
বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকট নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, যত টকশো হচ্ছে, যত বিশেষজ্ঞ মতামত দিচ্ছেন, তার কিছুই ব্যাংকের সামনে লাইনে দাঁড়ানো মানুষটার কাজে লাগছে না। তিনি জানতে চান একটাই কথা, তার সারাজীবনের সঞ্চয় কবে ফেরত পাবেন। সেই প্রশ্নের উত্তর আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেননি। এই লেখা সেই উত্তর খোঁজার চেষ্টা, এবং সেই প্রক্রিয়ায় বোঝার চেষ্টা যে আমাদের বিশেষজ্ঞ, সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা, এদের দৌড় আসলে কতটুকু।
গোড়ার ঘটনাটা আগে বোঝা দরকার। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে এস আলম গ্রুপ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড দখল করে। সেদিন ভোরবেলা ব্যাংকের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে ঢাকার একটি হোটেলে নিয়ে গিয়ে পদত্যাগপত্রে সই করানো হয়। এরপর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, মোট আটটি ব্যাংক কার্যত এস আলমের ব্যক্তিগত কোষাগারে পরিণত হয়। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের হিসাব বলছে এই একটি গোষ্ঠী এগারোটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে। এস আলমের বাড়ির গৃহকর্মীর নামে ২৯টি অ্যাকাউন্টে শত কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, শেল কোম্পানির মাধ্যমে একদিনেই সিঙ্গাপুরে পাচার হয়েছে শত শত কোটি টাকা। এটা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, এটা ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত পরিকল্পিত লুট।
২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথমেই কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেয়। এস আলমের বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়, নতুন প্রশাসক বসানো হয়, এস আলমের শেয়ার সরকার নিয়ে নেয়। পাশাপাশি পাঁচটি বিপর্যস্ত ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল এবং এক্সিম ব্যাংককে একত্রিত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। এই মার্জারের পেছনে যুক্তি ছিল যে পাঁচটি আলাদা ডুবন্ত জাহাজের চেয়ে একটি বড় জাহাজ সামলানো সহজ। কিন্তু একই সময়ে সরকার এই ব্যাংকগুলোতে জনগণের করের টাকা থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঢেলে দেয়, যেখানে ২০ হাজার কোটি সরাসরি সরকারি বিনিয়োগ এবং বাকিটা তারল্য সহায়তা ও ডিপোজিট সুরক্ষা তহবিল থেকে। এরপর আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের সাথে মিলে একটি তিন বছরের সংস্কার রোডম্যাপ তৈরি করা হয়, যেখানে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন, দেউলিয়া আইন আনা, সম্পদ উদ্ধারের framework তৈরিসহ নানা পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু এখানে একটা মৌলিক contradiction আছে যেটা না বললেই নয়। আইএমএফের নীতি হলো বেসরকারি ব্যাংক সংকটে পড়লে আগে মালিকরা ক্ষতি বহন করবেন, তারপর প্রয়োজনে সরকার আসবে। অর্থাৎ public money যাবে সবার শেষে, সবার আগে নয়। অন্তর্বর্তী সরকার করেছে ঠিক উল্টো। আগে ৩৫ হাজার কোটি টাকা জনগণের পকেট থেকে ঢেলেছে, তারপর আইএমএফের সাথে বসে রোডম্যাপ বানিয়েছে। এই রোডম্যাপ আসলে ভুল সিদ্ধান্তকে আড়াল করার একটা diplomatic চেষ্টা কিনা, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে দেখল সামনে দুটো দেওয়াল। একদিকে আইএমএফ বলছে আর public money দেওয়া যাবে না, অন্যদিকে ব্যাংকে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত ঝুঁকিতে। নতুন করে বাজেট থেকে টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই, কারণ রাজস্ব ঘাটতি চলতি অর্থবছরের নয় মাসেই প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার বলল যে বেসরকারি পুঁজি ছাড়া ব্যাংক বাঁচানো সম্ভব নয়, তাই পুরনো উদ্যোক্তাদের ফিরিয়ে এনে নতুন পুঁজি আনার সুযোগ দেওয়া হোক। এই যুক্তির ভিত্তিতেই এপ্রিলের ১০ তারিখে সংসদে Bank Resolution Act 2026 পাস হলো, যার মূল বিতর্কিত সংযোজন হলো ১৮(ক) ধারা।
১৮(ক) ধারার আসল চেহারাটা বোঝা দরকার, কারণ এটাকে ঘিরে যত বিতর্ক হচ্ছে তার অনেকটাই সঠিক কিন্তু অসম্পূর্ণ। কাগজে ধারাটা এরকম: পুরনো শেয়ারহোল্ডার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে "fit and proper" বলে বিবেচিত যেকোনো ব্যক্তি ব্যাংক ফিরে পেতে আবেদন করতে পারবেন। আবেদন করতে হলে তাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব টাকা ফেরত দেবেন, নতুন মূলধন আনবেন, আমানতকারীদের সব দাবি মেটাবেন এবং শাসন ব্যবস্থা ঠিক করবেন। আর্থিক শর্ত হলো মোট ইনজেক্ট করা অর্থের মাত্র ৭.৫ শতাংশ upfront দিতে হবে, বাকি ৯২.৫ শতাংশ দুই বছরে ১০ শতাংশ সুদে দেওয়া যাবে। অনুমোদনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক দুই বছর নজরদারি করবে এবং শর্ত না মানলে অনুমোদন বাতিল হবে।
