somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তাজকিরাতুল ওয়াকিয়াতঃ সম্রাট হুমায়ূন এর জীবনী

১৪ ই এপ্রিল, ২০১৪ রাত ৩:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জীবনী গ্রন্থগুলো বরাবরই আমার পড়ার তালিকার শীর্ষে থাকে। এই ধরনের বইগুলোর একটা আলাদা আকর্ষণী শক্তি রয়েছে। পড়ার সময় মনে হয় যেন ওই ব্যাক্তির পুরো জীবনটাই চোখের সামনে ভাসছে। আর সেই জীবনী গ্রন্থ যদি হয় কোন প্রতাপশালী মোঘল বাদশাহর তাহলে বলাই বাহুল্য যে বইপ্রেমিদের আগ্রহ তখন বেড়ে যায় বহুগুন। গত সপ্তাহেই তাই শেষ করলাম দ্বিতীয় মোঘল সম্রাট “নাসিরুদ্দিন মুহাম্মাদ হুমায়ূন” এর জীবনী গ্রন্থ “তাজকিরাতুল ওয়াকিয়াতে হুমায়ূনী” বা “সম্রাট হুমায়ূন এর কাহিনী” যার মূল লেখক “জওহর আফতাবচী”।



“নাসিরুদ্দিন মুহাম্মাদ হুমায়ূন” [১৫০৮-১৫৫৬] প্রতাপশালী মোঘল সম্রাট যিনি ১৫৩০-১৫৪০ এবং ১৫৫৫-১৫৫৬ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষ শাসন করেছিলেন। মাঝখানের ১৬ বছর তিনি ছিলেন সিংহাসনচ্যুত। “চউসা” এবং “কনৌজ” এর যুদ্ধে শের শাহের কাছে পরাজয়ের পরে তিনি সিংহাসন হারান। পিতা সম্রাট বাবর এর মৃত্যুর তিন দিন পরে ১৫৩০ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন। হুমায়ূন এর ভাইদের মধ্যে পিতা বাবর এর নির্দেশ অনুসারে “কামরান”কে কাবুল এবং কান্দাহার এর শাসনভার, “আসকারি”কে সম্বল এর শাসনভার এবং “হিন্দাল” কে আলোয়ার এবং মেওয়াট এর শাসনভার অর্পণ করেন।

দীর্ঘ সংগ্রামের পড়ে দিল্লীর সিংহাসন পুনরুদ্ধার করবার ১ বছরের মাথায় ১৫৫৬ সালের ১৭ই জানুয়ারি তারিখে মাগরিবের নামাজের সময় সম্রাট সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে যান এবং ২৪শে জানুয়ারি সন্ধ্যায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। হুমায়ুনের মৃত্যুসংবাদ জওহর বর্ণনা করেছেন এইভাবে ঃ

"খবর পাওয়া গেলো যে সম্রাট হুমায়ূন মৃত্যুর শরবৎ পান করে এ পার্থিব জগত থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। এ মানবিক অস্থিত্ত চিরস্থায়ী নয়। জীবনের পোশাক যিনি পরিধান করেছেন, তাকে অবশ্যই মরনের পেয়ালায় চুমুক দিতে হবে।"

সম্রাটের জীবনী লেখক “জওহর আফতাবচী” ছিলেন মুলত হুমায়ূন এর জলপাত্রবাহক ভৃত্য। তিনি এ গ্রন্থ রচনা করা শুরু করেন ৯৯৫ হিজরি সনে। জওহর যদিও সম্রাটের ভৃত্য ছিল তবুও তাঁর জানাশোনার পরিধি ছিল বিস্তৃত যা এই গ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায়গুলো পড়লেই বোঝা যায়।

সম্রাট হুমায়ূন এর ভৃত্যদের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত হবার কারনে তিনি সম্রাটকে অনেক কাছ থেকে এবং ঘনিষ্ঠভাবে দেখবার সুযোগ পান। ফলে তাঁর রচিত এই গ্রন্থে সম্রাটের সিংহাসনারোহন থেকে শুরু করে যুদ্ধ বিগ্রহ, বিদ্রোহ ও পুনরায় মুঘল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং হুমায়ূন এর মৃত্যু পর্যন্ত যে সকল ঘটনা বর্ণিত রয়েছে তাই ঐতিহাসিক এবং গবেষকগণ অধিকতর প্রামাণ্য বলে গ্রহন করেছেন।

লেখক জওহর কে সম্রাটের “আফতাবা” বা “ভৃত্য” রূপেই কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় কাটাতে হলেও দ্বিতীয়বার সম্রাট হুমায়ূন রাজ্য লাভের পরবর্তীতে তাঁকে “পাঞ্জাব” এবং “মুলতান” প্রদেশের “খাজাঞ্চি” বা “রাজস্ব কর্মচারী” এর গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করা হয়েছিলো এবং সম্রাট আকবরের সময়েও তিনি একই পদে বহাল থাকেন। জওহর এর ভাষায় ঃ

“এ অধম জওহর মহামহিম সম্রাট আকবরের দরবারের এক অতি নগণ্য খাদেম”।

“তাজকিরাতুল ওয়াকিয়াত” বাংলায় অনুবাদ করেন চৌধুরী শামসুর রহমান ১৯৬৮ সালের নভেম্বরে যা “কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড” থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো। দীর্ঘ ৩৩ বছর পরে “দিব্যপ্রকাশ” থেকে বর্তমান সংস্করনটি বের হয় ২০০২ সালে।

পুরো বইটি মোট ৩৩ টি অধ্যায়ে বিভক্ত এবং বই এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৫৫। “তাজকিরাতুল ওয়াকিয়াত” নিছক কোন জীবনীগ্রন্থ নয় বরং তা “জওহর আফতাবচী” এর অসাধারণ রচনাশৈলীর কারনে তা শুধুমাত্র ইতিহাস গ্রন্থ হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে উঠেছে এক অপূর্ব সাহিত্যকর্ম। বইটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস এবং সাহিত্যর সংমিশ্রণে এক অসাধারণ অনুভুতি পাওয়া যায়।

দেরি না করে পড়ে ফেলতে পারেন এই বইটি। ইতিহাসের পাতায় পাতায় সময়টা ভালই কাটবে এইটুকু বলতে পারি।

লেখাটি শেষ করছি জীবনীর শুরুতে ভুমিকায় “জওহর আফতাবচী” এর লেখা একটি কবিতা দিয়ে ঃ

“কথার মালা সাজিয়ে দিলাম লেখনীর মুখে,
মানুষের স্মৃতি সঞ্চিত থাকে কথারই বুকে”।





৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×