somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাংবাদিকদের এত জ্বালা কেন?

২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


দেশের মানুষে কত সমস্যা, কত সংকট, প্রতিদিন চোখের সামনে কত দুর্নীতি ঘটছে, সেসব নিয়ে কারোরই খুব একটা মাথাব্যথা নেই। কিন্তু পরীক্ষার হলে কোনো ছাত্র একটু বই খুলে বসল কিংবা কোনো সরকারি কর্মকর্তার টেবিলে এক বান্ডিল টাকা দেখা গেল, ব্যস, সাংবাদিকদের বিবেক তখন এমনভাবে জেগে ওঠে, যেন দেশের ভাগ্য ওই বইয়ের পাতা আর টাকার বান্ডিলটার মাঝেই আটকে আছে।

ঘটনাটি কাজিপুর ডিগ্রি কলেজের। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের পরীক্ষা চলছে। অভিযোগ উঠল, ৫০০ টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের বই দেখে লেখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সাংবাদিকরা খবর পেয়ে ক্যামেরা নিয়ে হাজির হলেন, ভিডিও করলেন, আর তা ছড়িয়ে পড়ল নেটদুনিয়ায়। শুরু হলো হৈচৈ, উত্তেজনা এবং শেষমেশ চারজন পরীক্ষার্থীর কপালে জুটে গেল বহিষ্কারাদেশ।

এখন আমার প্রশ্ন হলো, এই ছাত্রগুলোর ভবিষ্যতের কথা কেউ কি একটু ভেবে দেখেছেন? তারা তো সারাবছর ঠিকমতো পড়ার ফুরসত পায় না। জীবনে তাদের কত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ! পরিবার সামলানো থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, প্রেম ভালোবাসা টিকিয়ে রাখা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া কিংবা সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা, এগুলো কি কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ?

ধরুন, একজন ছাত্র প্রেম করতে গেল। সে রেস্টুরেন্টে বসল, ফলে কর্মচারীর কর্মসংস্থান হলো। রিকশায় চড়লে রিকশাচালকের আয় হয়, ফুল কিনলে ফুল বিক্রেতা খুশি হয়, মোবাইল রিচার্জ করলে কোম্পানি লাভবান হয়। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় চা ও ফাস্টফুড বিক্রি বাড়ে। অর্থাৎ, ছাত্রদের এই ব্যস্ত জীবনযাত্রার মাধ্যমেই তো দেশের অর্থনীতি দারুণভাবে সচল থাকছে!

এরপর পরীক্ষার দিনে সেই ছাত্রটি ৫০০ টাকা দিল, এটাও কি অর্থনীতির জন্য খুব খারাপ কিছু? সেই টাকা তো আর পকেটে বসে থাকে না, হাতবদল হয়ে চলে যায় অন্যের কাছে। তা দিয়ে বাজার হয়, খাবার কেনা হয়, যাতায়াত বা মোবাইল রিচার্জ হয়। টাকা এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘোরার এই প্রবাহকে অর্থনীতির ভাষায় মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট বলে।

ছাত্র যত বেশি খরচ করবে, বাজারে টাকা তত বেশি ঘুরবে। ব্যবসা বাড়বে, মানুষের আয় বাড়বে, আর শেষ পর্যন্ত সরকারের ভ্যাট ও রাজস্বও বৃদ্ধি পাবে। সাংবাদিকরা কি এই সাধারণ অর্থনৈতিক সমীকরণটুকু বোঝেন না? ৫০০ টাকার নোট দেখলেই তাদের চোখে শুধু ঘুষ আর দুর্নীতি ভেসে ওঠে? আপনারা একটু অর্থনীতি পড়ে আসুন ! কারণ একজন ছাত্রের দেওয়া ওই ৫০০ টাকারও তো একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মূল্য আছে। কিন্তু তা না করে তারা ক্যামেরা অন করলেন, ভিডিও ছড়িয়ে দিলেন এবং নেটিজেনদের উসকে দিলেন। দেখে মনে হলো, দেশের সবচেয়ে বড় সংকট বুঝি ওই কয়েকজন ছাত্রের বই দেখে পরীক্ষা দেওয়া!

