somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়, ববি ভাইয়া বুঝি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটাই বদলে ফেলবেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুতে তিনি প্রাথমিক স্কুলে সংগীত, ফিজিক্যাল এডুকেশন ও নাচ চালুর কথা বললেন। বাধা এল তৌহিদি জনতার কাছ থেকে। শেষ পর্যন্ত তাদের আপত্তির মুখে মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত হলো, এসব বিষয় প্রাথমিকের পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা যাবে না।

একই সঙ্গে প্রাথমিকের স্কুল কমিটিতে মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের একজন করে সদস্য রাখার সিদ্ধান্ত হলো । এরপর বলা হলো, প্রাথমিক স্কুলে নয় হাজার ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ডিগ্রি সমমান না হওয়ায় বিষয়টি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ববি ভাইয়া তাতেও থামলেন না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিলে সদ্য সুপারিশপ্রাপ্ত প্রায় চৌদ্দ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ ছাড়া নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ফলাফল, শিক্ষকদের কপাল পুড়ল। প্রায় এক বছর হতে চলল, তাদের নিয়োগই হচ্ছে না। শিক্ষকরা আন্দোলনের হুমকি দেওয়ার পর অক্টোবর মাসে নিয়োগ দেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে।

ববি ভাইয়া স্কুলের নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে কী পড়ানো হচ্ছে, কীভাবে পড়ানো হচ্ছে, সবকিছুতেই একটু বেশি খোঁচাখুঁচি করছেন। কারও কারও কাছে ব্যাপারটা মজার লাগছে, কারও কাছে বিরক্তিকর। সত্যি কথা বলতে কী, ববি ভাইয়ার এই দৌড়ঝাঁপ দেখে মজা পেলেও প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা নিয়ে চিন্তা করার যথেষ্ট কারণ আছে। প্রাথমিকের একান্ন শতাংশ শিক্ষার্থী গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল। বিজ্ঞানেও তাদের অবস্থা ভালো নয়।

এখন যে শিক্ষকরা নিয়োগ পাচ্ছেন, তাদের বড় অংশই অনার্স, মাস্টার্স পাস। এত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার পরও যদি আমাদের শিশুরা গণিত, ইংরেজি আর বিজ্ঞানেই দুর্বল থাকে, তাহলে সমস্যাটা শুধু শিক্ষক নিয়োগে নেই, কোথাও একটা বড় ধরনের গলদ আছে। তাই ববি ভাইয়া যদি সত্যিই এই দৌড়ঝাঁপ করে প্রাথমিক শিক্ষাকে লাইনে আনতে পারেন, তাহলে তাকে সবার সমর্থন করা উচিত।

কিছুদিন ধরে তিনি শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা সভা করেছেন, সিনিয়র শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। এই ধরনের সভার বক্তাদের কথাই বেশি ইন্টারেস্টিং মনে হয় কারণ মন্ত্রী অনেক কিছু ভাবতে পারেন, কিন্তু মাঠে থাকা একজন শিক্ষক বা শিক্ষা কর্মকর্তা প্রতিদিন যে সমস্যার মুখোমুখি হন, সেটা মন্ত্রীর টেবিলে বসে সবসময় বোঝা সম্ভব নয়। এরকম একটি সভায় একজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে ববি স্যারকে বললেন, স্যার, আমার এলাকার কিছু প্রাথমিক স্কুল নূরানি মাদ্রাসার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে পারছে না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী বছর থেকে প্রাথমিক স্কুলে এক ঘণ্টার মক্তব চালু করব। সকাল আটটা থেকে নয়টা পর্যন্ত মক্তব পড়ানো হবে।

কথাটা শুনে আমি সত্যিই অবাক হলাম। কিছুক্ষণ ভাবার পর মনে হলো, আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মানুষটি হয়তো অসহায় হয়ে পড়েছেন। একজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, যার হাতে জাতীয় শিক্ষা নীতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা নেই, তিনি নিজের হাতে যা আছে সেটুকু দিয়েই লড়াই করার চেষ্টা করছেন। তিনি দেখছেন, তার স্কুলে জায়গা আছে, শিক্ষক আছে, বই আছে, খাবার আছে, পোশাক আছে, উপবৃত্তি আছে, কিন্তু ছাত্র নেই।

