
বিএনপি সরকারের তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান। বিগত শাসনামলে জনমত গঠনে ও গণমাধ্যমে যুক্তি উপস্থাপনের কারণে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত একটি মুখ। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রতি সপ্তাহের মঙ্গল বা বুধবারে তিনি সংবাদ সম্মেলনের মুখোমুখি হচ্ছেন, সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। বুধবার সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন: সরকার কেন আমেরিকা থেকে বাজারদরের চেয়ে বেশি মূল্যে গম ক্রয় করল? জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান পুরো বিষয়টির যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো:
“গমের কথা যেটা বলল-একটু বেশি দামে গম কেনা হয়েছে। এটাও আমি মিডিয়াতে দেখেছি। আমি এই ইনফরমেশনটা সঠিক ধরেই কথা বলি। একটু বেশি দামে যদি গম কেনাও হয়-এটাও ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। আমি বলছি, জ্বী! কেন বলছি? আপনি খেয়াল করবেন-এই চুক্তি যখন করা হয়েছিল তার আগের পরিস্থিতিটা কি ছিল? রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ দেয়া হয়েছিল। আমাদের গার্মেন্ট প্রোডাক্টের উপরে খুব বড় একটা ট্যারিফ পড়েছিল। আপনি চিন্তা করুন তো! তখন যেটা হয়েছে যে-ট্রেড ডেফিসিট আছে সেটা কমানোর কিছু পণ্য তাদের কাছ থেকে আমরা বেশি কিনবো এ ধরনের একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং আমাদের মধ্যে হয়েছে।
তাতে লাভ কি হলো? লাভ হচ্ছে আমরা আমাদের ওইযে বললাম এতক্ষণ। আমাদের তো এই মুহূর্তে অন্তত গার্মেন্টের উপরে যদি আমরা খুব বড়... আমাদের ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে যদি একক ইউনিট হিসেবে ধরি এটা হলো হাইয়েস্ট রপ্তানি সেকেন্ডেই কিন্তু আমেরিকা। সুতরাং আমাদের যদি ওই ট্যারিফ আমাদের ওইএক্সপোর্টের উপরে পড়ে সেটা আমাদের জন্য বিপদ তৈরি করবে। সেজন্য এটাও আসলে এক ধরনের.. আমি মনে করি যে-জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্যই।
গার্মেন্টের কথা একটা জিনিস আমাদের মনে রাখতে হবে, ওটার উপরে ইম্প্যাক্ট শুধু ফরেন কারেন্সি আনির্ং না; ওখানে ৪০ লক্ষ কর্মী কাজ করে। তারা দেশে আর্ন করে। ৪০ লক্ষ কর্মীর পরিবারে পাঁচজন করে যদি মানুষ থাকে ২ কোটি মানুষ ডিপেন্ডেন্ট গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি থেকে আয়ের উপরে। আরো কথা আছে, এই দুই কোটি মানুষ যখন দেশের ভেতরে ব্যয় করে সেটা আবার অনেক মানুষের ইনকাম জেনারেট করে। একটা উদাহরণ দেই। একজন গার্মেন্ট কর্মী ডিম কেনেন, ডিমের একটা চাহিদা তৈরি হয়। যিনি ডিম বিক্রি করেন, যিনি ডিম প্রডিউস করেন, প্রত্যেকের কিন্তু ব্যবসা লিংকড। ফলে এই ডিজাস্টারটা কিন্তু অনেক বড়। এসব বিবেচনায় আসলে এই কাজটা করতে হয়েছিল। আমি আশা করি জনগণ এই ব্যাপারটা বুঝতে পারবে”-
তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ এখানে বিন্দুমাত্র ভুল বলেননি। আমরা পূর্ব থেকেই অবগত ছিলাম যে, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এবং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে তৎকালীন ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমেরিকার সাথে একটি কৌশলগত সমঝোতায় উপনীত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ গম আমেরিকা থেকে আমদানি করতে বাধ্য থাকবে। এই চুক্তিটি নিয়ে তৎকালীন সময়ে বামপন্থীরা সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছিল এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ মেতে উঠেছিল ‘দেশ বিক্রির’ সস্তা মায়াকান্নায়। দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থে ওই মুহূর্তে ড. ইউনূসের স্থলে যে সরকারই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকত, তাকে এই ধরনের চুক্তি করতেই হতো। আজ নতুন সরকার এসে সেই সত্যটি সাহসিকতার সাথে জাতির সামনে উন্মোচিত করেছে, যা নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