অথচ চারপাশে কত হাহাকার ! মানুষের চাকরি নেই, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস উঠেছে, সরকারি সেবা পেতে পদে পদে ভোগান্তি, বড় বড় প্রকল্পে লাগামহীন অনিয়ম। এত সবের মাঝে কয়েকজন ছাত্র একটু বই লিখেছে, তা নিয়ে এমন কাণ্ড ঘটানোর কী দরকার ছিল? এর ফলে আর কিছু হোক বা না হোক, শিক্ষামন্ত্রীর ভাবমূর্তি ঠিকই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। তিনি তো নকলের বিরুদ্ধে রীতিমতো জিহাদ ঘোষণা করেছেন !

এখন সাংবাদিকরা এমন একটি ভিডিও ছেড়ে দেওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছে, এত জিহাদের পরও হলের ভেতর বই চলছে কেন? এতে কার কী লাভ হলো? ছাত্রদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বদনাম হলো, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলো। শুধু লাভ হলো সাংবাদিকদের, তাদের কিছু টিআরপি বাড়ল! আর ওই চারজন ছাত্র? তাদের ডিগ্রি শেষ হতে দেরি হবে, চাকরির বয়স ফুরিয়ে যাবে, পরিবারে নেমে আসবে অনিশ্চয়তা। সাংবাদিকরা কি কখনো এই ক্ষতির হিসেবটা করেছেন?

এবার আসা যাক দ্বিতীয় আরেকটি ঘটনায়। এক সরকারি প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি কাজের অগ্রগতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিল তুলেছেন এবং বিপুল পরিমাণ ঘুষ নিয়েছেন। তাঁর অফিসকক্ষে থরে থরে সাজানো টাকার বান্ডিলের ভিডিও নিয়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে। সাংবাদিকরা বরাবরের মতো আবার কোমর বেঁধে অনুসন্ধানে নেমে পড়েছেন। এখানেও আমার তীব্র আপত্তি আছে!

একজন প্রকৌশলী যদি সেই ঘুষের টাকা দিয়ে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বানান, সমস্যা কোথায়? ফ্ল্যাট বানাতে কি ইঞ্জিনিয়ার লাগে না? ঠিকাদার লাগে, রাজমিস্ত্রি লাগে, শ্রমিক লাগে, রড সিমেন্ট ইটের বিক্রেতা লাগে, টাইলস মিস্ত্রি লাগে, ইলেকট্রিশিয়ান লাগে, প্লাম্বার লাগে, সবার কর্মসংস্থান হয় না? ফ্ল্যাটটি তৈরি হওয়ার পর একজন দারোয়ান লাগে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী লাগে। সাংবাদিকরা কি কখনো হিসাব করে দেখেছেন, ওই একটি ফ্ল্যাট নির্মাণের মাধ্যমে কত মানুষের পেটে ভাত যায়?

তিনি যদি টাকাগুলো স্রেফ ঘরের কোণে লুকিয়ে রাখতেন, তাহলে না হয় একটা কথা ছিলো। কিন্তু ফ্ল্যাট বানানোর ফলে নির্মাণ খাত চাঙ্গা হয়েছে, শ্রমিকের আয় বাড়বে, দোকানদারের বিক্রি বাড়বে পরিবহন ও আসবাবপত্রের ব্যবসা সরগরম হবে। বাজারে টাকার গতিশীলতা বজায় থাকবে। এমনকি সেই টাকার একটা অংশ ঘুরেফিরে শেষ পর্যন্ত সরকারের কোষাগারে ভ্যাট ও কর হিসেবেও তো আসতে পারে!

সাংবাদিকরা শুধু ঘুষ আর দুর্নীতির বুলি আওড়ান। কিন্তু ওই প্রকৌশলী যে নির্মাণ খাতকে সচল রাখছেন, সে কথা কি একবারও স্বীকার করেন? ধরা যাক, ইশকুল ভবন হয়েছে বাস্তবে আটতলা, কিন্তু কাগজে দেখানো হয়েছে দশতলা। সাংবাদিকরা চেঁচিয়ে উঠছেন, দুই তলার কাজ হয়নি! আরে ভাই, কাগজে তো হয়েছে! আমাদের দেশে কাগজের উন্নয়ন কি কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু? অন্তত রিপোর্টে তো দেশের উন্নয়ন দৃশ্যমান হচ্ছে!