অন্যদিকে নূরানি মাদ্রাসায় বসার জায়গা পর্যন্ত নেই। এটা আসলে খুব অদ্ভুত একটা দৃশ্য। একটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আরেকটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছাত্র পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করছে। রাষ্ট্র যেখানে প্রায় সবকিছু বিনামূল্যে দিচ্ছে, সেখানে একজন সরকারি কর্মকর্তা বসে হিসাব করছেন, কী করলে বাচ্চাদের আবার প্রাথমিক স্কুলমুখী করা যায়। শেষ পর্যন্ত সমাধান হিসেবে বের হলো এক ঘণ্টার মক্তব।

মাদ্রাসার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে প্রাথমিক স্কুলে যদি মক্তব চালু করে, তাহলে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসে । নূরানি মাদ্রাসায় এত ভিড় কেন, অভিভাবকরা সেখানে সন্তান পাঠাচ্ছেন কেন। একজন শিশু নূরানি মাদ্রাসায় পড়লে জীবনের দৌড়ে কতটা এগিয়ে যাবে, আর প্রাথমিক স্কুলে পড়লে কতটা এগিয়ে যাবে, এই প্রশ্নের উত্তরটা কি আমরা কখনো অভিভাবকদের সামনে পরিষ্কারভাবে দিতে পেরেছি ?

অনেক বাবা মা মনে করেন, সন্তানকে মাদ্রাসায় পড়ালে অন্তত পরকালের জন্য একটা নিরাপত্তা থাকবে। কেউ হয়তো মনে করেন, সাধারণ লাইনে পড়ে চাকরি নেই। কেউ হয়তো ভাবেন, মাদ্রাসায় পড়লে খাওয়া থাকার একটা ব্যবস্থা পাওয়া যায়। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের কাছে এই বিষয়গুলো ছোট নয়। কিন্তু একটা প্রশ্ন মনে উকি দেয় , মাদ্রাসায় পড়লে কি বেকারত্ব দূর হবে, সেখানে কি চাকরির নিশ্চয়তা আছে। সন্তানকে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠানো, যেখান থেকে তার ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, সেটা কি দরিদ্র পরিবারের জন্য সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ? আর যদি সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় সত্যিই এত সম্ভাবনা থাকে, তাহলে দরিদ্র পরিবারের বাবা মা সেটা বিশ্বাস করছেন না কেন।

এখানেই আসল সমস্যাটা। সরকার বছরের পর বছর প্রাথমিক শিক্ষায় টাকা ঢেলেছে। দেশে প্রায় তেষট্টি হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। বই বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও খাবার দেওয়া হচ্ছে, পোশাক দেওয়া হচ্ছে, উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে, শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, স্কুলের অবকাঠামো বানানো হচ্ছে। তারপরও যদি একজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, আমাদের স্কুল নূরানি মাদ্রাসার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে পারছে না, তাহলে আমাদের একটু থামা দরকার, ভাবা দরকার; আমরা কি এতদিন ভুল সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেছি ? আমরা ভেবেছি স্কুলে ভবন নেই, ভবন বানিয়েছি। শিক্ষক নেই, শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছি। বই নেই, বই দিয়েছি। শিশুর খাবারের সমস্যা আছে, খাবার দিয়েছি। অভিভাবকের অর্থের সমস্যা আছে, উপবৃত্তি দিয়েছি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সমস্যা স্কুল নেই বলে নয়, সমস্যা হচ্ছে শিশু স্কুলে আসছে না।

