somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মাহদী হাসান শিহাব
লেখক। "শিহাবের নিউজলেটার"-এ আমার লেখা পাবেন — বই রিভিউ, ব্যক্তিগত উন্নয়ন, চিন্তাশীল প্রবন্ধ ও বিভিন্ন চলতি আলাপ নিয়ে। লিংক: https://mhshihab.substack.com/

মানবজমিন, পার্থিব, চক্র: শীর্ষেন্দুকে যেমন পড়লাম

২৫ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লেখা শুরু করেন সাধারণত খুব অদ্ভুতভাবে।

যেমন তিনি চক্র উপন্যাস শুরু করেছেন একটি সাপের দৃষ্টিকোণ থেকে। হঠাৎ পড়ে বোঝা যায় না তিনি কার কথা বলছেন, কী বলছেন। সাপ চলতে থাকে, আর উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রের সাথে তার দেখা হয়।

পড়তে পড়তে যত আগানো যায়, তত স্পষ্ট হতে থাকে।

শীর্ষেন্দুর পার্থিব, চক্র ও মানবজমিন এই তিন উপন্যাস পড়লাম পরপর। এটা ছিলো দীর্ঘ যাত্রা। অনেকদিন লাগলো পড়তে।

কিন্তু পড়ে যে শান্তি পেয়েছি, তা অপরিমেয়।

মানবজমিন পড়ার পর রিক্যাপ লিখেছিলাম। পার্থিব বড় উপন্যাস। সেটার আর রিক্যাপ বা রিভিউ কিছুই লেখি নাই।

সর্বশেষ পড়লাম চক্র।

এই তিন উপন্যাসই বড় কলেবরের উপন্যাস। অসংখ্য চরিত্র।

চরিত্রগুলোকে লেখক আস্তে আস্তে এনেছেন, তারপর বিশদ বর্ণনার দিকে গিয়েছেন।

এধরণের উপন্যাস পড়লে অবাক লাগে, এতগুলো চরিত্র, এতগুলো ঘটনার পরম্পরা লেখকরা মনে রাখেন কীভাবে!!

আমরা পাঠক হিসেবে তো শুধু পড়ে যাই। আমাদেরই মনে থাকে না প্রত্যেকটা ঘটনার পরম্পরা। অথচ লেখক সাত নম্বর চ্যাপ্টারের পরের কাহিনী লিখতে থাকেন সাইত্রিশ নম্বর চ্যাপ্টারে।

জানি, এটা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। এই কঠিণকে বড় লেখকেরা ধারণ করেন। এগুলো চরম অধ্যাবসায়, ধৈর্য্য আর মেধার নজির।

এত বড় বড় উপন্যাস লেখার ধৈর্য্য কি সবার থাকে!

.

তার এই তিন উপন্যাসই মানুষের সমাজ-সামাজিকতা, তাদের দৈনন্দিন জীবন যাপন, তাদের আনন্দ-দুঃখ, লোভ-লালসা, হাসি-কান্না, প্রেম-ভালোবাসার উপাখ্যান।

কী চমৎকার বর্ণনা।

চক্র উপন্যাসের কাহিনী যখন শুরু হয়, তার আগেই এই উপন্যাসের চরিত্র গৌরহরি মারা গেছেন। বেঁচে আছেন তার বিধবা স্ত্রী বলাকা।

বলাকার জবানে তাদের দাম্পত্যের যে মধুর বর্ণনা বর্ণিত হয় তা পাঠক হৃদয় মথিত করে।

একই উপন্যাসে আরেক ভালোবাসার বর্ণনা আছে অমল রায় আর পারুলের।

অমল রায় বিরাট মেধাবী ছাত্র। গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করা ব্যক্তি। আর পারুল ডাকসাইটে সুন্দরী। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে।

পারুলের সাথে এক দুপুরে ঘটা দূর্ঘটনায় তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়। সম্পর্কের এই ছিন্নতা অমলকে যা ভোগায় তা বইয়ের একটা বড় অংশজুড়ে পাওয়া যায়।

ওদিকে রসিক বাঙাল আছে আরেক চরিত্র। বাঙাল মানুষ ওপারে যেয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন তার সম্পদ ঠেকাতে। অনেক দিলদরিয়া, ফুরফুরে হাসিখুশি আর সব কিছুকে থোড়াই কেয়ার করা মানুষ। রসিক বাঙাল আর তার দ্বিতীয় বউ বাসন্তীর সম্পর্কও মনে রাখার মত।

আর আছে ধীরেন খুড়ো। সারাজীবন গরীব আর টানাটানির সংসারে জীবন যাপন। অল্পে তুষ্ট, অত্যন্ত কৌতুহলী এই আশি বছরের বৃদ্ধকে খুবই ভালো লাগে। তার নির্ঝঞ্জাট জীবন যাপন দেখে শান্তি লাগে।

তার কোন অসন্তোষ নেই, নেই কোন হাহাকার, দুঃখ বা ইগো।

একটু বসে গল্প, চারটে ভালো খাওয়া দাওয়াই তার জীবনকে আনন্দে ভরে রাখে।

.

