
সোমবার সকালে জলসিঁড়িতে একটা অনুষ্ঠান হলো। ফিতা কাটা, ফুলের তোড়া, বক্তৃতা, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, স্বাভাবিক একটা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যা যা থাকে সবই ছিল। সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান নিজে হাজির, পাশে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, আর একই মুহূর্তে ভিডিও পর্দায় দেশের আরও সাতটা জায়গা থেকে একসাথে ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচন হয়ে গেল। বরিশাল, সাভার, বগুড়া, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, সাতটা শহর, একই দিনে, একই মুহূর্তে। খবরটা পড়ে প্রথমে মনে হয়েছিল, আরেকটা স্কুল খোলার খবর হয়তো, এমন তো কতই হয়। তারপর নামটা আবার পড়লাম। আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউট। নানারকম ভাবনা মাথায় আসতে শুরু করলো।
দেশে এমনিতেই সত্তর লক্ষের বেশি ছেলেমেয়ে কওমি মাদ্রাসায় পড়ে, রাষ্ট্রের চোখের বাইরে, নিজস্ব বোর্ড, নিজস্ব সিলেবাস, নিজস্ব দুনিয়া নিয়ে। ওখানে কী পড়ানো হচ্ছে, কোন ঘরানার আকীদা মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেটা নিয়ে আমরা বছরের পর বছর চিন্তিত হয়েছি, তারপর একরকম মেনে নিয়েছি, এটা তো সমাজের একটা অংশ, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এই অস্বস্তিটা এখনো পুরোপুরি হজম হয়নি, তার মধ্যেই এই খবরটা এলো। আর এবার ব্যাপারটা সমাজের কোনো এক কোণে সীমাবদ্ধ নয়। এবার নাম জড়িয়ে গেল সরাসরি সেনাবাহিনীর সাথে।
একটা স্কুল না, একসাথে আটটা জায়গায় শাখা, একটা জাতীয় নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা। এই স্কেলটাই বলে দেয়, এটা কোনো ছোটখাটো প্রজেক্ট না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এতদিন নিজেকে চিনিয়েছে পেশাদার ও শৃঙ্খলাবদ্ধ একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে জন্ম নেওয়া বাহিনী, নিজের গায়ে কোনোদিন নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় ঘরানার সিল লাগায়নি। আর এখন হঠাৎ তারাই বলছে, আধুনিক শিক্ষার সাথে ইসলামি মূল্যবোধও পড়াবে। কথাটা শুনতে ভালোই লাগে তবে কোন ইসলামি মূল্যবোধ, কোন আকীদা, কোন তরিকা, সেটা কেউ খোলাসা করে বলছে না। ঠিক এই অস্পষ্টতাটাই সবচেয়ে বেশি মনে খচখচ করে। কেউ কেউ বলছেন নির্দিষ্ট একটা কট্টর ঘরানার কথা, কিন্তু এর কোনো নিশ্চিত সূত্র এখনো পাওয়া যায়নি। আসল কথা হলো, নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছে না, আর এই না বলতে পারাটাই আসলে সবচেয়ে বড় সমস্যা।
একটা প্যাটার্ন হঠাৎ মনে পড়ে গেল। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, আইআরজিসি, তাদের নিজস্ব একটা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। নাম ইমাম হুসেইন ইউনিভার্সিটি। সেখানে সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আদর্শিক ও ধর্মীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়, আর বাহিনীর প্রতিটা শাখা, প্রতিটা প্রতিষ্ঠান চলে এই একটা কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের অধীনে। লক্ষ্য একটাই, প্রতিটা সদস্যকে বিপ্লবের আদর্শে গড়ে তোলা, যাতে তারা শুধু সৈনিক না থাকে, বিপ্লবের একনিষ্ঠ সেবক হয়ে ওঠে। এখন বাংলাদেশে যেভাবে সেনাবাহিনী নিজেই একটা ব্র্যান্ডেড ধর্মীয় শিক্ষা নেটওয়ার্ক দাঁড় করাচ্ছে, একসাথে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তার করার পরিকল্পনা নিচ্ছে, এই কাঠামোগত মিলটা চোখ এড়ানো কঠিন। আর মজার ব্যাপার হলো, ইরানের সেই প্রতিষ্ঠানও শুরুতে নিজেকে এভাবেই পরিচয় দিয়েছিল, শিক্ষা আর নৈতিকতার কথা বলেই, কোন মতাদর্শ শেখানো হবে সেটা প্রথমে খোলাসা করেনি কেউ।
