somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

আমিই সাইফুল
আমি একজন ইউরোপ প্রবাসী, জীবনের ঝড়-ঝাপটায় পাক খেয়ে গড়ে ওঠা আজকের এই আমি। ব্লগে তুলে ধরি মনের গভীরে লুকানো আবেগের রং, যা সোশ্যাল মিডিয়ার চটকদার আলোয় মেলে না। আমি অনুভূতির এক ফেরিওয়ালা, শব্দে বুনে যাই জীবনের অলিখিত গল্প…

রাফির অন্তিম যাত্রা

২৮ শে মার্চ, ২০২৫ রাত ১১:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শীতের কনকনে রাত। ঢাকার মিরপুর স্টেশনের কাছে শিরীষ গাছের ঘন ছায়ায় রাফি তার জীর্ণ রিকশার হ্যান্ডেলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাত দুটোর ট্রেন স্টেশন ছেড়ে চলে গেছে, পিছনের লাল আলোটা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। যাত্রীরা সিঁড়ি দিয়ে নামছে, শীতের তীব্র ঠান্ডায় তাদের মুখ বিবর্ণ। অন্য রিকশাওয়ালারা ভিড় করলেও রাফি সেখানে গেল না। তার রুগ্ন শরীর, কাশির শব্দ যাত্রীদের ভয় পাইয়ে দেবে, সে জানে। তাই সে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল, ছেঁড়া গামছায় কান ঢেকে, শীর্ণ হাত আস্তিনে লুকিয়ে। রুক্ষ কিন্তু বিনীত কণ্ঠে ডাকল, “আসেন স্যার, আসেন। এই দাস হাজির।”


কাশির ধমকটা চাপতে পারল না। এক যুবকের মুখে কেশে ফেলল। যুবকটা সরে গেল, অন্যরাও দূরে দাঁড়িয়ে রিকশা ডাকল। স্টেশন খালি হয়ে গেল। রাফি ভাবল, এখানে দাঁড়িয়ে লাভ নেই। তার শরীর আর চোখ দেখলে যাত্রীরা অস্বস্তি পাবে। সে অন্ধকারে নেমে দাঁড়াল, কথা বলার চেষ্টা করল না। মনে মনে বলল, “নসিবে থাকলে জুটবে।” তার মৃতপ্রায় চোখ শীতের অন্ধকারে উজ্জ্বল করার চেষ্টা করল।


শিরীষ গাছের নিচে সে কাঁপছিল। শীত তার শরীরে শিশিরের মতো জমে যাচ্ছিল। “একটা সোয়ারী পেলে রিকশা টানলে শরীর গরম হবে,” সে ভাবল। কিন্তু কেউ এল না। দূরে গুলশানের গির্জার ঘণ্টা বাজল, কবরখানার ঝোপে জোনাকি জ্বলছিল। হঠাৎ এক নিঃসঙ্গ যাত্রীকে রিকশা খুঁজতে দেখে সে ডাকল, “আসেন স্যার, আসেন। এই দাস হাজির।” তবু অন্ধকার থেকে নড়ল না। তার শরীর দেখে যদি লোকটা ভয় পায়!

যাত্রীটি এগিয়ে এল। বৃদ্ধ, কোটরাগত চোখ, দামি শালে জড়ানো, পা খোঁড়া, হাতে লাঠি। রাফির মনে হল, এই লোকটাকে সে চেনে। বৃদ্ধ লাঠি ঘুরিয়ে রিকশায় উঠে বললেন, “কত লাগবে?”
“একশ টাকা, স্যার,” রাফি বলল।
“৫০ টাকা দেব,” বৃদ্ধ জবাব দিলেন।
রাফি চুপ রইল, শুধু কাশতে থাকল।
রিকশা চলতে শুরু করল। মিরপুরের নির্জন রাস্তায় রিকশার ক্যাচক্যাচ শব্দ আর কাশির আওয়াজ ছাড়া কিছু শোনা যাচ্ছিল না। বৃদ্ধ বললেন, “তোর নাম কী?”
“রাফি, স্যার।”
“কতদিন রিকশা টানছ?”
“বহু দিন।”

পথে চেন পড়ে গেল। রাফি নেমে তুলল। বৃদ্ধ বিরক্ত হয়ে বললেন, “জলদি চালাও।”
“ভয় পাবেন না, ঠিক পৌঁছে দেব,” রাফি বলল। তার শরীর কাঁপছিল, হাত-পা ঠকঠক করছিল। তবু টানতে লাগল।
তানিয়ার কথা মনে পড়ল। বনানীর বস্তিতে তার বউ অপেক্ষা করে। গতকাল তানিয়া বলেছিল, “একটা শাড়ি কিনে দাও। শীতে কষ্ট হয়।” রাফি ভেবেছিল, আজ সোয়ারী পেলে শাড়ি কিনবে, গরম ভাতে ইলিশ মাছ খাবে। কিন্তু তার শরীরে শক্তি নেই।