মক্তবের প্রস্তাবটাকে একেবারে খারাপ বলতে পারছি না, কারণ আমি বুঝতে পারছি ওই কর্মকর্তা কেন এমন ভাবলেন। তিনি দেখেছেন তার হাতে আর কিছু নেই। অভিভাবকের বিশ্বাস বদলানোর ক্ষমতা তার নেই, পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলানোর ক্ষমতা তার নেই। তিনি শুধু নিজের স্কুলের ভেতরে কিছু একটা করতে পারেন, তাই মক্তব। কিন্তু এখানেই আমার ভয়। আমরা যদি নূরানি মাদ্রাসার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে সরকারি প্রাথমিক স্কুলের ভেতরেই মক্তব চালু করি, তাহলে উল্টো আমরা নূরানি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাটাকেই আরও শক্তিশালী করে ফেলছি কি না, সেটা ভাবা দরকার। যেখানে কথা ছিল মাদ্রাসাগুলোতে আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ও ইংরেজি আরও শক্তিশালী করতে হবে, সেখানে আমরা উল্টো প্রাথমিক স্কুলে মক্তব চালু করার কথা ভাবছি। এটা কি প্রতিযোগিতায় জেতার কৌশল, নাকি প্রতিদ্বন্দ্বীর শক্তিকে নিজের প্রতিষ্ঠানেই স্বীকৃতি দেওয়া ?

অনেক অভিভাবক চান তার সন্তান কোরআন শিখুক। এখন যদি সরকারি প্রাথমিক স্কুল বলে, আমরাও এক ঘণ্টা মক্তব পড়াব, তাহলে হয়তো কিছু পরিবার স্কুলে যাবে । কিন্তু অন্য একটি পরিবার উল্টো ভাবতে পারে, স্কুলে যদি মক্তবের প্রয়োজনই হয়, তাহলে সরাসরি নূরানি মাদ্রাসায় পাঠালেই তো হয়। এক ঘণ্টার মক্তব যদি নূরানি মাদ্রাসার মতো মানসম্মত না হয়, তাহলে অভিভাবক বলবেন, এখানে তো ঠিকমতো শেখানো হচ্ছে না। আর যদি খুব ভালো হয়, তাহলেও প্রশ্ন থাকবে, যারা আরও বেশি দ্বীনি শিক্ষা চান তারা শেষ পর্যন্ত কি করবে ? অর্থাৎ মক্তব হয়তো কিছু শিশুকে ধরে রাখতে পারে, কিন্তু এটা যে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সেটা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। বরং একটা ঝুঁকি আছে, প্রাথমিক স্কুল নিজেই যদি বলে আমাদেরও মক্তব দরকার, তাহলে নূরানি মাদ্রাসার প্রতি সামাজিক চাহিদা আরও বৈধতা পেতে পারে।

এখানে শিক্ষা কর্মকর্তার কোনো ভুল দেখি না , বরং তার জন্য খারাপই লাগছে। তিনি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন, সেখান থেকে হয়তো এটিই তার কাছে শেষ সমাধান মনে হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের তো শেষ সমাধান হিসেবে এক ঘণ্টার মক্তবের ওপর নির্ভর করার কথা নয়। রাষ্ট্রের হাতে আরও বড় অস্ত্র আছে, টাকা, আর্থিক প্রণোদনা, নীতির ক্ষমতা। আমাদের এখন একটু অন্যভাবে ভাবতে হবে। শুধু ভালো স্কুল বানালেই হবে না, শুধু শিক্ষক বাড়ালেই হবে না, শুধু বই খাবার পোশাক দিলেই হবে না। যদি দরিদ্র পরিবারের কাছে সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর একটা অর্থনৈতিক মূল্য থাকে, তাহলে সেই মূল্যটাও রাষ্ট্রকে বিবেচনায় নিতে হবে।

এখানেই কন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার বা সিসিটি মডেল নিয়ে ভাবা যায়। সরকার এখন যে ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছে, সেটাই হতে পারে এর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সরকার বলছে, দরিদ্র পরিবারকে একটু স্বস্তি দেওয়ার জন্য এই কার্ড, উদ্দেশ্য খারাপ নয় বরং খুবই ভালো। কিন্তু এত বড় একটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে যদি একটা শর্ত যুক্ত করা যেত, তাহলে একই টাকা দিয়ে আরও বড় সামাজিক ফল পাওয়া সম্ভব হতো। ধরুন, একটি দরিদ্র পরিবারের প্রাথমিক স্কুলে পড়ার বয়সী সন্তান আছে, পরিবারটি ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পাবে, কিন্তু শর্ত হলো সন্তানকে নিয়মিত প্রাথমিক স্কুলে পাঠাতে হবে।

