
২০২২ সাল। র্যাবের উপর আমেরিকার স্যাংশন পড়েছে। বিষয়টা ভালোভাবে বুঝতে ইউটিউবে ঢুঁ মারলাম। কয়েকটা ভিডিও দেখার পর সামনে এলো "Zahid Takes" নামের একটা চ্যানেলে। প্রথম দেখায় মনে হলো লোকটা ঠিকঠাক কথা বলেন। শেখ হাসিনার কূটচাল বেশ গুছিয়ে এক্সপোজ করতেন। জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধেও কথা বলতেন। সবকিছু ভালোভাবে চলছিলো ।
জাহিদ ভাই ডাক্তারি পড়েছেন। নিজেকে সবসময় সিভিল সোসাইটির মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতেন। পরিচয় দিতেন নিরপেক্ষ বিশ্লেষক হিসেবে। যে দর্শকগোষ্ঠী তাঁর ভিডিও নিয়মিত দেখতেন তাঁরা বেশিরভাগই শিক্ষিত এবং প্রগতিশীল ধারণার মানুষ, যাঁরা চরম মাত্রার পরিচয়বাদী-রাজনীতির ঘোর বিরোধী। এই কারণেই জাহিদ ভাই আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে তিনি প্রচুর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। জামাতের এক নেতা শাহরিয়ার কবির তাকে প্রায় নাস্তিক বলে অনলাইনে ফাঁসিয়ে দিয়েছিলো। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আওয়ামী লীগের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা উনার নাম দিয়েছিল 'কষা জাহিদ' , আর এখন জামায়াত সেই নামটা নিয়েই ট্রল করছে। দুই দিক থেকেই চাপে ছিলেন, তবু নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন বলে মনে হয়েছিল। তখন মনে মনে ভেবেছিলাম এই লোকটা অন্তত শেষ পর্যন্ত নিরপেক্ষ থাকবেন। ভুল ভেবেছিলাম।
কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, জাহিদ ভাইয়ের আসল চেহারাটা তত পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। ৫ই আগস্টের পর পরিষ্কার বোঝা গেল জাহিদ ভাই আসলে বিএনপি পন্থী একজন মানুষ। বিএনপির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উনাকে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে, টকশোতে গিয়ে তিনি জানপ্রাণ দিয়ে বিএনপিকে ডিফেন্ড করে এসেছেন। ইলেকশনের পর তিনি তারেক রহমানের উপদেষ্টা হয়ে গেলেন। বাংলাদেশে যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী ভাবেন, তাদের কেনা যে কত সহজ সেটা জাহিদ ভাইকে না দেখলে বিশ্বাস হতো না।
বিএনপি-জামাত মিলে বেশ একটা পরিকল্পিত খেলা খেলেছে। জাহিদ ভাইকে উপদেষ্টা বানিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আগে যিনি মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, মাজার আক্রমণের বিরুদ্ধে, হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অজস্র প্রতিবাদমূলক ভিডিও বানাতেন, এখন তিনি মাসে দুয়েকটা ভিডিও ছাড়েন, যেগুলো ঘুরেফিরে এনসিপি আর জামাতের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে। মানুষের প্রাণের মায়া থাকে, এটা বুঝি। হয়তো নিজেকে বাঁচাতেই দলের সাথে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু যখন দেখি উপদেষ্টা হওয়ার পরেও স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছেন না, তখন সহানুভূতি ধরে রাখা কঠিন হয়।
সম্প্রতি বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে জাহিদ ভাই কিছু মন্তব্য করেছেন। এগুলো নতুন কথা নয়। উপদেষ্টা হওয়ার আগে নিজের ভ্লগেও বহুবার বলেছেন যে ৮-১০ বছর ধরে বিসিএস দিয়ে সময় নষ্ট না করে উৎপাদনশীল কাজ করা দরকার। তাতে দ্বিমত নেই। কিন্তু এই কথাটা এখন বলার সময় কি ঠিক আছে? বিএনপি সরকার মাত্র তিনদিন আগে চাকরির বয়সসীমা ৩২ করে বিল পাস করল। আর এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এসে বললেন সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স আরও কমানো উচিত।
