আমি যেখানে থাকি সেই বাসার ঝুল বারান্দা থেকে তাকালে শ্যমলী রিং রোড চোখে পড়ে। গতকাল সন্ধ্যায় রাস্তার দিকে চোখ পড়তেই দেখি পূরো রাস্তা লাল সবুজ রঙের বাতির প্রজ্জবলিত আলোয় আলোকজ্জবল ।ভাবলাম হয়ত ঢাকা শহরের কোন ভূমি সন্তানের জাকজমকপূর্ণ বিবাহের আয়োজন চলছে।শীত শুরু হতে এটা অবশ্য ঢাকা শহরের স্বাভাবিকচিত্র। কিন্তু যখন আমি শ্যমলী স্কয়ারের সামনে মিরপুর রোডের রাস্তা পার হচ্ছি ,তখন দেখি আরে বাহ , এত দেখছি পুরো রাস্তার যতদূর চোখের দৃষ্টি যায় ততদূরই লাল সবুজ আলোতে আলোকিত! একটু চিন্তা করলাম আজ কি তবে কোন উৎসবের দিন !ধর্মীয় বা জাতীয় উৎসব!! না , তাতো নয়! এবার ভ্রু কুচঁকে একটু লক্ষ্য করতেই দেখি লাল সবুজ বাতি দিয়ে তৈরি বিশাল বিশাল নৌকা ।এতক্ষণে সারা ঢাকা শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে মহাসড়কে আলোকসজ্জবার রহস্য উন্মোচিত হল। লাল সবুজ বাতি দেখতে দেখতে বাসে উঠলাম । বাস আর এগোচ্ছে না।যাত্রীদের সব রাগ গিয়ে পড়ছে ড্রাইভারের উপর। অনেকেই আবার রাগের বহিপ্রকাশ ঘটাতে ড্রাইভারের সাথে নতুন আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তোলার নিমিত্তে বিভিন্ন মন্তব্য করে যাচ্ছেন। বেচারা ড্রাইভার মুখবুজে সবার কথাই শুনে যাচ্ছেন।মিনিট তিরিশেক পর বাসের চাকা ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগোতে শুরু করল।একটা কথা বলে রাখি , ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম ব্যক্তিগতভাবে খুব বেশি পীড়া দেয় না।কারণ জ্যামের সুযোগে আমি খানিকটা সময় ঘুমিয়ে নেই।কিন্তু আজকে বাসে আমার সহযাত্রীরা কেন জানি একটু বেশি উত্তেজিত। তাদের খিস্তিখেউরিতে ঘুমাতে পারলাম না। অগত্যা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আলোঝলমলে লাল সবুজ মরিচ বাতিতে সজ্জিত ঢাকা শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। হঠাৎ জ্যাম কমতে শুরু করল। বাসের গতি বাড়তে শুরু করল। সাথে দৌড়তে শুরু করল রাস্তার পাশে বিশাল বিশাল শেখ হাসিনা ছবি সম্বলিত বিলবোর্ডগুওলো। আমার আবার অভ্যাস হল যেকোন রাজনৈতিক পোষ্টার , বিলবোর্ড , ব্যানার খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করা! অদ্ভুত একটা বিষয় চোখে লাগল! আওয়ামী লীগের কাউন্সিলকে সামনে রেখে যে শত শত বিলবোর্ড দিয়ে রাস্তার ফুটপাতের পাশের অংশ ছেয়ে ফেলা হয়েছে তাতে শেখ হাসিনার পরেই যার ছবি সবচেয়ে শোভা পাচ্ছে তা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ে’র ।ছবিগুলোর বেশিরভাগেই আবার সন্তানের প্রতি মাথায় হাত বুলিয়ে অফুরন্ত স্নেহমমতা প্রদর্শনের চিত্র। বেশ ভালোই ধন্দে পড়ে গেলাম! নিজের অজান্তেই মনের ভিতর থেকে একটি প্রশ্ন উগড়ে আসছে ! আচ্ছা এটা কি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল ! না , মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে দেয়া সংবর্ধনা উৎসব ! চারিদিকে শুধু মা ও ছেলের হাস্যেজ্জবল ঢাউস সাইজের বিলবোর্ড ! স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়লাম দেখি সেখানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামোতে আকাশ পাতাল এক করে ফেলা কোন অবদান শেখ হাসিনা তনয় সজীব ওয়াজেদ জয়ের আছে কিনা ! যা আমার স্মৃতিবিচ্যুত হয়েছে ! না,সজীব ওয়াজেদ জয়ের সেরকম কোন রাজনৈতিক অবদান পেলাম না ! রাজনৈতিক অবদানতো ভালো অন্যকোন অবদানই খুঁজে পেলাম না ! বরং স্মৃতিকক্ষ থেকে কয়েকমাস আগের একটা তথ্য সরব্রাহ করল যার দায় কিছুটা হলেও সজীব ওয়াজেদ জয়ের রয়েছে।সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি সিকিউরিটি দুর্বলতার সুযোগে হাজার কোটি টাকা নিমিষের মধ্যে লুট হয়ে যাওয়া।মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে কিছুটা দায় নিশ্চয়ই তাঁর উপরও বর্তায়! বিটিআরসি’র দৈনিক কোটি কোটি ডিলিটের কথা না হয় উল্লেখই করলাম না!স্মৃতির গোপন কক্ষ আবার বন্ধ করে দিয়ে বাস্তবে ফিরে আসলাম! প্রশ্নটা আবার এসে বিরক্ত শুরু করল ! সজীব ওয়াজেদ জয়ের অবদানটা কি ! যারজন্যে বঙ্গবন্ধু’র ছবিকে ছাপিয়ে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলকে সামনে রেখে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবিসম্বলিত বিলবোর্ড লাগানোর হিরিক পড়ে গেছে! অন্য জাতীয় নেতাদের কথা না হয় বাদ দিলাম!হঠাৎ মোবাইলের স্ক্রীনে সময়ের দিকে তাকিয়ে আৎকে উঠলাম ! এই যা ! আজো তাহলে ‘’সুলতান সুলেমান ‘’দেখতে পারব না! এখন আমার ট্রাফিক জ্যামের প্রতি বিরক্ত লাগল! সুলতান সুলেমানের কথা মনে আসতেই হঠাৎ আমি দীর্ঘক্ষণ ধরে সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নের উত্তর জলের মত পরিস্কার হয়ে গেল!মনে হল আরে তাইতো ! সুলতান সুলেমান পুত্র শাহজাদা মোস্তফা’র অভিষেক অনুষ্ঠানতো ঠিক এরকমই জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছিল। অবশেষে মাথার মধ্যে লুক্কায়িত চিনচিনে ব্যথা কমতে শুরু হল !বাস এসে আমার গন্তব্যে থামল। মনে মনে ভাবলাম।
যাক বাবা , বাঁচা গেল ! এটা তাহলে সজীব ওয়জেদ জয়ের অভিষেক কাউন্সিল ! ঠিকই আছে ,যুবরাজের অভিষেকে আলোকসজ্জা হবে না তো ঘুটে কুড়ানোর ছেলের মুসলমানিতে আলোকসজ্জা হবে ! এই যা ! মনের মধ্যে কু ডাক ডাকছে ! নিজের অজান্তেই যেন মস্কিস্কের নিউরণ সেলে বেজে চলেছে ''মোর সকল আলো কেড়ে অন্ধ করে, তব যাত্রা শুরু তোমার''
জয়তু যুবরাজ !!!
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



