somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ওয়াশিংটন থেকে বেইজিং: বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

০৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মার্চ ২০২৬-এর ক্যালেন্ডার বলছে, বাংলাদেশের কূটনীতি নতুন দিকে মোড় নিয়েছে । একই সময়ে বাংলাদেশের তিনজন হেভিওয়েট ব্যক্তিত্ব আমেরিকার মাটিতে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নিউ ইয়র্কে ব্যস্ত নিজের ক্যাম্পেইনে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান পুরস্কার নিচ্ছেন জর্জিয়ায়। আর সবচেয়ে চমকপ্রদ খবরটা এলো যখন দেখা গেল জুবাইদা রহমান মেলানিয়া ট্রাম্পের আমন্ত্রণে খোদ হোয়াইট হাউসে। তিনটি সফরের উদ্দেশ্য কাগজে-কলমে ভিন্ন হলেও এর ভেতরের রসায়নটা বুঝতে খুব বেশি বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন কাকতালীয় ঘটনা নয় বরং এটি একটি পরিকল্পিত মাস্টারস্ট্রোক যা মূলত করা হয়েছে তারেক রহমানের সরকারের জন্য বিশ্বমঞ্চে একটা শক্ত ভিত গড়ার উদ্দেশ্যে।

ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আমেরিকা। ২০০৮ সালে জেমস মোরিয়ার্টির সেই বিতর্কিত কেবল যেখানে তাকে মার্কিন স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছিল সেই পুরনো ক্ষত সারিয়ে তোলা সহজ কাজ ছিল না। জুবাইদা রহমানের এই সফর তাই কেবল শিশু কল্যাণ সামিটের ফ্রেমে আটকে নেই। হোয়াইট হাউসের লাল কার্পেটে তার এই উপস্থিতি আসলে বাংলাদেশের নতুন সরকারের ইমেজ রি-ব্র্যান্ডিংয়ের একটা বড় অংশ। পর্দার আড়ালে যে বরফ গলতে শুরু করেছে এবং আমেরিকার শীর্ষ মহলে গ্রহণযোগ্যতা তৈরির একটা চেষ্টা চলছে এই সফর তারই একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ঠিক এই মাহেন্দ্রক্ষণেই নর্থইস্ট নিউজে এনায়েত কবিরের সেই আলোচিত আর্টিকেলটি আমাদের সামনে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করে। সাংবাদিকতার ভাষায় বলতে গেলে এই লেখার কিছু অংশ সত্য। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং তদন্তের ইতিহাস কিংবা জুবাইদা রহমানের হোয়াইট হাউস সফর কোনোটিই মিথ্যা নয়। কিন্তু যখনই এই রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে তারা সাবেক রাষ্ট্রদূত মোরিয়ার্টি বা এফবিআই কর্মকর্তা ডেবোরার সাথে গোপন বৈঠক করছেন সেটার কোনো প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যাচ্ছে না। এই ধরণের তথ্যের কোনো স্বাধীন উৎস বা নামবিহীন সূত্রের ওপর নির্ভরতা পুরো বিষয়টিকে সন্দেহজনক করে তোলে। সত্য তথ্যের সাথে কৌশলী অনুমান মিশিয়ে একধরণের ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা এখানে বেশ পরিষ্কার।

এই রিপোর্টের টোন খেয়াল করলে বোঝা যায় লেখক চাইছেন বিএনপি সরকারকে আমেরিকার হাতের পুতুল হিসেবে প্রমাণ করতে। বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে কোনো সরকারকে কোণঠাসা করার জন্য এ ধরণের প্রোপাগান্ডা নতুন কিছু নয়। পাঠক হিসেবে আমাদের এখানেই সজাগ হতে হয় যে কোনটি মাঠের বাস্তবতা আর কোনটি স্রেফ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা। লবিস্ট খোঁজা বা আন্তর্জাতিক মহলে দেনদরবার করা কূটনৈতিক শিষ্টাচারেরই অংশ কিন্তু সেটাকে যেভাবে ষড়যন্ত্রের মোড়কে পরিবেশন করা হয়েছে তা মূলত ভারত বা চীনের মতো প্রতিবেশীদের কান ভারি করার একটা অপচেষ্টা বলেই মনে হয়।

খলিলুর রহমান আমেরিকা থেকে ফিরে ৭-৮ এপ্রিল ভারতে যাবেন । S. Jaishankar, Ajit Doval, এবং Piyush Goyal-এর সাথে বৈঠক। এটা তারেক সরকারের প্রথম মন্ত্রী পর্যায়ের ভারত সফর। দুই বছরের সম্পর্কের শীতলতার পর এই সফরটা ছিল একটা রিসেট বোতাম। আলোচনায় গঙ্গার পানিচুক্তি নবায়ন, জ্বালানি সংকট, বাণিজ্য ভারসাম্য। কিন্তু এর চেয়েও বড় বিষয় হলো এই সফর তারেক রহমানের নিজের ভারত সফরের ভিত্তি তৈরি করছে। আর এপ্রিলের শেষে যাচ্ছেন বেইজিং। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সাথে বৈঠক। চীন আগেই আমন্ত্রণ দিয়েছিল, ফেব্রুয়ারিতে BNP সরকার গঠনের পরেই।