শিশু যদি নির্দিষ্ট হারের নিচে উপস্থিত থাকে, তাহলে আগে সতর্কবার্তা যাবে, নিয়মিত অনুপস্থিত থাকলে সুবিধা সাময়িক স্থগিত হবে, আর মাসের শেষে সন্তানের উপস্থিতি ঠিক থাকলে টাকা পরিবারের ব্যাংক হিসাবে চলে যাবে। এখানে সরকার নতুন করে কোনো বিশাল প্রকল্পের টাকা ঢালতে হবে না, যে টাকা এমনিতেই দিচ্ছে সেটাকে সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করছে। আজ যে পরিবারকে বলা হচ্ছে তুমি দরিদ্র তাই টাকা নাও, সেই পরিবারকে বলা যেতে পারে তুমি দরিদ্র তাই টাকা নাও এবং তোমার সন্তানকে স্কুলে পাঠাও। দুটোর মধ্যে পার্থক্য অনেক, কারণ প্রথমটি শুধু সামাজিক নিরাপত্তা, দ্বিতীয়টি সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নকে যুক্ত করে।

আমাদের বর্তমান উপবৃত্তির অঙ্কও এখানে নতুন করে ভাবা দরকার। মাসে কয়েকশ টাকা একজন দরিদ্র পরিবারের সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়ার মতো শক্তিশালী প্রণোদনা নাও হতে পারে, সেখানে আড়াই হাজার টাকার মতো একটি সহায়তা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। অবশ্যই টাকা দিলেই সব বাবা মা সন্তানকে স্কুলে পাঠাবেন এমন নিশ্চয়তা নেই। যদি সমস্যার মূল কারণ হয় সরকারি স্কুলের শিক্ষার মান নিয়ে অনাস্থা, তাহলে আগে স্কুলের মানও বাড়াতে হবে। যদি কারণ হয় ধর্মীয় বিশ্বাস, তাহলে সেটার সঙ্গেও রাষ্ট্রকে সংবেদনশীলভাবে কাজ করতে হবে। কিন্তু যদি অর্থনৈতিক চাপ একটা বড় কারণ হয়, তাহলে সিসিটি মডেল কেন পরীক্ষা করা হবে না ?

প্রথমে একটি বা দুইটি উপজেলায় চালু করে দেখা দরকার। শিশুর জন্য একটি সহজ ডিজিটাল আইডি থাকতে পারে, কিউআর কোডযুক্ত ছোট একটি কার্ড হতে পারে, শিক্ষক মোবাইল থেকেই হাজিরা দিতে পারেন, শিশু অনুপস্থিত থাকলে অভিভাবকের মোবাইলে এসএমএস যেতে পারে, আপনার সন্তান আজ স্কুলে যায়নি, টানা তিন দিন অনুপস্থিত, আপনার ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা চালু রাখতে সন্তানের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করুন। এত বড় প্রযুক্তি বিপ্লবেরও প্রয়োজন নেই, একজন শিক্ষক হাজিরা দেবেন, একটি সিস্টেম সেটা সংরক্ষণ করবে, আর অভিভাবক খবর পাবেন। ধীরে ধীরে পরীক্ষার ফল, উপস্থিতি, ঝরে পড়ার ঝুঁকিও এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, একজন শিশুর স্কুলে যাওয়া আর সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা তখন আলাদা দুটি বিষয় থাকবে না, একটি আরেকটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে।

এই কাজ একা কারো পক্ষে করা সম্ভব না। ফ্যামিলি কার্ডের মালিক সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, আর কার সন্তান স্কুলে যাচ্ছে সেই তথ্য থাকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাতে। দুটো মন্ত্রণালয় একসাথে না বসলে, দুটো ডেটাবেজ একসাথে যুক্ত না হলে এই শর্তটা কাগজেই থেকে যাবে। কোনো সাইলো এফেক্ট চলতে দেওয়া যাবে না। আর এটা মনিটর করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওপর, কারণ দুই মন্ত্রণালয়কে একসাথে কাজ করানোর মতো নির্দেশ নিচের স্তর থেকে আসে না, ওপর থেকে আসে।

