somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

আমিই সাইফুল
আমি একজন ইউরোপ প্রবাসী, জীবনের ঝড়-ঝাপটায় পাক খেয়ে গড়ে ওঠা আজকের এই আমি। ব্লগে তুলে ধরি মনের গভীরে লুকানো আবেগের রং, যা সোশ্যাল মিডিয়ার চটকদার আলোয় মেলে না। আমি অনুভূতির এক ফেরিওয়ালা, শব্দে বুনে যাই জীবনের অলিখিত গল্প…

গলির মোড়ে অপেক্ষা - পর্ব দুই

২৭ শে মার্চ, ২০২৫ বিকাল ৪:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সেদিনের পর থেকে আমার মনটা একটু বেশিই অস্থির হয়ে উঠেছে। তানিয়ার সেই হাসি, সেই ছোট্ট “হ্যাঁ, তাই তো” কথাটা আমার মাথায় ঘুরছে। অফিসে বসে কাজ করতে গেলেও মনটা বারবার গলির মোড়ে চলে যায়। আমি ভাবি, এই মেয়েটার সাথে কথা বলার জন্য আমার এত আগ্রহ কেন? এত মেয়ে আছে দুনিয়ায়, কিন্তু তানিয়ার কাছে এলেই আমার ভেতরটা কেমন যেন দোলা দেয়।
পরের দিন সকালে আমি আবার জানালা দিয়ে তাকালাম। তানিয়াকে দেখার একটা আশা ছিল, কিন্তু সে ছিল না। বিল্ডিংয়ের নিচে শুধু কাদের মিয়া দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা পান। আমি একটু হতাশ হয়ে অফিসের জন্য তৈরি হলাম। কিন্তু মনের কোণে একটা পরিকল্পনা ঘুরছিল। আজ যদি তানিয়ার সাথে দেখা হয়, তাহলে কিছু একটা বলতেই হবে। শুধু “গরম পড়েছে” বলে থেমে থাকলে তো চলবে না।
অফিস থেকে ফিরে এসে দেখি, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আব্দুল চাচার দোকানে গিয়ে আবার পাউরুটি আর কলা কিনলাম। চাচা হেসে বললেন, “রিয়াদ, তুই কি পাউরুটির দোকান খুলবি নাকি? প্রতিদিন এই একই জিনিস!” আমি হেসে বললাম, “চাচা, এটাই আমার বেঁচে থাকার রসদ।” চাচা একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, “তোর কাজের মেয়ে এখনো আসে নাই?” আমি মাথা নেড়ে বললাম, “না, চাচা। বোধহয় এবার গ্রামেই থেকে যাবে।”
চাচার সাথে কথা বলতে বলতে আমি বিল্ডিংয়ের দিকে তাকালাম। হঠাৎ দেখি, তানিয়া গেট দিয়ে বের হচ্ছে। তার পরনে একটা নীল সালোয়ার কামিজ, আর হাতে একটা ছোট পার্স। আমার বুকের ভেতরটা আবার লাফাতে শুরু করলো। আমি তাড়াতাড়ি চাচাকে বললাম, “চাচা, টাকাটা পরে দিচ্ছি।” চাচা হেসে বললেন, “যা, দেখি কী করতে পারিস।”
আমি দ্রুত পায়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেলাম। তানিয়া রাস্তা পার হচ্ছে। আমি একটু দ্বিধা করলাম, তারপর সাহস করে ডাকলাম, “তানিয়া!” সে থমকে দাঁড়ালো। পেছন ফিরে আমার দিকে তাকালো। আমি কাছে গিয়ে বললাম, “আপনি কি এখন বের হচ্ছেন?” সে একটু অবাক হয়ে বলল, “হ্যাঁ, একটু বাজারে যাবো।” আমি বললাম, “ওহ, আচ্ছা। আমিও আসলে…” আমার কথা শেষ হলো না। কী বলবো, বুঝতে পারছিলাম না।
তানিয়া একটু হেসে বলল, “আপনিও বাজারে যাবেন?” আমি তাড়াতাড়ি বললাম, “না, মানে, আমি আসলে বাসায় যাচ্ছিলাম। কিন্তু দেখলাম আপনি বের হচ্ছেন, তাই ভাবলাম…” আমার কথা আটকে গেল। তানিয়া বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি তাহলে যাই।” আমি মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ, যান।”
সে চলে গেল। আমি নিজের উপর রাগ করলাম। এত সুযোগ পেয়েও কিছু বলতে পারলাম না! কিন্তু তার হাসিটা আবার আমার মনে গেঁথে গেল। আমি বাসায় ফিরে এলাম। রাতে পাউরুটি আর কলা খেতে খেতে ভাবলাম, পরের বার আর এমন হবে না। আমি কিছু একটা করবো।

