somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশ কি ইরানের নতুন শত্রু হতে চলেছে ?

৩১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মরুভূমির গরম বাতাস আর লোহিত সাগরের নোনা জলীয় বাষ্প যেখানে এসে মেশে, বাব এল মানদেব প্রণালীর সেই জায়গাটায় রাতের অন্ধকার নামলেই একটা অদ্ভুত নীরবতা ছেয়ে যায়। কিন্তু সেই নীরবতা শান্তির নয়, বরং এক অদৃশ্য ঝড়ের পূর্বলক্ষণ। ইয়েমেনের রুক্ষ পাহাড়ি খাঁজে খাঁজে বসে থাকা একদল যোদ্ধা, যাদের দুনিয়া চেনে হুথি নামে। নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক নাম আনসারুল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহর সাহায্যকারী। নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে বদরুদ্দিন আল হুথি আর তার ছেলে হুসাইন বদরুদ্দিন আল হুথির হাত ধরে এই আন্দোলনের শুরু। শুরুতে ছিল অবহেলিত জাইদি শিয়া জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের লড়াই, ২০১৪ সালে এসে যা রাজধানী সানা দখলের মধ্য দিয়ে পুরো দেশের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

জাইদি শিয়া চেতনা, তীব্র আমেরিকা ও ইসরায়েল বিরোধিতা, আর তেহরানের দিকনির্দেশনা, এই তিনে মিলে গড়ে উঠেছে হুথিদের রাজনৈতিক পরিচয়। ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহ আর সিরিয়ার সাবেক শাসকগোষ্ঠীর সাথে মিলে তারা যে জোটের অংশ, তার নাম রেজিস্ট্যান্সের অক্ষ। ২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হুথিরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে, কখনো মিসাইল দিয়ে, কখনো ড্রোন দিয়ে, আর কখনো হেলিকপ্টার থেকে কমান্ডো নামিয়ে পুরো জাহাজ দখল করে ইয়েমেন উপকূলে টেনে নিয়ে গেছে। গ্যালাক্সি লিডার নামের একটা বিশাল কার্গো জাহাজ পুরো ক্রুসহ এভাবেই তারা আটকে রেখেছিল।

এই বছর জুলাইয়ের বিশ তারিখে হুথিরা নতুন এক ঘোষণা দেয়। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ। বছরের পর বছর সৌদি সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়া বলে তারা এটাকে দাবি করে, আর এর কিছুদিনের মধ্যেই সৌদি মালিকানাধীন তেল ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একই সময়ে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের সাথে যুদ্ধের উত্তাপ চলছিল, আর হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল লোহিত সাগর। ঠিক সেই পথটাই এবার হুথিদের নিশানায় চলে আসে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একশো ডলার ছাড়িয়ে যায়, বিশ্ববাজারে জ্বালানির টান পড়ে।

সৌদি আরব চুপ করে বসে থাকেনি। রিয়াদ থেকে বার্তা যায় দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে, তেতাল্লিশটা দেশকে ডাকা হয় এক বৈঠকে, আলোচনার বিষয় একটাই, কীভাবে লোহিত সাগর আর বাব এল মানদেব প্রণালীকে নিরাপদ রাখা যায়। জুলাইয়ের ত্রিশ তারিখে রিয়াদে সেই বৈঠক শেষে জন্ম নেয় নতুন এক নৌ প্রতিরক্ষা জোট, যার নেতৃত্বে সৌদি আরব নিজে, আর সদর দপ্তরও তাদের মাটিতে। প্রতিষ্ঠাতা দেশের তালিকায় সৌদি আরবের পাশে জায়গা করে নেয় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান, ইয়েমেন, নাইজেরিয়া, সুদান, জিবুতি, সোমালিয়া, আর বাংলাদেশ।

