“নাসিরুদ্দিন মুহাম্মাদ হুমায়ূন” [১৫০৮-১৫৫৬] প্রতাপশালী মোঘল সম্রাট যিনি ১৫৩০-১৫৪০ এবং ১৫৫৫-১৫৫৬ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষ শাসন করেছিলেন। মাঝখানের ১৬ বছর তিনি ছিলেন সিংহাসনচ্যুত। “চউসা” এবং “কনৌজ” এর যুদ্ধে শের শাহের কাছে পরাজয়ের পরে তিনি সিংহাসন হারান। পিতা সম্রাট বাবর এর মৃত্যুর তিন দিন পরে ১৫৩০ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন। হুমায়ূন এর ভাইদের মধ্যে পিতা বাবর এর নির্দেশ অনুসারে “কামরান”কে কাবুল এবং কান্দাহার এর শাসনভার, “আসকারি”কে সম্বল এর শাসনভার এবং “হিন্দাল” কে আলোয়ার এবং মেওয়াট এর শাসনভার অর্পণ করেন।
দীর্ঘ সংগ্রামের পড়ে দিল্লীর সিংহাসন পুনরুদ্ধার করবার ১ বছরের মাথায় ১৫৫৬ সালের ১৭ই জানুয়ারি তারিখে মাগরিবের নামাজের সময় সম্রাট সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে যান এবং ২৪শে জানুয়ারি সন্ধ্যায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। হুমায়ুনের মৃত্যুসংবাদ জওহর বর্ণনা করেছেন এইভাবে ঃ
"খবর পাওয়া গেলো যে সম্রাট হুমায়ূন মৃত্যুর শরবৎ পান করে এ পার্থিব জগত থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। এ মানবিক অস্থিত্ত চিরস্থায়ী নয়। জীবনের পোশাক যিনি পরিধান করেছেন, তাকে অবশ্যই মরনের পেয়ালায় চুমুক দিতে হবে।"
সম্রাটের জীবনী লেখক “জওহর আফতাবচী” ছিলেন মুলত হুমায়ূন এর জলপাত্রবাহক ভৃত্য। তিনি এ গ্রন্থ রচনা করা শুরু করেন ৯৯৫ হিজরি সনে। জওহর যদিও সম্রাটের ভৃত্য ছিল তবুও তাঁর জানাশোনার পরিধি ছিল বিস্তৃত যা এই গ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায়গুলো পড়লেই বোঝা যায়।
সম্রাট হুমায়ূন এর ভৃত্যদের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত হবার কারনে তিনি সম্রাটকে অনেক কাছ থেকে এবং ঘনিষ্ঠভাবে দেখবার সুযোগ পান। ফলে তাঁর রচিত এই গ্রন্থে সম্রাটের সিংহাসনারোহন থেকে শুরু করে যুদ্ধ বিগ্রহ, বিদ্রোহ ও পুনরায় মুঘল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং হুমায়ূন এর মৃত্যু পর্যন্ত যে সকল ঘটনা বর্ণিত রয়েছে তাই ঐতিহাসিক এবং গবেষকগণ অধিকতর প্রামাণ্য বলে গ্রহন করেছেন।
লেখক জওহর কে সম্রাটের “আফতাবা” বা “ভৃত্য” রূপেই কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় কাটাতে হলেও দ্বিতীয়বার সম্রাট হুমায়ূন রাজ্য লাভের পরবর্তীতে তাঁকে “পাঞ্জাব” এবং “মুলতান” প্রদেশের “খাজাঞ্চি” বা “রাজস্ব কর্মচারী” এর গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করা হয়েছিলো এবং সম্রাট আকবরের সময়েও তিনি একই পদে বহাল থাকেন। জওহর এর ভাষায় ঃ
“এ অধম জওহর মহামহিম সম্রাট আকবরের দরবারের এক অতি নগণ্য খাদেম”।
“তাজকিরাতুল ওয়াকিয়াত” বাংলায় অনুবাদ করেন চৌধুরী শামসুর রহমান ১৯৬৮ সালের নভেম্বরে যা “কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড” থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো। দীর্ঘ ৩৩ বছর পরে “দিব্যপ্রকাশ” থেকে বর্তমান সংস্করনটি বের হয় ২০০২ সালে।
পুরো বইটি মোট ৩৩ টি অধ্যায়ে বিভক্ত এবং বই এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৫৫। “তাজকিরাতুল ওয়াকিয়াত” নিছক কোন জীবনীগ্রন্থ নয় বরং তা “জওহর আফতাবচী” এর অসাধারণ রচনাশৈলীর কারনে তা শুধুমাত্র ইতিহাস গ্রন্থ হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে উঠেছে এক অপূর্ব সাহিত্যকর্ম। বইটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস এবং সাহিত্যর সংমিশ্রণে এক অসাধারণ অনুভুতি পাওয়া যায়।
দেরি না করে পড়ে ফেলতে পারেন এই বইটি। ইতিহাসের পাতায় পাতায় সময়টা ভালই কাটবে এইটুকু বলতে পারি।
লেখাটি শেষ করছি জীবনীর শুরুতে ভুমিকায় “জওহর আফতাবচী” এর লেখা একটি কবিতা দিয়ে ঃ
“কথার মালা সাজিয়ে দিলাম লেখনীর মুখে,
মানুষের স্মৃতি সঞ্চিত থাকে কথারই বুকে”।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