তবে এই সংবাদ সম্মেলনে অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রটি নিয়ে আরও গভীর কাটাছেঁড়া হওয়া উচিত ছিল। গমের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব ছিল সয়াবিন তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্নবাণে সরকারকে জর্জরিত করা। ভোজ্যতেলের বাজার যেভাবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে, তাতে মধ্যবিত্তের রান্নাঘর কীভাবে চলবে কিংবা ক্ষুদ্র হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো কীভাবে টিকবে- সেই মৌলিক প্রশ্নটি কেন সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হলো? বাংলাদেশে বিগত পাঁচ বছরে সয়াবিন তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক উপায়ে। সয়াবিন তেল স্বাস্থ্যের জন্য অতিমাত্রায় ক্ষতিকর জেনেও এ দেশের আপামর জনসাধারণকে এই তেলের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হয়।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সয়াবিন তেলের দাম নিয়ে আমাদের সাংবাদিকদের কোনো উদ্বেগ নেই। এমন হওয়াও মোটেও অসম্ভব নয় যে, যে সাংবাদিক প্রশ্নটি করেছিলেন, তার পত্রিকার মালিক নিজেই হয়তো ভোজ্যতেল আমদানির একচেটিয়া ব্যবসার সাথে যুক্ত! ফলে বাজারে আটা-ময়দার দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকলেও, সাংবাদিকদের ক্যামেরা শুধু গমের পেছনেই ঘোরে; ভোজ্যতেলের বাজারে চলমান ডাকাতি তাদের চোখে পড়েও পড়ে না।
নিয়মিত বাজারে যাই বলে পকেট কাটার নির্মম যন্ত্রণাটা হাড়ে হাড়ে টের পাই। ২০২৪ সালের আগস্টে, অর্থাৎ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক আগের দিনগুলোতেও বাজারে এক কেজি আলুর দাম ছিল ৬০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ছিল ২১০ টাকা কেজি এবং ডিমের ডজন ছিল ১৫৫ টাকা। ব্রয়লার মুরগি ও ডিম দেশের অসচ্ছল, বেকার ও নিম্নবিত্ত মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস । তখন ৫ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৮৪০ টাকা (অর্থাৎ প্রতি লিটার ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকা) এবং পাম তেল কেনা যেত ১৬০-১৬৫ টাকা লিটার দরে।
আর আজ ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসে সেই ৫ লিটার সয়াবিন তেলের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯৬০ টাকা! অর্থাৎ, লিটার প্রতি দাম বেড়েছে ২৪ টাকা। দুই বছর বা ২৪ মাস পার হওয়ার আগেই লিটার প্রতি গড়ে প্রতি মাসে ১ টাকা করে মূল্যবৃদ্ধি -এটি কি স্রেফ ডাকাতি নয়? খুচরা বাজারে এখন এক লিটার সয়াবিন তেল ছুঁয়েছে ২০০ টাকা , আর পাম তেল বিক্রি হচ্ছে ১৮৫-১৯০ টাকায়। এই মূল্যবৃদ্ধি কোনো ‘অন্ধ’ সাংবাদিকের চোখে পড়ে না, আর দেশের বোবা জনতারও কোনো হুঁশ নেই! নিজেদের উপার্জিত রক্ত জল করা টাকা এভাবে সিন্ডিকেটের পকেটে সঁপে দিয়ে সাধারণ মানুষ কিসের আত্মতৃপ্তি পায়, তা আমার বোধগম্য নয়। বাজারে তেলের বোতলে হাত দিলেই মেজাজ ধরে রাখা দায় হয়ে পড়ে।
দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর একটি অলিখিত উৎসব শুরু হয়। ২০২৪ সালে ড. ইউনূসের সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অসাধু ব্যবসায়ী চক্র বাজারে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫-১০ টাকা বাড়িয়ে দেয়; অথচ তখন আমেরিকার সাথে চুক্তির কোনো নামনিশানাও ছিল না। এরপর ২০২৫ সালের মে-জুন নাগাদ সরকার যখন আমেরিকা থেকে সয়াবিন তেলের আমদানি বৃদ্ধি করল, তখন দাম আরেক দফা বাড়িয়ে করা হলো ১৯০ টাকা। ইউনূস সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক প্রাক্কালে দাম আরও এক দফা বাড়িয়ে করা হলো ১৯৫ টাকা। আর সর্বশেষ বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আরোহণের পর আবারও লিটারে ৫ টাকা বৃদ্ধি করে সয়াবিন তেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০০ টাকা !
