somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অধঃপতন

১২ ই মে, ২০২৬ রাত ২:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কারিনা কায়সার এখন জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। একটা তরুণ মেয়ে। বয়স ত্রিশের আশেপাশে। একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। আরেকটা বড় পরিচয় হলো তিনি বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের কিংবদন্তি খেলোয়াড় কায়সার হামিদের মেয়ে। দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় ভুগছিলেন। পরে হেপাটাইটিস এ এবং ই ধরা পড়ে। সেখান থেকে অবস্থা গড়ায় লিভার ফেইলিউরের দিকে। এখন তার পরিবার মানুষের কাছে দোয়া চাইছে। একজন বাবা তার মেয়েকে বাঁচানোর জন্য রাষ্ট্র আর সমাজের দরজায় দরজায় কড়া নাড়ছেন।

স্বাভাবিক একটা সমাজে এরকম ঘটনায় মানুষের সহানুভূতি জেগে ওঠার কথা ছিল। মানুষ বলত, আল্লাহ মেয়েটাকে সুস্থ করে দিন। কিন্তু আমরা এখন আর স্বাভাবিক সমাজে বাস করি না। আমরা এমন এক সময়ে ঢুকে পড়েছি যেখানে একজন অসুস্থ মানুষকে দেখেও মানুষের ভেতর ঘৃণা, প্রতিশোধ আর বিকৃত আনন্দ জেগে ওঠে।

কারিনা জুলাই আন্দোলনের সময় সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন। ছাত্র জনতার পক্ষে কথা বলেছেন। সেটাই এখন তার বিরুদ্ধে একদল মানুষের ঘৃণার কারণ। আওয়ামী লীগপন্থী বিভিন্ন আইডি আর পেজ থেকে তার অসুস্থতা নিয়ে বিদ্রুপ করা হচ্ছে। কেউ তাকে “গণভবন লুটপাটকারী” বলছে। কেউ তার মৃত্যু কামনা করছে। কেউ আবার স্লাটশেমিং করছে। হাজার হাজার মানুষ সেই পোস্টে “আলহামদুলিল্লাহ” লিখে মন্তব্য করছে। যেন একজন মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণা তাদের কাছে কোনো ট্র্যাজেডি না, বরং রাজনৈতিক প্রতিশোধের উৎসব।

সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, এই সংস্কৃতি নতুন না। বহু বছর ধরে বাংলাদেশে ধীরে ধীরে একটা নিষ্ঠুর রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এর পিছনে পুরোপুরি দায়ী জামায়াত শিবির ; আগে দেখা যেত আওয়ামী লীগের কেউ মারা গেলে বা দুর্ঘটনায় পড়লে জাশি ও কাশিরা মিলে “আলহামদুলিল্লাহ” লিখে উল্লাস করছে। অবাক হয়ে ভাবতাম , মানুষ কি সত্যিই এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে? যাকে ভালোভাবে চিনি না জানি না এমন একজন মৃত বা মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে নিয়ে এভাবে আনন্দ করা কীভাবে সম্ভব?

কিন্তু ঘৃণার বীজ একবার বপন করলে সেটা একসময় সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে । আজ সেই একই সংস্কৃতি উল্টো দিকে ঘুরে এসেছে। এখন জামায়াত বা শিবিরপন্থী কারও মৃত্যু হলেও হাজার হাজার মানুষ একইভাবে “আলহামদুলিল্লাহ” লিখে মন্তব্য করে। যেন মৃত্যু এখন রাজনৈতিক সমর্থকদের জন্য ফুটবল ম্যাচের গোল উদযাপন। যেন প্রতিপক্ষের লাশ দেখলে মানুষ নিজের আদর্শের বিজয় অনুভব করে।

কারিনার ঘটনায় আরও একদল মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখা গেল। ডানপন্থী অনেকে তার ওপর ক্ষুব্ধ পুরনো এক মন্তব্যের কারণে। গত বছর ভূমিকম্পের সময় তিনি পবিত্রতা আর পর্দা নিয়ে কিছু বলেছিলেন। সেই বক্তব্য অনেকের ভালো লাগেনি। এখন তার অসুস্থতার সময় তারাও সহানুভূতি দেখাতে পারছে না। যেন মানুষের সব পরিচয়ের আগে এখন রাজনৈতিক আর আদর্শিক পরিচয় দাঁড়িয়ে গেছে। একজন মানুষ অসুস্থ কি না, একজন বাবা কাঁদছে কি না, একটা পরিবার ভেঙে পড়ছে কি না, এসব আর গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হলো সে “আমার দল” না “ওদের দল”।

আমরা আসলে ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে ঢুকে পড়ছি যেখানে মায়া মমতা দুর্বলতার লক্ষণ হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমা, সহানুভূতি, মানবিকতা এসব শব্দকে মানুষ বোকামি ভাবতে শুরু করেছে। এখন মানুষের ভেতরে শুধু প্রতিশোধের ক্ষুধা। সামাজিক মাধ্যম খুললেই বোঝা যায় আমাদের সমাজের ভেতরে কতটা পচন ধরেছে। বাস্তব জীবনে যারা হয়তো ভদ্র, তারাই ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে মৃত্যুর জন্য উল্লাস করে। একজন মানুষের মা, বোন, ভাই, বন্ধু সেই মন্তব্যগুলো পড়লে তাদের মনের ওপর কী যায়, সেটা ভাবার ন্যূনতম সংবেদনশীলতাও অনেকের নেই।

কারিনার অসুস্থতার পেছনে আরেকটা বাস্তবতাও আছে, যেটা আমরা ইচ্ছা করে এড়িয়ে যাই। বাংলাদেশে খাবার এখন ধীরে ধীরে বিষে পরিণত হচ্ছে। কারিনা একজন ফুড ব্লগার ছিলেন। তার ভিডিওতে দেখা যায় নানা ধরনের রাস্তার খাবারের রিভিউ। ফুচকা, চটপটি, ফাস্টফুড, তেলে ভাজা খাবার। কিন্তু আমরা কি জানি সেই খাবারে কী ব্যবহার হচ্ছে? একই তেল কতবার ব্যবহার করা হচ্ছে? সস কেমন? ময়দা কেমন? রাস্তার পাশের খাবার কতটা স্বাস্থ্যকর?