বৃদ্ধ বললেন, “গাড়ি চালাচ্ছ নাকি ঘুমাচ্ছ??”
রাফি শেষ শক্তি দিয়ে টানল। “দুনিয়া বদলে গেছে, স্যার। আগে আমরা গরিবরা কষ্ট করতাম, এখনও করি।”
“তোমাদেরই তো রাজত্ব,” বৃদ্ধ হাসলেন।
ধানমন্ডির কাছে টায়ার ফুটল। রাফি নেমে দেখল, আর টানা যাবে না। বৃদ্ধ চিৎকার করলেন, “এমন করলে পয়সা দেব না!”
“একটু সবুর করেন, একটা গল্প বলি,” রাফি বলল।
“কী গল্প?”

“আমার নানা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ’৭১-এ যশোরের মাঠে লড়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনারা ধরে ফেলল, কিন্তু তিনি পালালেন। তারপর থেকে আমাদের নসিব খারাপ।”
বৃদ্ধ শুনলেন, কিন্তু মন দিলেন না। পকেট থেকে ৫০ টাকা দিয়ে বললেন, “নাও, চলি।” রাফি হাতে নিল, কিন্তু শরীর আর চলছিল না। হ্যান্ডেলে ঝুঁকে পড়ল। শীত তার শরীরে জমে যাচ্ছিল। চোখ সাদা হয়ে এল। তানিয়ার কথা ভাবল—তার শাড়ি, ইলিশ মাছ। কাশতে কাশতে মুখে রক্ত উঠল। সে গামছা দিয়ে মুছতে চাইল, কিন্তু হাত তুলতে পারল না। শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল।

বৃদ্ধ নেমে লাঠি ঠুকে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন, ভুলে একশ টাকা দিয়েছিলেন। আলো জ্বেলে দেখলেন, রাফি হ্যান্ডেলে ঝুলে আছে, শীতে জমে মৃত। টাকা তুলে নিয়ে অন্ধকারে মিশে গেলেন। দূরে যশোর রোডের শেষ ট্রেনের শব্দ মিলিয়ে গেল।

বনানীতে তানিয়া অপেক্ষা করছিল। রাত গভীর হল, রাফি ফিরল না। ভোরে খবর এল, রাফি রাস্তায় মারা গেছে। তানিয়া কাঁদল, তার শাড়ি আর ইলিশ মাছের স্বপ্ন অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সী পার্ল এবং চারপাশ

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৪


খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গল। সূর্য তখনও জাগেনি। ব্যালকুনিতে গিয়ে বসলাম কিছুক্ষন। সামনে সাগর আপনমনে ঢেউ তুলে নাচছে। একজন মানুষও নাই সাগরপাড়ে। এমন নিরিবিলি সাগরপাড়ই চেয়েছিলাম। যেখানে পুরোটাই আমার থাকবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইরফান আল-হোসাইনীর রহস্যজনক মৃত্যু - জীবনের চেয়ে কোনো সম্পর্ক বড় নয়

লিখেছেন এমএলজি, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪০

= ড. ইরফান আল-হোসাইনীর রহস্যজনক মৃত্যু - জীবনের চেয়ে কোনো সম্পর্ক বড় নয় =

বিশ্বখ্যাত আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি এনভিডিয়া (NVIDIA)-তে কর্মরত, বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং অত্যন্ত সম্ভাবনাময় তরুণ বিজ্ঞানী ড.... ...বাকিটুকু পড়ুন

জলসার আসর

লিখেছেন নিচু তলাৱ উকিল, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:১০

রঙ্গিন শহররের বুকে তাম্বু টাঙিয়ে বসিয়েছি জলসার আসর।
ধর্মীয় বয়ানের ফাঁকে;
গলির মাথায় বেজে উঠছে উলুধ্বনি।
এদিকে তুমি আর আমি ডুবে আছি কলকির ধোঁয়ায়।
নোনতা ঘামের ব্যবচ্ছেদে পুটিমাছের বুক চিরে মেখে দিয়েছি পাঁচ প্রহরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ শেষ জীবনে

লিখেছেন সামিয়া, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৯



ঘুমিয়ে থাকা একজন মানুষ কখনো কখনো জেগে থাকা একজন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ভালো থাকতে পারে? কথাটা শুনতে অদ্ভুত। কিন্তু বয়স হলে মানুষ অনেক অদ্ভুত কথাই বিশ্বাস করে চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্রপতি পদে আনভীর সোবহানকে দেখতে চাই।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪২


সায়েম সোবহান আনভীর। এক বিশাল বিজনেস টাইকুন, বসুন্ধরা গ্রুপের যোগ্য কান্ডারী। আহা, কী তার ব্যক্তিত্ব! দেখতে যেমন সুন্দর, চরিত্রও যেন মাশাআল্লাহ্ ফুলের মতো পবিত্র। আর বসুন্ধরা গ্রুপের কথা তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×