somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যুদ্ধের মাঝেই আম্মানে তিন রাত দুই দিন

০৫ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে এয়ারলাইন্স তাদের সময়সূচি পরিবর্তন করায় আমাদের জর্ডানের আম্মানে অনেকটা বিনা পরিকল্পনায় তিন রাত অবস্থান করতে হয়। আমরা যখন কুইন আলিয়া বিমানবন্দরে পৌঁছাই, তখন প্রায় মধ্যরাত। ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর টার্মিনালের বাইরে আসতেই মিললো এয়ারপোর্ট ট্যাক্সি সার্ভিস, দেখলাম অনেক ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে যাত্রীর অপেক্ষায়। পাশে একটা বুথে হোটেলের নাম বলতে একটা ভাড়ার স্লিপ দিয়ে দিল। ভাড়া সাড়ে ২২ দিনার।  আম্মান বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৩০ কিমি, আধা ঘণ্টায় হোটেলে চলে এলাম। ফ্রন্ট ডেস্কে স্থানীয় একটা ছেলে, বেশ ভদ্র চটপটে, অল্পক্ষনের মাঝেই আমাদের রুমের ব্যবস্থা হয়ে গেল।
হোটেলটি বেশ ভালো। রুমটিও ছিল বেশ বড় সর এবং সুন্দর, ঘুমানোর জন্য বেশ। রুমে গিয়ে আমরা ফ্রেশ হলাম এবং কিছু খাবার অর্ডার করলাম— ক্লান্তিকর যাত্রার পর একটু স্বস্তি পেলাম।
আমি এবং আমার স্ত্রী আম্মান বিমান বন্দর হয়ে আগেও আসা যাওয়া করেছি, কখনো বিমান বন্দরের বাইরে যাওয়া হয়নি। সুযোগ যখন হয়েই গেলো পরের দিন সকালে নাস্তা করার পর শহর দেখতে বের হলাম। মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ, দেখলাম শীত এখনো যায়নি। তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি ফার্নহিটের মতো ( ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস), বাতাসও আছে কিছু। কাজেই জ্যাকেটটা পরেই নিলাম।

আম্মান একটি পাহাড়ি শহর, উঁচু-নিচু রাস্তা। শহরের বেশিরভাগ বাড়ি পাহাড়ের ঢালুতে বিভিন্ন স্তরে নির্মিত। লক্ষ্য করলাম, আমাদের হোটেলও পাহাড়ের ঢালে নির্মিত, হোটেলে ঢোকার রাস্তা পাহাড়ের মাথায়, লবি ৯ তলায় এবং রুম সব নিচে !


ইন্টারনেটে খোঁজ করতে গিয়ে প্রথমেই যে দর্শনীয় স্থানটির কথা সামনে আসে তা হলো সিটাডেল—প্রায় তিন থেকে চার হাজার বছরের পুরোনো একটি স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। বিদেশিদের জন্য প্রবেশমূল্য ২ জর্ডানিয়ান দিনার (প্রায় ৩ মার্কিন ডলার), আর স্থানীয়দের জন্য আধা দিনার। ভেতরে প্রবেশ করে কিছু সময় প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের মধ্যে হাঁটতে বেশ ভালোই লাগলো। অদূরে পাহাড়ের ঢালে আম্মান শহরের দৃশ্য অপরূপ মনে হলো !

[Amman Citadel - Wikipedia](Click This Link.)

এরপর আমরা সেভেন স্লিপার্স কেভে যাই, স্থানীয়দের দাবি এই সেই গুহা যেখানে কুরআনের সূরা আল-কাহফে বর্ণিত যুবকেরা ৩০৯ বছর ঘুমিয়ে ছিলেন। ট্যাক্সি চালক এই গুহার গুরুত্ব সম্পর্কে উৎসাহের সাথে বর্ণনা করছিলেন। রাস্তা থেকে সামান্য নিচে নেমেই গুহার প্রবেশ পথ। সেখানে আমরা আরও কয়েকজন দর্শনার্থীকে দেখি —যাদের বেশিরভাগই বিদেশি— গুহার বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখছিলেন, যার মধ্যে পাথরে খোদাই করা ঘুমানোর জায়গার মতো কিছু অংশও ছিল। একজন গাইড কুরআনিক ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন।

তবে কুরআনে এই গুহার সঠিক অবস্থান নির্দিষ্ট করা হয়নি, এমনকি যুবকদের নির্দিষ্ট সংখ্যাও উল্লেখ করা হয়নি। রাসূল (সা.) থেকে এমন কোনো সহীহ হাদিসও নেই যা নির্দিষ্ট কোনো স্থান নির্দেশ করে। বরং কুরআনেই আল্লাহ বলেন, এই ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিবরণ খুব কম লোকই প্রকৃতপক্ষে জানে। কাজেই এটিই সেই নিশ্চত গুহা বলে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। শুনেছি তুরস্কেও এমনি গুহা আছে বলে স্থানীয়রা দাবি করে !

