



"বড় হয়ে তুমি কী হবে, খোকা?"
ছোটবেলায় এটা ছিল কমন প্রশ্ন। কোথাও গেলে কিংবা নতুন কোন আত্মীয় বাড়িতে এলে এ প্রশ্নের মখোমুখি হয়নি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রত্যুত্তরে পরিবারের বড়দের "শিখিয়ে দেয়া" স্বপ্নের কথা বলে পার পেয়ে গেছি। নয়তো পাঠ্যবইয়ের "My Aim In Life" থেকে "ডাক্তার হব" কপি করে ঝেড়েছি কেউ কেউ। এই "ডাক্তার হব"র দ্বারা শুধু প্রশ্ন পর্ব উতরেই যাওয়া যেতো তা নয়, অনেক বাহবাও জুটতো।
স্কুলের মাস্টার মশাইয়ের নির্মম বেত খেয়ে অনেকে মনে মনে "শিক্ষক হয়ে" মাস্টার মশাইয়ের বংশধরদের পিটিয়ে প্রতিশোধ নেবার প্রতিজ্ঞাও করে। (স্যারের হাতে মার খেয়ে কান্না করা বন্ধুদের কতবার যে এটা বলে সান্ত্বনা দিয়েছি হিসেব নেই। স্যারের আত্মীয়দের ফেল করিয়ে দেব-- এমনটাও কেউ কেউ বলে।)
তবে ওই শৈশব-কৈশোরে ইব্রাহিম খাঁর "ভাঙা কুলা" গল্পের সেই নিবেদিত প্রাণ টিএনও হবার স্বপ্নধারী কিংবা "গরীবের রাজা রবিন হুডের" আদর্শ অনুসরণকারী যে নেহাত পাওয়াই যায় না তা বলা বোধ হয় ঠিক হবে না।
অনেকের মনে "গ্রামের স্যারের" মত ছাত্র দরদি শিক্ষক হবার স্বপ্নবীজ পরম যত্নে লালিত হয়। কার ছেলেটা বাড়তি কিষেণের ব্যয় কমাতে বাপের সাথে মাঠে গেল, তার বাপেরে বুঝিয়ে বলা। কোন নাসরিন মার অসুখে সংসারের হাল ধরল, তার রান্নায় সাহায্য করে স্কুলে নিয়ে যাওয়া কিংবা যে ছেলে স্কুল-ড্রেস বানাতে পারছে না তার হাত ধরে দর্জির দোকান থেকে গাটের পয়সা খরচ করে ড্রেস বানিয়ে দেয়ার যে ঋণ, তা শোধ করার জন্য কেউ কেউ মাস্টার হতে চায়।
কারো আবার বিদ্যাসাগরের মতো "নিজের নতুন ধুতিটিও দান করার" ব্রত থাকে। "আমি ঠিক আমার মায়ের ঈশ্বরচন্দ্র হব। মায়ের ডাকে দামোদর না পানি কয়রা নদী স্রোত ডিঙাব।"
অন্যের প্রভাব, আবেগের বশে ছেলেবেলার সেই "খোকন, তুমি বড় হয়ে কী হবে?" প্রশ্নের আসল উত্তরটি উঁইঢিবির আড়ালে চলে যায়। হাজার বছরের সত্য-স্থাপত্য যেমনটি মাটি চাপা হয়ে রয়। পাথরে হাতুড়ির ঘা পড়ে পড়ে যেমন করে নিরস পাথর একটু একটু করে আকৃতি ধরে ভগবান হয়ে পূজ্য হয়। তেমনি করে বয়স বাড়ার সাথে সাথে "আবেগের পাথর-ঢাকা সেই উত্তর" অভিজ্ঞতার হাতুড়ির ঘায়ে ধীরে ধীরে মসিবর্ণ থেকে ধূসর হয়ে পরিষ্কার পাঠযোগ্য হয়ে ওঠে। মন তখন সত্যিকারের উত্তরটিই পড়ে।
"আমি বড় হতে চাই না, আমি আবার ছোট হতে চাই।"
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ১২:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