হাজার মাইল দূরের সবুজে ঘেরা এক দেশের নাম এভাবেই জড়িয়ে যায় মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত সমীকরণে। ঢাকার নীতি নির্ধারকদের সামনে তখন একটাই হিসাব। সৌদি আরবে কাজ করেন প্রায় পঁয়ত্রিশ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সেই সংখ্যা সত্তর পঁচাত্তর লাখ ছুঁয়ে যায়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ঘামে যে রেমিট্যান্স দেশে ফেরে, তা অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালনের মতো কাজ করে। রিয়াদের ডাকে সাড়া না দিলে সেই শ্রমবাজারে হয়তো জায়গা করে নিত পাকিস্তান বা নাইজেরিয়ার মতো জনবহুল প্রতিযোগী দেশ। তাই জোটে নাম লেখানো অনেকটা বাধ্যতামূলক এক সিদ্ধান্তের মতোই মনে হয়েছিল।

কিন্তু কাগজে কলমে যা ছিল নিছক শ্রমবাজার রক্ষার এক কৌশল, বাস্তবে তার অন্য এক অর্থ দাঁড়িয়ে যায়। তেহরানের চোখে এই জোট মানেই তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ শিবিরের বিস্তার, আর সেই শিবিরে নতুন সংযোজন বাংলাদেশ। সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে দূরের প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা ইরানের বহু পুরনো কৌশল, হুথিরা যার জীবন্ত উদাহরণ। ফলে লোহিত সাগর দিয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজও এখন থেকে হয়তো হুথিদের রাডারের বাইরে থাকবে না।

এদিকে আমেরিকা নিজেই একসময় জোট গড়ে হুথিদের দমাতে চেয়েছিল, শেষমেশ তাদের সাথে যুদ্ধবিরতিতেই বসতে হয়েছিল। সেখানে চৌদ্দটা দেশের এই নতুন জোট কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায় সামরিক বিশ্লেষকদের মনে। যতদিন এই সংঘাত চলবে, ততদিন ইউরোপমুখী পোশাক শিল্পের জাহাজগুলোকে হয়তো আফ্রিকা ঘুরে অনেক বাড়তি পথ আর বাড়তি খরচ গায়ে মেখে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। বন্ধুত্বের হাত শক্ত করে ধরতে গিয়ে বাংলাদেশ নিজের অজান্তেই দাঁড়িয়ে গেছে ইয়েমেনের পাহাড় থেকে উঠে আসা এক অচেনা উত্তাপের মুখোমুখি, যেখানে শ্রমবাজার বাঁচানোর হিসাব আর দূরের এক সম্ভাব্য শত্রুতার ছায়া একসাথে জড়িয়ে যাচ্ছে।

সংগৃহীত

সৌদির নেতৃত্বে সমুদ্র প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ-বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক






সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৭
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কেউ জানেনা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪২


কেউ জানেনা
আমার একটা জগৎ আছে,
খুব গহীনে, সংগোপনে,
বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা
একটা জগৎ....
নিজের জগৎ, নিজের মত
আমার একটা জগৎ লাগে।

রোজ বিকেলে কাজের পরে
একটু যখন অবসরে,
একটু সময় চায়ের কাপে
নিজের মত, নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমান মুক্তাদীরের জুলাই আন্দোলন: কারণটা কি একান্ত ব্যক্তিগত ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০১


সালমান মুক্তাদীর বাংলাদেশের কনটেন্ট ক্রিয়েশন জগতের পথিকৃৎ। তার হাত ধরে এদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে কত তরুণ, তার কোনো হিসাব নেই। তার ভক্তের সংখ্যা অগণিত। তবে কাজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে পর্ণ এটাকের জনককে পাওয়া গিয়েছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৮



ব্লগার চারাগাছ সামুতে মডারেটর নেই বলে সন্দেহ করছেন। নিজের ধারণা পাকাপোক্ত করতে সামুতে পর্ণ এটাকের প্ল্যান করছেন। ইহা কি ব্লগার?

সামুতে পর্ণ এটাকের কারণে পর্ণ সাইটের ধুয়া তুলে বিগত সরকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



যে কেউ যে কোনো ধরনের পোশাক পরে যে কোনো সমাজে যেতে পারেন, সাধারণত কেউ বাধা দেয় না। তবে সর্বসাধারণের ক্ষেত্রে “দৃষ্টিকটু” বলে একটি বিষয় উল্লেখ্যযোগ্য। যা সময় স্থান কাল পাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×