[Cave of the Seven Sleepers - Wikipedia](Click This Link)

ফেরার পথে ট্যাক্সি চালক আমাদের শহরের আরেকটি দর্শনীয় স্থানে নিয়ে গেলেন—কিং আবদুল্লাহ মসজিদ কমপ্লেক্স। বড় এবং সুন্দর মসজিদ, ১৯৮২ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে নির্মিত। মসজিদের মূল অংশটি ঢেকে আছে একটি বিশাল নীল মোজাইক গম্বুজ, যার নিচে প্রায় ৩,০০০ মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। ভিতরে সাজসজ্জা সুন্দরভাবে করা হয়েছে, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।

[King Abdullah I Mosque - Wikipedia](Click This Link)

মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হোটেলে, দোকান পাটে প্রায়ই বাংলাদেশী ভারতীয় লোকজনকে কাজ করতে দেখা যায়, কিন্তু আম্মানে তেমন খুব একটা চোখে পড়লো না। এ ধরণের কাজে স্থানীয় লোকজনই দেখলাম সব। এরই মাঝে বার কয়েক যুদ্ধকালীন বিমান আক্রমনের সতর্কতা মূলক সাইরেন বাজতে শুনলাম, কিন্তু কাউকে তেমন একটা গুরুত্ব দিতে বা কোনো সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা নিতে দেখলাম না ! লোকজনকে দেখে মনে হলো এগুলো শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে !

পরের দিন দুপুরের খাবারের পরে আমরা গ্র্যান্ড হুসেইনি মসজিদের আশেপাশের পুরনো ডাউনটাউন এলাকা ঘুরে দেখলাম। এটি অনেকটা আমাদের ঢাকার নিউ মার্কেট–গাউসিয়া মার্কেটের মত; ছোট ছোট অসংখ্য দোকান পরপর সাজানো, এখানে সব ধরনের জিনিস পাওয়া যায়—জুতো, কাপড়, ব্যাগ, আবায়া, বুরখা, থালা বাটি, ফল, সবজি, মাছ, মাংস, মুরগি—সবকিছুই! অনেক লোকের ভিড়ে কিছু বাংলাদেশী লোকেরও দেখা মিললো। কিছুক্ষন ঘুরা ফিরা করে শেষে এক ভারতীয় রেস্তোরাঁ পেয়ে গেলাম। সেখানে আমরা রাতের খাবার খাই—ভাত, মাছ এবং ডাল—এক বাংলাদেশী আপা নিজেই নাকি রান্নাও করেন, এনে দিলেন, বেশ ভালো রান্না ! বেশ কয়েকদিন আরবি খাবারের পর দেশি ভাত, মাছ ডাল মনে হলো অমৃত !

ট্যাক্সি করে হোটেলে যখন ফিরে আসি সূর্য তখন অস্তাচলে, কখনো উঁকি দেয়, কখনো লুকায় পাহাড়ের আড়ালে! পরদিন আমাদের ফ্লাইট, প্রস্তুতি নিতে হবে বিদায়ের।

করুনাধারার পরামর্শে আমার তোলা কয়েকটা ছবি দিলাম :

পুরানো ডাউনটাউন এলাকার কিং তালাল রোডের বাজার



সিটাডেল—প্রায় তিন থেকে চার হাজার বছরের পুরোনো একটি স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ



অদূরে পাহাড়ের ঢালে আম্মান শহরের দৃশ্য



সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৩১
৬টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সকালে শিক্ষক, বিকালে সবজি বিক্রেতা

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:৪৯


মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর বিভিন্ন আলোড়ন সৃষ্টিকারী পদক্ষেপে যখন মিডিয়া জগৎ সয়লাব এমনি সময় হটাৎ করেই ইউ টিউবে একটা ভিডিও চোখে পড়লো। ২ মিনিটের এ ভিডিওটা সেলফ এক্সপ্লানেটোরি ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মায়াময় স্মৃতি, পবিত্র হজ্জ্ব- ২০২৫….(৯)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১৬

অষ্টম পর্বের লিঙ্কঃ পবিত্র হজ্জ্ব- ২০২৫ এর মায়াময় স্মৃতি….(৮)

১০ই জিলহজ্জ্ব তারিখে (০৬ জুন ২০২৫) সূর্যোদয়ের আগেই আমরা মুযদালিফা থেকে রওনা হয়ে সকাল সকাল ‘বড় জামারাত’ বা জামারাত আল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুদিত, অনূদিত এবং অনুবাদিত, কোনটার কী অর্থ?

লিখেছেন নতুন নকিব, ২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৫৪

অনুদিত, অনূদিত এবং অনুবাদিত, কোনটার কী অর্থ?

অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।

প্রথমেই বলা দরকার, "অনূদিত" শব্দটি সাধারণত সঠিক এবং প্রমিত বানান হিসেবে ব্যবহৃত হয় যখন অর্থ "অনুবাদ করা হয়েছে এমন" বা "ভাষান্তরিত"... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শেকল ভাঙার গান

লিখেছেন ইসিয়াক, ২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:০২

রক্ত-আগুনে প্রতিবাদ চলুক,
বিক্ষোভের অনলে সারাদেশ জ্বলুক ।
শেষ থেকে শুরু হোক না আবার,
নতুন করে তো কিছু নেই হারাবার!

পুনরায় বিনাশিব তিমির রাত
আঁধার কেটে জাগবে প্রভাত।

দিকে দিকে সংগঠিত হও... ...বাকিটুকু পড়ুন

Diplomacy is not tourism

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৫৯


আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তে আটলান্টিকের তীরে সেনেগালের রাজধানী ডাকার। এপ্রিলের শেষে সেখানে বসেছে 'Dakar International Forum on Peace and Security in Africa'-এর দশম আসর। নামটা দীর্ঘ হলেও এবারের হাওয়া বেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×