
এমন আকাশ কালো করা ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির দিনে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে, আবার আমার রোকেয়া হলের এক্সটেনশন- ২৩ এর জীবনে। এমন চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসা আষাঢ়ের দিনগুলি তে আমি আমার ছোট্ট বিছানায় পাতলা কাঁথামুরি দিয়ে চারাপশে পছন্দের বই আর ক্যাসেটে কবিতা শোনার মহার্ঘ্য সময়ে ফিরে যাই। একটা রুমে সিনিয়র জুনিয়র মিলে চারজনের স্বপ্ন, সংঘর্ষ, আনন্দ বেদনা ভাগাভাগি করে থাকার টুপ করে চলে যাওয়া দিনের রেশ ফিরে পাই।
আকাশ উজাড় করে ঝরা এমন দিনে খুব ভোরে রুমের সামনে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে বকুল ফুল কুড়াতাম, প্রায়ই ফুল নিতে আসত মেইনবিল্ডিং থেকে একজন সিনিয়র আপু। এ সময়ে আগের মত মিষ্টি সুবাস দেয়া সেই বাদল ফুল হাতে নিতে ইচ্ছে হয়। জানালার সামনে পড়ার ডেস্কে বসে উদাস নয়নে মানিপ্ল্যান্টের পাতার ফাঁকে বৃষ্টি দেখার সুখ।
চারিদিক ভেঙে মেঘ করা এমন দিনে আমি আমার রোকেয়া হলের প্রাঙ্গণ কে মিস করি, হুট করে আকাশ ভাঙায় সব কাজ ফেলে ঝুমঝুম বর্ষায় ভিজে একদল কৈশোরে ফিরে যাওয়া স্বপ্ন ছুঁতে চাওয়া তরুণ প্রাণ। বন্ধু সহপাঠী হলের বড় অথবা প্রাণের টানে মেলা ছোট বোনদের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা কে মিস করি। মনে আছে সেদিন রুমেই ছিলাম বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার সাথে চলে এলাম আমাদের ভবনের সামনে। প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হল আর চারিদিক থেকে নেমে পরলাম আমরা কয়েক জন কতক্ষণ ভিজেছিলাম মনে নেই। ইয়াসমিন আপা আমার রুম মেট আমি সবাই খেলা শুরু করলাম। এরমাঝে বাইরে থেকে সবজি নিয়ে এক রিকশা এলো, ফিরে যাবার সময় রিকশাওয়ালে কে শেডের নিরাপদ দূরত্বে পাঠিয়ে বহ্নি শুরু করলো আমাদের কয়েকজন কে নিয়ে রিকশা চালানো। সে এক অপার্থিব আনন্দ স্মৃতি।
মেঘলা দুপুরে সন্ধ্যা নেমে আসা, এমন সব বাদল বর্ষানো দিনে আমার রোকেয়া হলে বন্ধুদের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। আমার রুমের মুসুর ডাল দোলার রুম থেকে আলু কনার রান্না খিচুড়ি সাথে ডিম ভুনা আর আলু পেয়াজের মচমচে ভাজা। এরপর সবাই মিলে ভাগভাগি করে খাওয়া। এমন একটা জনম কোন যে যাদুর কাঁঠিতে আবার ফিরে পাই!!!
রুদ্ধদ্বার আষাঢ়ের এমন বিষণ্ণ বিকেলে রোকেয়া হলের ক্যান্টিনে মন চলে যায়। যেখানে না ফুরানো গল্পের ঝাঁপি রাখা থাকে। সেই ডালপুরি, পেঁয়াজের সমুচা, ডিমচপ আর চা সাথে কলতান। বিষণ্ণতার যেথায় প্রবেশ নিষেধ। কখনো বা শেষ বিকেলের ভেজা আলোয় মেইন বিল্ডিং এর খোলা চত্বরে বসে তুমুল বাতাসের আদর নেয়া চোখ নাক মুখে। চুপচাপ একাকী হবার আহ্লাদী অবসর সেখানে নেই, হয়ত মগ্নতায় ডুবে যাবার আগেই অনার্স বিল্ডিং থেকে নদী এসে পিছন থেকে জড়িয়ে নিবে। নয়ত দূর থেকে ছোট নদী জানতে চাইবে ডাকসু রিহারসেলের খবর নয়ত কোন রুমমেটের ডাক।
নিজেকে নিঃস্ব করে ঝরা, গুরুম ডাকা এই আঁধার কালো রাত্তিরে আমার রোকেয়া হলে প্রথম ভেজার রাত্রি টা মনে পরে। ক্ষমা, শায়লা, লিপি, তানিয়া সবাই মিলে মাঝ রাতে হলের মাঠে প্রচণ্ড ভিজেছিলাম অন্ধকারে। চারিদিকে সুনসান, মেঘের গর্জন আর আমাদের আনন্দ চিৎকার ছাড়া কিছুই ছিল না। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করা একজন বড়আপুর কঠিন ঝারি খেয়ে রুমে ফিরেছিলাম। এরপর সবাই মিলে এক ঝর্নার নীচে সিনান। সেসব ছিল অন্য জীবনের গল্প মনে হয় এখন।
আহা আনন্দ জীবন, একদুই জমেজমে মস্ত সুখের জীবন আমার " বেগম রোকেয়া হল " এ জমা রেখে আসা বর্ষার জীবন!!
বর্ষার গর্জন
সর্বসত্ত্বঃ @মন সায়র
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুলাই, ২০২১ দুপুর ১২:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