জাহিদ ভাইয়ের এখন এসব উল্টোপাল্টা মন্তব্য করার কি দরকার? তিনি কি ভুলে গেছেন , কোটা সিস্টেম নিয়ে কারসাজি করতে গিয়েই শেখ হাসিনাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে? চাকরিপ্রার্থী আর ছাত্রদের এভাবে ক্ষেপিয়ে তুললে দেশ চালানো কি সম্ভব? এখনও একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও ছাত্রদলের দখলে নেই, এমন অবস্থায় জাহিদ ভাইয়ের এই মন্তব্যগুলো বিএনপির প্রতি তরুণ প্রজন্মের অবিশ্বাসই কেবল বাড়াবে। এমনিতেই মোবাশ্বের কমিশনের এক বছরে ৫ বিসিএস শেষ করার তাড়াহুড়ো নিয়ে সবাই প্যানিক অ্যাটাকের মধ্যে আছে, তার ওপর প্রশ্নের ধরন বদলে ‘থিংক আউট সাইড দ্য বক্স’ করার নামে বিসিএসকে অজনপ্রিয় করার কোনো হিডেন মিশন চলছে কি না সেই প্রশ্নও সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
বিসিএস ক্যাডারদের সুযোগ-সুবিধা কমানোর আলাপটা বর্তমান বাজারে কতটা নিষ্ঠুর তা ভাবা দরকার। শেষ পে-স্কেল হয়েছিল ২০১৪ সালে। অন্তর্বর্তী সরকার নতুন পে-স্কলের জন্য কিছু টাকা বরাদ্দ রাখলেও বিএনপি সরকার তা পাবলিক সার্ভিস এক্সপেন্সে খরচ করে ফেলেছে, যা নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। ২০১৪ সালের বেসিকে বর্তমানে একজন সৎ চাকরিজীবীর সংসার চালানো যে কতটা কঠিন তা জাহিদ ভাইয়ের মতো তথাকথিত সিভিল সোসাইটির লোকজন কখনো বুঝতে পারবেন না ।
আরেকটি আশঙ্কার কথা হলো, জাহিদ ভাইয়ের মতো প্রাইম মিনিস্টারের উপদেষ্টা যখন বিসিএস নিয়ে নেতিবাচক কথা বলেন, তখন চাকরিপ্রার্থীরা মনে করেন এটা হয়তো বিসিএসকে ডিমোটিভেট করে নিজেদের লোক ঢোকানোর কোনো ফন্দি। এদিকে বিএনপি কিছু পপুলিস্ট কাজ শুরু করেছে, যেমন বিকল্প ব্যবস্থা না করেই হকার উচ্ছেদ। অথচ উচ্ছেদ করা দরকার ছিল অটো রিকশা, যা ২০২৪ সালের পর নতুন করে ২০ লাখ রাস্তায় নেমেছে। ঢাকায় এক-দুই দিনের জন্য আসলেও এখন যানজটে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়।
ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স নিয়ে বিএনপি এক নতুন ঝামেলা পাকিয়েছে । লুটেরা এস আলম আর নাসা গ্রুপের কাছে আবার কম্বাইন্ড ইসলামিক ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়ার আলামত দেখা যাচ্ছে। বাজারে গুঞ্জন আছে, আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যে পর্দার আড়ালে কোনো গোপন সমঝোতা আর বিপুল টাকার লেনদেন হয়েছে । এদিকে সোশাল মিডিয়া খুললেই দেখি : শিক্ষামন্ত্রী মিলন সাহেব শুধু নকলের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে যাচ্ছেন, যা নিয়ে মিডিয়াও এখন মশকরা শুরু করেছে।
চারদিকের এই অস্থিরতার মাঝে জাহিদ ভাইয়ের বিসিএস নিয়ে আগ বাড়িয়ে কথা বলা বিএনপির জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে। ভালো কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়িয়ে বয়স নিয়ে কড়াকড়ি এবং আমলা বা ক্যাডারদের সুযোগ-সুবিধা কমাতে যাওয়ার মানেই হলো বিপদ ডেকে আনা। শেখ হাসিনার পতন কিন্তু এই আমলা আর ছাত্রসমাজের ক্ষোভ থেকেই শুরু হয়েছিল। তাই এখন যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের বোঝা উচিত, বাঘের লেজ (আমলাতন্ত্র আর ছাত্রসমাজ) দিয়ে কান চুলকানো মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। জাহিদ ভাই উপদেষ্টা হয়ে হয়তো নিজের মুখ বন্ধ করেছেন, কিন্তু তাদের ক্ষোভের আগুন নেভানো এত সহজ হবে না।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



