কীভাবে ধরা হলো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট?
মিশনের নাম ছিল--‘অপারেশন অ্যাবসলুট রিজলভ’।
অনেকে এটাকে তুলনা করছেন পানামার স্বৈরশাসক মানুয়েল নোরিয়েগা আর সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে।
তবে এগুলো আছিলো পুরাটা সামরিক আক্রমণ ও দীর্ঘ অভিযান। আর ভেনেজুয়েলার যেটা হলো সেটা মাত্র ২ ঘণ্টার অভিযান। যা ‘দ্রুততম রেজিম চেঞ্জ’ যা মডার্ন মার্কিন সামরিক কৌশল।
এটা অনেক মাসের নিখুঁত গোয়েন্দা প্রস্তুতিতে অভিযানের মূল ভিত্তি। সিআইএ মাসের পর মাস ধরে মাদুরোর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা বলয়ে কাজ করে।
ভেনেজুয়েলার গোয়েন্দা সংস্থা SEBIN এবং প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড–এর কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হন। তারা মাদুরোর কখন ঘুমান, কোন রুমে থাকেন, কোন গাড়ি ব্যবহার করেন, প্রেসিডেন্সিয়াল কম্পাউন্ডের লেআউট কেমন এবং নিরাপত্তা শিফট কখন পরিবর্তন হয়। রিপোর্ট অনুযায়ী, অন্তত ২-৩ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সরাসরি তথ্য দিয়েছেন, যাদের কাছে মাদুরোর বেডরুমের চাবি পর্যন্ত ছিল। NSA মাদুরো ও ঘনিষ্ঠদের ফোন কল, ইমেইল এবং এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ইন্টারসেপ্ট করে।
যদিও ভেনেজুয়েলার যোগাযোগ ব্যবস্থা রাশিয়ান ও চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তবুও অনেক কর্মকর্তা পুরোনো বা কম সুরক্ষিত ডিভাইস ব্যবহার করছিলেন। এর ফলে মাদুরোর ফোন বা গাড়ির জিপিএস সিগন্যাল রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করা সম্ভব হয়।
অপারেশনের ঠিক আগে নিরাপত্তা বাহিনীকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত করা হয়। বলা হয়, কলম্বিয়া সীমান্তে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে। এর ফলে বাহিনীর মনোযোগ রাজধানী কারাকাস থেকে সরে যায়। বিভিন্ন এলাকায় ড্রোন অ্যাকটিভিটি দেখিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়।
প্রথমেই আকাশ প্রতিরক্ষা ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র ১৫০টিরও বেশি এয়ারক্রাফট ব্যবহার করে। এর মধ্যে ছিল F-22, F-35, EA-18G Growler এবং B-1 Bomber।এটি ছিল একটি ক্লাসিক SEAD (Suppression of Enemy Air Defenses) অপারেশন।
রাডার জ্যাম করা হয়, অ্যান্টি-রেডিয়েশন মিসাইল দিয়ে সক্রিয় রাডার ধ্বংস করা হয় এবং সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে কন্ট্রোল সিস্টেম অচল হয়। এরপর ডেলটা ফোর্স এবং ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস অ্যাভিয়েশন রেজিমেন্ট–এর হেলিকপ্টার খুব নিচু দিয়ে উড়ে কারাকাসে প্রবেশ করে। রাতের অন্ধকারে তারা রাডারের নিচ দিয়ে উড়ে মাদুরোর কম্পাউন্ডে পৌঁছায় এবং তাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। পুরো অভিযান রাত ২টার দিকে শুরু হয়ে চার ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে শেষ হয়।
**এই ঘটনার শিক্ষা কী-
এই অপারেশন দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু উন্নত অস্ত্র থাকলেই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ জনবল, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শক্তিশালী গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা। উন্নত ও শক্তিশালী দেশগুলোর জন্য এগুলো স্বস্তির কথা হলেও অর্থনৈতিক-সামরিকভাবে দুর্বল দেশের জন্য শঙ্কার। এছাড়া জাতিসংঘের অধীনে থাকা দেশগুলোর নীতিমালা এবং এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের আচরণ-পদক্ষেপের আইনী যৌক্তিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এই অভিযানের পরে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা আর সমতার বিচারে এটি একটি নেতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও একটি সতর্কবার্তা- অস্ত্র কেনার পাশাপাশি গোয়েন্দা প্রস্তুতির সঙ্গে যথাযথ প্রশিক্ষণে গুরুত্ব না দিলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এছাড়া দেশত্ববোধের বিচারে জনগণের সমর্থন ও জনপ্রিয়তা থাকা দরকার সরকার ও সরকার প্রধানদের, যাতে করে বৈশ্বিক কোনো হস্তক্ষেপে জনগণ পাশে থাকে যেকোনো সুবিধা-অসুবিধায়।
(বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য-সংবাদের ভিত্তিতে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