শুনতে কঠিন মনে হলেও এই ধারার ভেতরে কয়েকটা মারাত্মক ফাঁকি আছে। প্রথমত, ownership আগে, টাকা পরে। মানে চাবি পাওয়া আগে, দাম দেওয়া পরে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে সরকার ৩৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। পুরনো মালিক মাত্র ২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা দিয়েই পুরো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারবেন, বাকিটা প্রতিশ্রুতি। যে গোষ্ঠী হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে তাদের কাছে এই ২ হাজার ৬২৫ কোটি কিছুই না। দ্বিতীয়ত, এই ধারায় স্পষ্ট লেখা আছে "notwithstanding anything contained in any other law", অর্থাৎ এটি দেশের অন্য সব আইনকে override করে। এর মানে হলো দুর্নীতি দমন কমিশনের চলমান মামলা এবং আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে পড়তে পারে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজের কর্মকর্তারাই বলছেন একবার মালিকানা ফিরে গেলে আর সহজে ফিরিয়ে আনা যাবে না। চতুর্থত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই ধারায় পাচার করা বা আত্মসাৎ করা টাকা আগে ফেরত দেওয়ার কোনো পূর্বশর্ত নেই। প্রতিশ্রুতিই যথেষ্ট।
আইএমএফ এই পুরো বিষয়টি নিয়ে শুধু উদ্বিগ্ন নয়, রীতিমতো ক্ষুব্ধ। $৫.৫ বিলিয়নের loan programme-এর ১.৩ বিলিয়ন ডলারের কিস্তি জুনের মধ্যে ছাড় হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইএমএফ বলছে বাংলাদেশ রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং সংস্কার, জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, এই চারটি প্রতিশ্রুতির কোনোটাই ঠিকমতো পালন করেনি। ১৮(ক) ধারা এই সংকট আরও গভীর করেছে, কারণ এটি সেই সংস্কার প্রক্রিয়াকে উল্টে দিয়েছে যা আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরে চেয়ে আসছিল। বিএনপি সরকার এখন একটা vicious cycle-এ আটকে গেছে। IMF loan নেই বলে বিদেশি অর্থায়ন কমছে, তাই সরকার দেশীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে, এতে ব্যাংকের উপর চাপ আরও বাড়ছে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ১৮(ক) ধারা বাতিল করতে হবে, অপরাধীদের ধরতে হবে, পাচার করা টাকা ফেরত আনতে হবে, রাজনীতিমুক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিটা কথাই সঠিক। কিন্তু এই কথাগুলো বলার পর যেটা হচ্ছে না সেটা হলো তাৎক্ষণিক সমাধান। এস আলম সিঙ্গাপুরে বসে ICSID-তে আন্তর্জাতিক সালিশি মামলা করেছেন। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আইনি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়েছেন। এই লড়াই কমপক্ষে এক দশক চলবে। মার্জ হওয়া ব্যাংকগুলোর ৮৪ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। এই টাকা আদালত, নিলাম এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ধার করতেও বছরের পর বছর লাগবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন কী করা উচিত, কিন্তু এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলো কীভাবে বাঁচবেন সেটা কেউ বলছেন না।
তাহলে টাকা আসবে কোথা থেকে? সত্যিকারের হিসাব করলে সব রাস্তাই বন্ধ অথবা অত্যন্ত দীর্ঘ। পাচার করা টাকা ফেরত আনা কমপক্ষে দশ থেকে পনের বছরের লড়াই। খেলাপি ঋণ আদায় বছরের পর বছরের কোর্ট কেস। নতুন কোনো বিনিয়োগকারী আসবেন না ৮৪ শতাংশ খেলাপি ঋণের ব্যাংকে। সরকারি বাজেট থেকে আরও টাকা দেওয়া সম্ভব নয়, আইএমএফও দিতে দেবে না। আর ১৮(ক) দিয়ে পুরনো মালিক ফিরলেও সেই পুরানো ভয় , বিদেশে টাকা পাচার করা।
এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম সত্যিটা হলো এখানে কোনো painless সমাধান নেই। এস আলম যে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা সরিয়েছেন সেটা সিঙ্গাপুরে বাড়ি হয়েছে, সম্পদ হয়েছে। ওই টাকা গেছে। এখন সেই ক্ষতি কেউ না কেউ বহন করবেই। হয় আমানতকারী পুরো টাকা পাবেন না, হয় করদাতার টাকা দিয়ে ঢাকার চেষ্টা হবে, হয় পুরনো মালিক ফিরে আসবেন কিন্তু তারা ফিরে এলে আগের মতোই লুটপাট শুরু হতে পারে । কেউ এই সত্যিটা সরাসরি বলছেন না।
এখানেই সবার দায় এড়ানোর প্যাটার্নটা স্পষ্ট হয়ে যায়। বিএনপি সরকার ১৮(ক) দিয়ে দায় বেসরকারি খাতে ঠেলে দিতে চাইছে। অন্তর্বর্তী সরকার আগে জনগণের টাকা ঢেলেছে, তারপর সেটা আড়াল করতে রোডম্যাপ বানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা ঠিক কথা বলছেন কিন্তু তাৎক্ষণিক কোনো দায় নিচ্ছেন না। আইএমএফ নীতির কথা বলছে কিন্তু ব্যাংকের সামনের মানুষটার কথা তাদের হিসাবে নেই। সবাই সঠিক অবস্থানে আছেন, কিন্তু কেউ দায় নিতে রাজি নন। এটাই বাংলাদেশের ট্র্যাজেডি, এবং এই ট্র্যাজেডির চূড়ান্ত মূল্য দিচ্ছেন সেই মানুষ যিনি সারাজীবন একটু একটু করে সঞ্চয় করেছেন এবং এখন ব্যাংকের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


