেতন বা সম্মানী গ্রহণের শরয়ী হুকুম

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:১৪

ইমাম, মুয়াজ্জিন, কুরআনের শিক্ষক ও দ্বীন প্রচারকদের বেতন বা সম্মানী গ্রহণের শরয়ী হুকুম

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মসজিদে ইমামতি করা, আযান দেয়া, কুরআন শিক্ষাদান করা কিংবা সাধারণভাবে দ্বীন প্রচারের কাজে বিনিময়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×