বাংলাদেশে এখন গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ প্রায় মানুষের নিত্যসঙ্গী। সারজেল ২০ যেন জাতীয় খাবারের অংশ হয়ে গেছে। মানুষ কেবল ক্ষুধার জন্য না, মুখের স্বাদের জন্য প্রতিদিন নিজের শরীরে ধীরে ধীরে বিষ ঢুকিয়ে যাচ্ছে। বাইরে খাওয়া বন্ধ করতে বিশেষজ্ঞরা বলেন ঠিকই, কিন্তু বাস্তবতা হলো লাখ লাখ মানুষ এই সংস্কৃতির ভেতরেই আটকে আছে। কেউ ব্যবসার জন্য, কেউ অভ্যাসের জন্য, কেউ সময়ের অভাবে।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রের কার্যকর নজরদারি খুব কম। রাস্তার পাশে কী বিক্রি হচ্ছে, কোন তেল ব্যবহার হচ্ছে, কতটা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, এগুলো নিয়ে বড় কোনো সামাজিক আন্দোলন নেই। অথচ তরুণ বয়সেই এখন মানুষ লিভার ফেইলিউর, কিডনি ডিজিজ, ক্যানসার, স্ট্রোক নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

আমরা এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি যেখানে শুধু খাবার না, মানুষের মনও বিষাক্ত হয়ে গেছে। শরীরে বিষ ঢুকছে খাবার দিয়ে, আর মনে বিষ ঢুকছে রাজনীতি আর ঘৃণার মাধ্যমে। এই দুই বিষ একসাথে একটা অসুস্থ সমাজ তৈরি করছে। সেখানে একজন অসুস্থ মেয়েকে দেখে মানুষ দোয়া করার বদলে উল্লাস করে। সেখানে মৃত্যু মানুষকে কাঁদায় না, বরং কমেন্ট সেকশনে উৎসবের পরিবেশ তৈরি করে।

সমাজের অধঃপতন আসলে এভাবেই হয়। হঠাৎ করে না। ধীরে ধীরে। একটু একটু করে। যখন মানুষ অন্যের কষ্ট দেখে আনন্দ পেতে শেখে, তখনই বুঝতে হবে ভাঙন শুরু হয়ে গেছে।

Karina Kaiser on Life Support Becomes Target of Political Hate Speech-https://thedissent.news/current-affairs/karina-kaiser-on-life-support-becomes-target-of-political-hate-speech


photocard credit : the dissent
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মে, ২০২৬ রাত ২:৫২
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মি মোদিজ্বির দেশ বাঁচাও আহবান এবং বাংলাদেশ সরকারকে কিছু কথা!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ১১ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:০৭

কার্য্যত গত কয়েক দিন আগে হায়দারাবাদে এক জনসভায় মি মোদি প্রথম স্বীকার করেন যে, বর্তমানে ইন্ডিয়ার আর্থিক অবস্থা এখন অত্যন্ত দূর্বল এবং সেখানে তিনি ভাষনে দেশবাসীকে কিছু কথা বলেন যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অধঃপতন

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই মে, ২০২৬ রাত ২:৪৪



কারিনা কায়সার এখন জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। একটা তরুণ মেয়ে। বয়স ত্রিশের আশেপাশে। একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। আরেকটা বড় পরিচয় হলো তিনি বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের কিংবদন্তি খেলোয়াড়... ...বাকিটুকু পড়ুন

শততম পোস্টে আমিই একমাত্র ব্লগার

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১২ ই মে, ২০২৬ সকাল ৮:৩৫

আমার শততম পোস্টে আজ আমিই একমাত্র ব্লগার। জানালা দিয়ে পশ্চিমের স্বচ্ছ আকাশে শুকতারা দেখছি।
নিউইয়র্ক সময় অনুযায়ী এখানে রাত ১০.৪৬ মিনিট, তারিখ ১১ই মে ২০২৬
তাপমাত্রা +৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস
বাংলাদেশ তারিখ ১২ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইচ্ছে করে

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ১২ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৮

ইচ্ছে করে ডিগবাজি খাই,
তিড়িং বিড়িং লাফাই।
কুমারী দীঘির কোমল জলে
ইচ্ছে মতো ঝাপাই।

রাস্তার মোড়ে সানগ্লাস পরে
সূর্যের দিকে তাকাই,
সেকান্দর স্টোর স্প্রাইট কিনে
দুই-তিনেক ঝাঁকাই।

ঝালমুড়িতে লঙ্কা ডাবল,
চোখ কচলানো ঝাঁঝে,
ছাদের কোণে যাহাই ঘটুক,
বিকেল চারটা বাজে।

ওসবে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মায়া বড় কঠিন বিষয় !

লিখেছেন মেহবুবা, ১২ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০


মায়া এক কঠিন বিষয় ! অনেক চেষ্টা করে জয়তুন গাছ সংগ্রহ করে ছাদে লালন পালন করেছি ক'বছর।
বেশ ঝাকড়া, সতেজ, অসংখ্য পাতায় শাখা প্রশাখা আড়াল করা কেমন আদুরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×