একটা পেশাদার বাহিনী আর একটা আদর্শিকভাবে চালিত বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মধ্যে যে দূরত্বটা থাকার কথা, সেটা যদি মুছে যেতে শুরু করে, তাহলে সেই বাহিনী আর সবার বাহিনী থাকে না। হয়ে যায় নির্দিষ্ট একটা মতাদর্শের বাহিনী। আর একটা মতাদর্শচালিত বাহিনীর হাতে অস্ত্র থাকাটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক, কারণ তখন সেই বাহিনী আর রাষ্ট্রের রক্ষক থাকে না, হয়ে যায় একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষক। আর এই বদলটা রাতারাতি হয় না। একটা স্কুল দিয়ে শুরু হয়, তারপর কলেজ, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়, তারপর সেই প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররাই একদিন বাহিনীর ভেতরে ঢুকে ধীরে ধীরে নেতৃত্বের জায়গায় চলে আসে। যখন এমন ঘটতে শুরু করে তখন প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বোর্ড কারা চালাচ্ছে, কার টাকায় চলছে, এই প্রশ্নগুলো তোলাও কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ ততদিনে বাহিনীর ভেতরেই তার নিজস্ব একটা সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হয়ে যায়।
কওমি মাদ্রাসার প্রসঙ্গ না টেনে উপায় নেই। কওমি মাদ্রাসার প্রভাব যতই উদ্বেগজনক হোক, সেটা থেকে যায় সমাজের ভেতরে, রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যার হাতে অস্ত্র আছে, ক্ষমতা আছে, আর এই দেশে সেনাবাহিনী বহুবার সরাসরি ক্ষমতায় হাত দিয়েছে। কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে আমরা যে উদ্বেগ এতদিন প্রকাশ করেছি, সেই একই ধরনের কট্টরপন্থা যদি এখন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভেতরেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঢুকে পড়ে, তাহলে সেই উদ্বেগটা আর সমান থাকে না, হাজারগুণ বেড়ে যায়। একদিকে সমাজে কট্টরপন্থার বীজ, অন্যদিকে সেই একই ধরনের চিন্তা যদি বাহিনীর ভেতরেও গেঁড়ে বসে, দুটো মিলে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
সত্যি কথা বলতে, এখনো আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না এই প্রতিষ্ঠান আসলে কোন ধর্মীয় ঘরানা অনুসরণ করবে। কারা এর অর্থায়ন করছে, সেটাও জানি না। পাঠ্যক্রমে ঠিক কী পড়ানো হবে, তারও কোনো স্পষ্ট বিবরণ নেই। প্রকাশ্যে যা বলা হয়েছে সবই সাধারণ শব্দে মোড়ানো, মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা, নৈতিকতা, আদর্শ নাগরিক। কথাগুলো শুনতে ভালো, কিন্তু কিছুই বলে না। আর ঠিক এই অস্বচ্ছতাটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। দাবিটা প্রমাণিত না, এটা ঠিক। কিন্তু আশঙ্কাটা অমূলকও না।
যতদিন না প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বোর্ড, শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যক্রম আর অর্থায়নের উৎস প্রকাশ্যে আসছে, ততদিন এই প্রশ্নগুলো আমাদের তুলেই যেতে হবে। কারণ একটা জাতির সেনাবাহিনী শুধু একটা প্রতিষ্ঠান না। সেটা পুরো রাষ্ট্রের শেষ ভরসা। আর সেই ভরসার জায়গাটায় যদি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে, তার মূল্য দিতে হবে গোটা জাতিকে, বহু বছর ধরে ।
আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউট উদ্বোধন করলেন সেনাপ্রধান-বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
ফটোকার্ড : ইন্টারনেট ।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