পরদিন সকালে আমি একটু তাড়াতাড়ি বের হলাম। আব্দুল চাচার দোকানে গিয়ে বললাম, “চাচা, আজ এক কাপ চা দেন।” চাচা চা বানাতে বানাতে বললেন, “কী রে, আজ পাউরুটি নিবি না?” আমি হেসে বললাম, “না চাচা, আজ একটু চা খাবো।” চা হাতে নিয়ে আমি দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। হঠাৎ দেখি, তানিয়া বিল্ডিং থেকে বের হচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলাম।
“তানিয়া!” আমি আবার ডাকলাম। সে আমার দিকে তাকালো। আমি বললাম, “আপনি কি প্রতিদিন এই সময় বের হন?” সে একটু ভেবে বলল, “না, সবসময় না। আজ একটু তাড়াতাড়ি বের হলাম।” আমি বললাম, “ওহ, আচ্ছা। আমি আসলে ভাবছিলাম…” আমার কথা আবার আটকে গেল। তানিয়া বলল, “কী ভাবছিলেন?” আমি সাহস করে বললাম, “আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই।”
তানিয়া একটু অবাক হয়ে বলল, “কথা? কী নিয়ে?” আমি বললাম, “আসলে কিছু না। শুধু ভাবলাম, আমরা তো একই বিল্ডিংয়ে থাকি, তাই একটু পরিচয় হলে মন্দ হয় না।” সে হেসে বলল, “ঠিক আছে। আমার নাম তো আপনি জানেন। আপনার নাম কী?” আমি বললাম, “আমি রিয়াদ।” সে বলল, “আচ্ছা, রিয়াদ। ভালো লাগলো আপনার সাথে কথা বলে। আমি এখন যাই।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “ঠিক আছে।” সে চলে গেল। আমি চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে মনে ভাবলাম, এটাই একটা শুরু। অন্তত নামটা তো বলতে পারলাম।

কয়েকদিন পর আমি বিল্ডিংয়ের লিফটে তানিয়ার সাথে দেখা করলাম। আমি লিফটে ঢুকতেই সে হেসে বলল, “আবার দেখা হয়ে গেল।” আমি বললাম, “হ্যাঁ, মনে হয় আমাদের দেখা হওয়াটা নিয়তি।” সে হেসে বলল, “নিয়তি? বেশি বেশি বলছেন না তো?” আমি হেসে বললাম, “না, না। শুধু মজা করলাম। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?” সে বলল, “আমি এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছি। আপনি?” আমি বললাম, “আমি বাসায় ফিরছি।”
লিফটটা থামলো। আমরা দুজনেই বের হলাম। আমি বললাম, “আপনার বান্ধবীর বাসায় যাওয়া হয়ে গেলে একটু চা খেতে পারেন। আব্দুল চাচার দোকানে ভালো চা পাওয়া যায়।” সে হেসে বলল, “দেখি, সময় হলে যাবো।” আমি বললাম, “ঠিক আছে। আমি অপেক্ষা করবো।”
সে চলে গেল। আমি বাসায় ফিরে এলাম। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবলাম, তানিয়ার সাথে কথা বলার এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো আমার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমি জানি না এটা কোথায় গিয়ে শেষ হবে। কিন্তু এই অপেক্ষাটা, এই গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা আমার জন্য একটা আনন্দ।
পরের দিন আমি আব্দুল চাচার দোকানে গিয়ে বসলাম। চা হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। হয়তো তানিয়া আসবে। হয়তো না। কিন্তু আমি জানি, এই অপেক্ষার মধ্যেই আমার মনের একটা শান্তি আছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মার্চ, ২০২৫ বিকাল ৫:১৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রিয় কন্যা আমার- ৯১

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:৩৯

প্রিয় কন্যা আমার, আজ ইদের দিন!
একমাস ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা সিয়াম সাধনা করেছে। রমজান মাস মূলত সংযমের মাস। ফাজ্জা কাউকে আমি দেখিনি সংযম করতে। রমজান মাসে সবাই বিলাসিতা করেছে। খাওয়া দাওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ ও আগামী

লিখেছেন আবু সিদ, ২৩ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:১৫

অন্যের হাতে নিজেকে সমর্পণ করো না, মানুষ !
অন্যের হাতের শিল্প হয়ো না।
অন্যের চোখে বিশ্ব দেখ না,
অন্যের সুর-নৃত্যে আর দুলো না।
নিজেকে খুঁজে নাও তুমি!
বুঝে নাও নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি সত্যিই দেখি, নাকি যা বিশ্বাস করি কেবল সেটাই দেখি ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৩ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:২৯


গাজীপুরের কালিয়াকৈরে কমলা বেগম ঈদের সকালে গোরুর মাংস রান্না করতে বসেছিলেন। গতবছর কোরবানির ঈদে মানুষের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা মাংস, মাসের পর মাস পাশের বাড়ির ফ্রিজে থাকা, এখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডার্ক ওয়েব সংবাদ : অনুসন্ধানী রিপোর্ট

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৪ শে মার্চ, ২০২৬ ভোর ৫:১২

ডার্ক ওয়েব সংবাদ : অনুসন্ধানী রিপোর্ট এর সত্যতা কতটুকু ?
সাধারণ মানুষ জানতে চায় !




বাংলাদেশ কি বিক্রি হচ্ছে ডা*র্ক ওয়েবে ?
Redlineinvestigation নামে ডা*র্ক ওয়েবের কেবল ফাইলে চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট ফাঁস... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান বনাম ইজরাইল আমেরিকা যুদ্ধ; কার কি লাভ?

লিখেছেন খাঁজা বাবা, ২৪ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:১৮



২০০৬ থেকে আহমাদিনেজাদ ইজরাইলকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার হুমকি দিয়ে আসছে, আমেরিকা ২০০২ থেকে ইরানে হামলার প্ল্যান করছে, নেতানিয়াহু ৪০ বছর ধরে স্বপ্ন দেখছেন ইরানে হামলা করার। তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×