অর্থাৎ, যতবার ক্ষমতার রদবদল হয়েছে, ততবারই এই মুনাফাখোর চক্র সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়ে নিজেদের আখের গুছিয়েছে। বাংলাদেশে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া মাত্র আটটি বৃহৎ করপোরেট গ্রুপ এই ভোজ্যতেলের বাজার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে। এই মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কোনো সরকারেরই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা টুঁ শব্দ করতে দেখা যায় না। নতুন সরকারের আমলে ডিম, মুরগি কিংবা শাকসবজির দাম কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও, রান্নার তেলের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের উপর চাপ বাড়িয়েছে।
আমেরিকা থেকে উচ্চমূল্যে পণ্য আমদানির অজুহাত দেখিয়ে দেশীয় অসাধু সিন্ডিকেটগুলো যাতে সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে না পারে, সরকারকে এখনই সেই লাগাম টেনে ধরতে হবে। নতুন সরকারের নজরদারির অভাব সংকটকে দিন দিন আরও ঘনীভূত করছে।
ভোজ্যতেলের দাম যদি এভাবে অনৈতিক উপায়ে বাড়তে থাকে, তবে তার চূড়ান্ত চড়া মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো নিজেদের ব্যবসায়িক মুনাফা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে একই পোড়া, বাসি ও ক্ষতিকারক ভেজাল তেল বারবার ব্যবহার করবে। এর প্রত্যক্ষ ও মারাত্মক প্রভাব পড়বে জনস্বাস্থ্যের ওপর: দেশের কোটি কোটি মানুষের লিভার এবং কিডনি চিরতরে বিকল হয়ে যাবে। আজ যে দেশের গ্রামগঞ্জে মরণব্যাধি ক্যান্সার মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে, তার অন্যতম প্রধান অনুঘটক হলো এই বিষাক্ত ও মানহীন তেলের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। যে গ্রামীণ জনপদে অতীতে জটিল ব্যাধির নামও শোনা যেত না, আজ সেই সব অঞ্চলের অসহায় মানুষে শহরের হাসপাতালগুলো উপচে পড়ছে।
একটি স্বনির্ভর অর্থনীতি ও সুস্থ জাতি গঠন করতে হলে সবার আগে রান্নার তেলের বাজার স্থিতিহীনতা দূর করতে হবে এবং সিন্ডিকেটের টুঁটি চেপে ধরতে হবে। সরকার যদি এখনই এই নীরব ঘাতক সয়াবিন তেলের দাম ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর, বৈজ্ঞানিক ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে অচিরেই আমরা একটি পঙ্গু, অকর্মণ্য ও চিকিৎসানির্ভর রুগ্ণ সমাজ পেতে যাচ্ছি। রাষ্ট্রপরিচালকদের মনে রাখা প্রয়োজন; একটি শারীরিকভাবে পঙ্গু ও মানসিকভাবে অসুস্থ প্রজন্ম নিয়ে কখনোই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের বাস্তব রূপায়ণ সম্ভব নয়।
photocard credit: the post
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



