somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এহসানুল হক মিলন: টাইম মেশিনে আটকে থাকা এক শিক্ষামন্ত্রী

১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সাদা-কালো টেলিভিশন আর ল্যান্ডফোনের জামানায় এহসানুল হক মিলন যখন হেলিকপ্টারে চড়ে আকাশ থেকে নকলবাজ ধরার মিশনে নামতেন, তখন লোকে তাকে ‘বাংলার জেমস বন্ড’ ভেবে হাততালি দিত। সময় বদলেছে, মই বেয়ে জানালা দিয়ে নকল সরবরাহের সেই রোমাঞ্চকর দিন এখন জাদুঘরে যাওয়ার কথা, কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী যেন টাইম মেশিনে চড়ে সেই ২০০১ সালেই আটকে আছেন। নতুন সরকার গঠনের পর দুই মাস হতে চলল, অথচ তার প্রতিটি সকাল শুরু হয় ‘নকল ধরিব’ আর রাত শেষ হয় ‘নকলের একদিন কি আমার একদিন’ টাইপ হুঙ্কার দিয়ে। ডিজিটাল বাংলাদেশের গল্প পেরিয়ে আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করছি, তখন আমাদের মন্ত্রী মহোদয় ব্যস্ত আছেন ছোট ছোট বাচ্চাদের চুলের ছাঁট বাটি হবে না কি স্পাইক হবে তা নিয়ে গাইডলাইন তৈরি করতে।

রাস্তাঘাটে শিশুদের দেখলে এখনকার অভিভাবকরা হয়তো আশা করেন মন্ত্রী তাদের নতুন কোনো কোডিং ভাষা বা বিজ্ঞানের জটিল সূত্রের সহজ ব্যাখ্যা দেবেন, কিন্তু মিলন সাহেব রীতিমতো তর্জনী উঁচিয়ে শিশুদের ধমক দিচ্ছেন যাতে তারা পরীক্ষার হলে ঘাড় না ঘোরায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার এসব ভিডিও দেখে হাসাহাসির রোল উঠলেও মন্ত্রীর তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই, তিনি যেন পণ করেছেন পুরো জাতিকে সিসিটিভির নিচে বসিয়ে ঘাড় সোজা করে রাখবেন। অথচ তিনি একবারও ভাবছেন না যে, বর্তমানের জিপিএ-ফাইভের বন্যায় ভেসে যাওয়া যুগে শিক্ষার্থীরা নকল করবে কেন, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা উদারহস্তে নম্বর বিলিয়ে দেওয়াই এখনকার বড় সংকট। আড়াই দশক আগের সেই মই সংস্কৃতি এখন নেই বললেই চলে, কিন্তু মন্ত্রীর মগজে সেই মই এখনো গেঁথে আছে।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, শিক্ষার মান যখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে যোগ্য উপাচার্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে, তখন মন্ত্রী মহোদয় ব্যস্ত আছেন বাটি ছাঁট নিয়ে। একটি শিশু তার মাথায় কতটুকু চুল রাখবে তার সাথে শিক্ষার মানের কী সম্পর্ক তা কোনো আধুনিক শিক্ষাবিদ হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারবেন না, কিন্তু আমাদের মন্ত্রী এটিকেই মহৎ কাজ বলে মনে করছেন। উন্নত বিশ্বে শিশুরা যখন একাধিক ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠছে এবং প্রযুক্তিতে বিশ্ব জয় করছে, আমাদের মন্ত্রী তখন ভাবছেন পরীক্ষার হলে ঘাড় ঘোরানো বন্ধ করলে দেশ বুঝি জ্ঞান-বিজ্ঞানে জোয়ার ভাসিয়ে দেবে। অথচ এই দুই মাসে তিনি একটিবারও বলেননি যে কেন বারো বছর ইংরেজি পড়েও একজন শিক্ষার্থী শুদ্ধ করে একটি আবেদনপত্র লিখতে পারে না।