আর তারা কি না আবার সম্পদের পাহাড় খুঁজতে নেমেছেন ! স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনের নামে জমি প্লট রিসোর্ট কোথায় কী আছে, সব খুঁজে বের করছেন। একজন মানুষ একটু শখ করে সম্পদ বানালেই এত চুলকানি কেন? দেশে সম্পদ তৈরি হচ্ছে, জমি কেনাবেচা হচ্ছে, শ্রমিকরা কাজ পাচ্ছে, বাজারে টাকার প্রবাহ সচল থাকছে। এত চমৎকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাঝেও সাংবাদিকরা শুধু দুর্নীতি দেখেন কেন?

সাংবাদিকরা এত জ্বালাতন করবেন না। ছাত্রদের ভবিষ্যৎ ভাবুন, শিক্ষামন্ত্রীর সম্মান বাঁচান, প্রকৌশলীর অবদান উপলব্ধি করুন, শ্রমিকের পেটের ভাতের কথা চিন্তা করুন। দেশের এত বড় বড় সমস্যা থাকতে পরীক্ষার হলের বই আর টেবিলের টাকার বান্ডিল নিয়ে আর কত নাটক করবেন? ছাত্ররা নতুন জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি বের করেছে, অর্থনীতিতে মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট এনেছে, আর প্রকৌশলী নির্মাণ খাতকে চাঙ্গা করেছেন। সবাই কোনো না কোনোভাবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। কিছুই বুঝতে না পেরে নেটিজেনদের এভাবে ক্ষেপিয়ে তুলবেন না ।

প্রকৌশলী হাসান শওকত অফিসে বসে বস্তা ভরা ঘুষের টাকা নেন- জনতার পত্রিকা ।

৫০০ টাকার বিনিময়ে বই দেখে পরীক্ষা, ভিডিও করায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা-জাগো নিউজ

সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এই সমাজ- ৭২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৩



দেশের সরকার অযোগ্য অদক্ষ হলে, জনগনের শান্তি থাকে না।
দেশের জনগন সারাদিন কাম কাজ করে। অফিসে নানান রকম যন্ত্রনা পোহায়। নানান জক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়। অফিসে থাকে না... ...বাকিটুকু পড়ুন

তেল গ‍্যাস অনুসন্ধান আর বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে, সুদি মহাজন আর খাম্বা/কার্ড সরকারের মিথ্যাচারের জবাব॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৮



২০০৮-২০২৪ এই ১৬ বছরকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন "chronicle of shoddy gas exploration" - মানে গ্যাস অনুসন্ধানের ধীরগতির ইতিহাস।

২০০৮-২০২৪ এর মূল চিত্র

< Between 2008 and 2024, bureaucratic interference... ...বাকিটুকু পড়ুন

মূল ইশরাত মঞ্জিল ধ্বংসের আসল খলনায়ক কে?

লিখেছেন মৌন পাঠক, ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:১১

কথায় কথায় বামপন্থী, সেক্যুলারদের গালি দেয়া হচ্ছে ইশারাত মঞ্জিলের ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য।

কিন্তু দালিলিক ইতিহাস হলো— ১৯৫১-৫২ সালে মূল ইশারাত মঞ্জিল বিল্ডিংয়ে কোনো হিন্দু, বামপন্থী বা আওয়ামী লীগার বুলডোজার চালায়নি!

তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবননগর

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৪১



গ্রাম দেখতে কোলাহলের বাইরে গিয়ে দেখি-
কোথাও নেই একরত্তি গ্রাম!
বিলুপ্ত হয়েছে যাবতীয় সবুজ সুন্দর;
সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছে কংক্রিটের বন!
ভ্রমণক্লান্তিতে খুব তৃষ্ণার্ত হয়ে-
জলপানাঙ্ক্ষা জানাতেই পেলাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ নেপালের চেয়েও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:২৬

বাংলাদেশ নেপালের চেয়েও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।



বাংলাদেশে যদি একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প বা বড় ধরনের নগর দুর্যোগ আঘাত হানে, তাহলে দেশটি নেপালের অভিজ্ঞতার চেয়েও বহুগুণ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×