পার্থিব উপন্যাসে ছিলো বিষ্ণুপদ নামে এক বৃদ্ধ চরিত্র। তার বউ নয়নতারা। তারা জীবনের পড়ন্ত বেলায় দিন ফুরানোর অপেক্ষায় আছেন।

এই বিষ্ণুপদ ও তার বউয়ের যে কথোপকথন, তাদের মধ্যে সম্পর্কের যে রসায়ন তা পড়লে মনে শান্তি হয়।

উপন্যাসে এত চরিত্র, দৈনন্দিন জীবনের এত মনস্তাত্ত্বিক বর্ণনা, কোথাও না কোথাও নিজের সাথে বা পরিচিত জীবনের সাথে সহজেই রিলেট করতে পারা যায়।

জীবনকে দেখা যায় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে।

মানুষের মনের এত ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ পড়ে ক্ষণে ক্ষণে মুগ্ধ হতে হয়।

.

শীর্ষেন্দু প্রায়ই একটা সহজ কথা লিখেছেন, বিশেষত পার্থিব ও চক্র উপন্যাসে।

তা হলো- "তারা দুজন খুব হাসলো" "দুলে দুলে খুব হাসলো"।

এই সহজ কথাটি পড়তে এত ভালো লেগেছে তা বলার মত না! এই বাক্যটার প্লেসমেন্ট হয়েছে সুপার পারফেক্ট।

.

এর আগে শীর্ষেন্দুর দূরবীন পড়েছিলাম। এবার পড়লাম এই তিনটি। শীর্ষেন্দুকে পড়ে আরাম পেলাম।

আবার যখন ফিকশন পড়বো, তখন আবার শীর্ষেন্দুকে পড়া যায় কিনা দেখবো।

.

পরিশিষ্ট: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এখনো বেঁচে আছেন। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে তার জন্ম ২ নভেম্বর ১৯৩৫ বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায়। জন্মের সময় তার পিতা চাকরিসূত্রে ময়মনসিংহ ছিলেন। তার পৈত্রিক বাড়ি বিক্রমপুর তথা মুন্সিগঞ্জে। ভারত বিভাজনের সময় তারা কলকাতায় চলে যান।

।

লেখাটি আমার নিউজলেটারে আগেই প্রকাশিত।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:০৯
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধকারের রসায়নবিদ

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


লেখকের নোট:
এই গল্পের পটভূমি ১৯৭৭ সালের ঢাকায় সংঘটিত জাপান এয়ারলাইন্সের বিমান ছিনতাইয়ের ঐতিহাসিক ঘটনাকে অবলম্বন করে নির্মিত। ঐতিহাসিক ব্যক্তি, স্থান ও ঘটনার পাশাপাশি প্রফেসর রেহান আশরাফ, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানেনা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪২


কেউ জানেনা
আমার একটা জগৎ আছে,
খুব গহীনে, সংগোপনে,
বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা
একটা জগৎ....
নিজের জগৎ, নিজের মত
আমার একটা জগৎ লাগে।

রোজ বিকেলে কাজের পরে
একটু যখন অবসরে,
একটু সময় চায়ের কাপে
নিজের মত, নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমান মুক্তাদীরের জুলাই আন্দোলন: কারণটা কি একান্ত ব্যক্তিগত ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০১


সালমান মুক্তাদীর বাংলাদেশের কনটেন্ট ক্রিয়েশন জগতের পথিকৃৎ। তার হাত ধরে এদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে কত তরুণ, তার কোনো হিসাব নেই। তার ভক্তের সংখ্যা অগণিত। তবে কাজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে পর্ণ এটাকের জনককে পাওয়া গিয়েছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৮



ব্লগার চারাগাছ সামুতে মডারেটর নেই বলে সন্দেহ করছেন। নিজের ধারণা পাকাপোক্ত করতে সামুতে পর্ণ এটাকের প্ল্যান করছেন। ইহা কি ব্লগার?

সামুতে পর্ণ এটাকের কারণে পর্ণ সাইটের ধুয়া তুলে বিগত সরকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×