এই পুরো ক্রমটা, আমেরিকা, তারপর ভারত, সবশেষ চীন, এটাকে অনেকে শেখ হাসিনার প্যাটার্নের সাথে মেলাতে চাইছেন। মিল আছে কিছুটা। ২০২৪ সালেও হাসিনা আগে ভারত গিয়েছিলেন, তারপর চীন। কিন্তু একটা বড় পার্থক্য আছে। হাসিনার আমলে আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ছিল টানটান, বিশেষত ২০২৩-২৪-এর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। তারেক সরকার সেই জায়গা থেকে উল্টো দিকে হাঁটছে, আমেরিকাকে সামনে রেখে। এটা কি ভালো না খারাপ? এটা নির্ভর করছে কীভাবে দেখছেন তার উপর।

GSOMIA এবং ACSA চুক্তির আলোচনা চলছে, এটা একাধিক সোর্স নিশ্চিত করেছে। এই চুক্তিগুলো আমেরিকার সাথে সামরিক তথ্য ও লজিস্টিক শেয়ারিংয়ের চুক্তি। ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এই চুক্তি করেছে। চীন এটাকে ভালো চোখে দেখে না, স্বাভাবিকভাবেই। তাহলে বেইজিং সফরটা কি শুধু ভারসাম্য রক্ষার জন্য? একটা সংকেত দেওয়া যে বাংলাদেশ শুধু পশ্চিমের দিকে ঝুঁকছে না?

সম্ভবত হ্যাঁ। বাংলাদেশের ভূগোল এবং অর্থনীতির বাস্তবতা যেকোনো সরকারকে এই ভারসাম্যের খেলা খেলতে বাধ্য করে। চীন সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ভারত সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী। আমেরিকা সবচেয়ে বড় রপ্তানির বাজার এবং এখন কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্ভাব্য মিত্র। এই তিনটিকে একসাথে সামলানো যেকোনো সরকারের জন্যই কঠিন, দলমত নির্বিশেষে।

বিএনপি সরকার অত্যন্ত দ্রুত এবং সুসংগঠিতভাবে একটি আন্তর্জাতিক বলয় তৈরির চেষ্টা করছে। জুবাইদা রহমানের হোয়াইট হাউস সফর বা সেনাপ্রধানের আমেরিকা সফর কোনোটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এক সুতোয় গাঁথা । এই পুরো প্রক্রিয়ার সফলতার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সেই দিনের ওপর যেদিন তারেক রহমান নিজে ওয়াশিংটনের মাটিতে পা রাখতে সক্ষম হবেন। সেই মুহূর্তটিই হবে এই দীর্ঘ কূটনৈতিক লড়াইয়ের চূড়ান্ত ফলাফল। আপাতত বিশ্বমঞ্চে নিজের জায়গা তৈরি করার লড়াই বাংলাদেশকে এক নতুন মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।


Bangladesh: Zubaida Rahman, Khalilur Rahman lobby to clear hurdles for PM Tarique Rahman’s US visit-northeast news .



সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:০৬
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মস্তিষ্ক কাজ করার আগেই যখন উত্তর চলে আসে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৭


মস্তিষ্ক কাজ করার আগেই যখন উত্তর চলে আসে

একসময় কোনো প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে মানুষকে ভাবতে হতো। বই খুলতে হতো, লাইব্রেরিতে যেতে হতো, কারও সঙ্গে আলোচনা করতে হতো, ভুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্বাবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ-পর্ব ৪

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:১৬


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি ।
একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট
[link|https://www.somewhereinblog.net/blog/ali2016/3039397|১ম পর্বে থাকা গবেষনাটির পটভুমির লিংক – পর্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাধু সাবধান!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:২১

রোমান সাম্রাজ্যের পম্পেই এবং বর্তমান বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও সময়কাল সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও, মানুষের সামাজিক আচরণ এবং নৈতিক স্খলনের কিছু ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নিচে পম্পেইয়ের সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকারের ছয় মাসের পোস্টমর্টেম....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:১০



সরকারের ছয় মাসের পোস্টমর্টেমঃ সমর্থনের জায়গা থেকেই কিছু কঠিন কথা.....

ছয় মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়- কিন্তু একটি সরকারের দিকনির্দেশনা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার কিছুটা ধারণা পাওয়ার জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পাঠের সওয়াব

লিখেছেন শিমুল মামুন, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬


লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। এর ফজিলত ও সওয়াব অনেক বেশি। আমলটি করার ব্যাপারে হাদিসে অনেক বর্ণনা এসেছে।

সাগরের ফেনা পরিমাণ গুনাহ মাফ হয়
আবদুল্লাহ ইবনে আমর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×