শিক্ষার আসল গলদটা যে শ্রেণিকক্ষে যোগ্য শিক্ষকের অভাব কিংবা কারিকুলামের অসারতা, সেটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই কি মন্ত্রী এই নকলের পুরনো কাসুন্দি ঘাটছেন কি না সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আগের আমলে তিনি সফল ছিলেন কারণ তখন পরিস্থিতি তেমন ছিল, কিন্তু এখনকার চ্যালেঞ্জটা ভিন্ন। দলীয় প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের আস্তানায় পরিণত করা কিংবা পছন্দের লোক বসানোর ক্ষেত্রে তিনি গতানুগতিক রাজনীতিকদের চেয়ে মোটেও আলাদা কিছু করতে পারেননি। দেশের আট রকমের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক সুতায় গাঁথা কিংবা মাদ্রাসার আধুনিকায়ন নিয়ে কথা না বলে তিনি যখন রাস্তাঘাটে সিসিটিভি আর চুল কাটা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে আধুনিক শিক্ষার সংকট বোঝার সক্ষমতা তিনি হয়তো হারিয়ে ফেলেছেন।

মানুষ এখন আর কেবল পরীক্ষা কেন্দ্রে পুলিশিং দেখতে চায় না, মানুষ চায় তার সন্তান যেন বিশ্বমানের শিক্ষা পায়। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য শিশুদের ভয় দেখানো কিংবা মান্ধাতা আমলের কায়দায় মন্ত্রণালয় চালানো যে আধুনিক যুগে অচল, সেটা মন্ত্রী যত দ্রুত বুঝবেন ততই মঙ্গল। নকল বন্ধের সেই পুরনো ক্রেডিট কার্ড আর কতদিন ভাঙিয়ে খাবেন তিনি সেই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। শিক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অনিয়ম আর রাজনীতি ঢুকে পড়েছে, সেগুলো পরিষ্কার না করে কেবল পরীক্ষার হলের গেটে পাহারা দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিজেকে সফল দাবি করাটা নিছক আত্মতুষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল ব্যবস্থার, কিন্তু মিলন সাহেব আমাদের উপহার দিচ্ছেন কেবল দুই দশক পুরনো স্মৃতির পুনরাবৃত্তি।

শিক্ষামন্ত্রী নকল নিয়ে পড়ে আছেন কেন?
https://bangla.bdnews24.com/opinion/78d968a9f4b1
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:১১
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাঘের লেজ দিয়ে কান চুলকানো বুদ্ধিমানের পরিচয় নয়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:০৯


২০২২ সাল। র‍্যাবের উপর আমেরিকার স্যাংশন পড়েছে। বিষয়টা ভালোভাবে বুঝতে ইউটিউবে ঢুঁ মারলাম। কয়েকটা ভিডিও দেখার পর সামনে এলো "Zahid Takes" নামের একটা চ্যানেলে। প্রথম দেখায় মনে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাজনীতি - আপনার পরিচয় দিন

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:১১



জামাত শিবির ও আওয়ামী লীগ এখন একযোগে বিএনপির বিরুদ্ধে কাজ করছে। বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগের সখ্য হওয়া কখনও সম্ভব না। নট পসিবল। তবে জামাত শিবিরের সাথে আওয়ামী লীগের সখ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি না আসিয়া যাইবা কই!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৯:২৪



বিশ্বাস ও আচরণে লালনপালন করি আমরা বিপুল বৈপরীত্য!
একধরনের তথাকথিত লৌকিকতায় আমাদের অবগাহন যা সন্দেহাতীত ভানসর্বস্ব।

নিজেও জ্ঞাত নই আজ বাংলার বয়স।
বানের জলের মতো আসিতেছে আর আসিতেছে- এসো হে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পারলে একবার সোহাগী ঘুরে যেও।

লিখেছেন রাজা সরকার, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

পারলে একবার সোহাগী ঘুরে যেও।

আজ সারাদিন কোনো কাজ করিনি,,কারো কথা শুনিনি, যা যা কাজের কথা বলা হয়েছিল তার সব উত্তর হয়েছিল ‘পারবো না, পারবো না’। আজ সারাদিন সূর্যের দেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা নব বর্ষের সেকাল একাল

লিখেছেন কালো যাদুকর, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:১০

৯০ দশকের বাংলা নব বর্ষ বেশ ঘটা করে পালন হত । শহরে এই দিনটি পালনের সাথে আনন্দ উদযাপন, গান , পথ নাটক, বাংলা ব্যান্ডের বিশাল আয়োজন , পান্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×