প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি বিষয়টা জানাতে হবে, মন্ত্রিপরিষদকেও কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে যাতে বাস্তবায়নে ফাঁক না থাকে। আর শর্তটা যদি সত্যিই ন্যায্য হতে হয়, তাহলে সেটা সবার জন্য সমান হওয়া উচিত, রাজনৈতিক পরিচয় দেখে ছাড় দেওয়া চলবে না। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যদি এই কার্ডের টাকা পেতে চান, তাদের নিজের সন্তানকেও প্রাথমিক স্কুলে পাঠাতে হবে, কোনো ব্যতিক্রম রাখা যাবে না। তা না হলে শর্তটা শুধু গরিবের জন্য একটা বাড়তি শাসনে পরিণত হবে, আর সেটা এই পুরো পরিকল্পনার নৈতিক ভিত্তিটাই দুর্বল করে দেবে।

ফ্যামিলি কার্ডকে শুধু টাকা দেওয়ার যন্ত্র হিসেবে না দেখে সামাজিক নীতির একটি ডেলিভারি মেকানিজম হিসেবে দেখা উচিত। এতদিন আমরা ভাবছি, দরিদ্র মানুষকে টাকা দেব। এখন ভাবতে হবে, সেই টাকা দিয়ে আমরা আর কী অর্জন করতে পারি। দারিদ্র্য কমানো যাবে, শিশুকে স্কুলে রাখা যাবে, শিশুশ্রম কমানো যাবে, মানবসম্পদ তৈরি করা যাবে, একই টাকার ওপর একাধিক সামাজিক রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। এই জায়গাটাতেই আমার মনে হয় আমাদের নীতিনির্ধারকদের একটু নতুন করে ভাবা উচিত। আর সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার হলো, ফ্যামিলি কার্ড এখনো যদি ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের পর্যায়ে থাকে, তাহলে সিস্টেম বদলানোর সুযোগ আছে।

শুরুতেই যদি প্রাথমিক স্কুলে পড়ার বয়সী সন্তান আছে এমন দরিদ্র পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে পরে নতুন করে কারও কাছ থেকে সুবিধা কেড়ে নেওয়ার রাজনৈতিক জটিলতাও তৈরি হবে না। প্রথমে কয়েকটি উপজেলায় চালানো হোক, দেখা হোক উপস্থিতি বাড়ে কি না, ঝরে পড়া কমে কি না, অভিভাবকের আচরণ বদলায় কি না, তারপর সফল হলে পুরো দেশে করা হোক। এটাই হওয়া উচিত নীতি, প্রমাণ দিয়ে শুরু করা, ফল দেখে বাড়ানো, কারণ আমাদের সমস্যা এখন স্কুলের সংখ্যা কম নয়, আমাদের সমস্যা হলো স্কুলে শিশু কমছে।


প্রাইমারী ইশকুলে মক্তব খোলার প্রস্তাবনা শিক্ষা অফিসারের- Click This Link


ফটোকার্ড ক্রেডিট: দ্যা পোস্ট

সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৫৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আন্দোলনের সময় বেকারদের দরকার ছিল, এখন কি আর নেই?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:২০


সারজিস আলমকে দেখে একসময় মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে হয়তো সত্যিই নতুন কিছু আসতে যাচ্ছে। কোটা আন্দোলনের আইকনিক মুখ, গর্বিত ঢাবিয়ান, এনসিপির বড় নেতা। শেখ হাসিনার আমলে সকাল বিকাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

প্রশ্নটি এখন আর নিছক কল্পনা নয়।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান Makkah Joint Defence Agreement-এ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা জানেন না তাদের জন্য! কফি এনিমা (Coffee Enema)!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৩

কফি এনিমা হলো মলদ্বার দিয়ে কোলন বা বৃহদন্ত্রে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে পেট পরিষ্কার করার একটি বিকল্প পদ্ধতি। নিচে এটি শরীরে দেওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হলোঃ

প্রয়োজনীয় উপকরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিলাদুন্নবী: ভালোবাসার নবী, মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন বা মিলাদুন্নবী শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিন নয়; এটি মানবতার জন্য এক মহান আদর্শের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ। তাঁর আগমন ছিল এমন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?
====================
একটি ১১ বছরের শিশু যার বয়স খেলাধুলা, পড়াশোনা আর স্বপ্ন দেখার। সেই শিশুকে যদি যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং তার গর্ভে একটি সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×