somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তারা দর্শন

০৯ ই নভেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা ছাড়িয়েছে । চোখে ঘুম নামি নামি করছে । তবু প্রবল আগ্রহ নিয়ে বসে থাকা, ঘুমকে আরো কিছুক্ষণের জন্য অপেক্ষা করানো । একটু পরই যে শুরু হবে ওয়ার্ন ওয়রিয়র্সের ব্যাটিং । শচীন ব্লাস্টার্সের হয়ে বোলিং সূচনা করবেন, এই গ্রহের সবচেয়ে দ্রুততম একজন বোলার । চল্লিশ পেরোনো তিনি, এখন কেমন বোলিং করেন তা না-দেখে, কি করে ঘুমাই ?

শোয়েব আকতার আসলেন এবং চমকে দিলেন । গায়ের জোর আগের মতো হয়তো নেই, তবে যা আছে তাতেই ক্যালিস কে ভড়কে দেয়া সম্ভব হলো । ইনিংসের তৃতীয় বল, শর্ট লেংথ ডেলিভারী, ক্যালিস কিছুটা লাফিয়ে উঠলেন । বল ক্যালিসকে তো ফাঁকি দিলই, ফাঁকি দিল মঈন খানের মরচে ধরে যাওয়া হাতকেও । দুটি রান বাই পেল ‘ওয়ার্ন ওয়ারিয়র্স’ । পরের বলটা যেন আরো মারাত্নক । ছুটন্ত গোলাটা ক্যালিসের ব্যাটের কোনায় লেগে কিপার ও স্লিপের মাঝখান দিয়ে চলে গেল । সব দাঁত বের করে দিয়ে সে কী হাসি, শোয়েবের । স্বার্থক হলো যেন মধ্যরাতের জেগে থাকা !

হঠাৎ যেন বছর কয়েক পেছনে ফিরে গেলেন, পন্টিং । সতীর্থ হেইডেনের বিদায়ে নামলেন, প্রিয় পজিশন নাম্বার থ্রীতি । নেমেই দেখালেন, সেই ছটফটে পন্টিংকে । কিছুই যেন বদলায়নি । পয়েন্টের পাশ দিয়ে ঠেলে দিয়ে ছুটলেন রান নিতে । ক্যালিস হয়তো একটু বেশীই তৎপর ছিলেন, নিতে গেলেন দুই রান । ফলাফল, মুরালীর থ্রো সরাসরি মঈনের হাতে । সেই হাত বল ধরেই নির্দয়ের মতো ভেঙ্গে দিল স্ট্যাম্প । রান আউট হলেন ক্যালিস ।
মুরালী ! সেই বিশাল চোখের মুরালী ! ছোট বাচ্চারা ভাত না-খেলে, যে চোখ দেখিয়ে ভাত খাওয়ানো যেত । সেই চোখ দিয়ে কত ভয়ংকর ব্যাটসম্যানকেই তো ‘ভস্ম’ করলেন ! চুলগুলো কেমন জানি হয়ে গেছে, ঝাঁকড়া কিংবা কোঁকড়ানো । যখন বোলিং করছিলেন, পেছন থেকে দেখতে ‘অদ্ভুত’ লাগছিল । ক্যালিসকে রান আউট করে সে কী হাসি, বিশাল চোখগুলোও যেন হাসছিল !

কার্ল হুপার লোকটাকে বোধহয় প্রায় এক-যুগ পর দেখলাম । প্রথম দেখেছিলাম, সেই কবে সম্ভবত ১৯৯৯-২০০০ এর দিকে । আব্বু চিনিয়ে দিয়েছিলেন । জিমি এডামসকে সরিয়ে ‘ক্যাপ্টেন’ করা হয়েছিল তাকে । সেই হুপারকে খেলা ছাড়ার পর আর দেখিনি । কোথায় ছিলেন, কে জানে ! খোলা মাথায় ব্যাট করতে আসলেন । তাঁর সেই বিখ্যাত হ্যালমেট হয়তো বহুদিন অবহেলায় কোথায় হারিয়ে গেছে, আর খুঁজে পাননি । ব্যাটিংটা অবশ্য ঠিক উপভোগ্য ছিল না । তবে অফ স্পিনটা আছে, প্রায় আগের মতোই ।

সাইমন্ডসের যেন কোন পরিবর্তন নেই । ঠোঁটে সেই জিংক-অক্সাইড আছেই, সঙ্গে কার্যকরী অফ স্পিন । শুধু মনে হলো, একটু মুটিয়ে গেছেন যেন ! সাইমন্ডসকেই মাহেলা মিড উইকেট দিয়ে ছক্কা হাঁকালেন । এক বল পরেই ‘মধুর’ প্রতিশোধ নিলেন তিনি । মাহেলাকে আগারকারের ক্যাচ বানিয়ে আউট করলেন । ও হ্যাঁ, আগারকার । তিনি অবশ্য একাদশে ছিলেন না । সাবস্টিটিউট ফিল্ডার হিসেবে খেলেছিলেন । এই আগারকারকে তখন চূড়ান্ত বিরক্তিকর মনে হতো ! আম্পায়ার যদি তাঁর আপিলে সাড়া না-দিতেন, ‘ভস্ম’ করে দেয়া এক চাহনি দিতেন । এখন আর সেই আগারকার নেই, নিপাট ভদ্রলোক হয়ে গেছেন মনে হলো !

শচীন ব্লাস্টার্সে শোয়েবের সঙ্গে বোলিং সূচনা করেছেন, শন পোলক । যাকে খেলোয়াড়ি জীবনে ‘পোলার’ আইসক্রিম ডাকতাম । লোকটার কোন পরিবর্তন নেই । যেই পোলক, সেই পোলকই আছেন । স্বাস্থের কোন উন্নতি নেই । পোলক ব্যাটিংয়ের সময় বেশ একখান মজার ঘটনা ঘটল । স্বদেশী ডোনাল্ডকে লগ অন দিয়ে ছক্কা মারার পরই ক্যাচ তুলে দিলেন, আর ক্যাচটি লুফে নিলেন জ্যাক ক্যালিস । শন পোলক আউট : বল ডোনাল্ড কট ক্যালিস । পুরো একটা আফ্রিকান প্যাকেজ !

ওয়ালশকে সে কী বেধড়ক পিটুনী দিলেন, বীরু । ক্যালিসের প্রতিও প্রচন্ড ক্ষোভ ছিল যেন ! বোঝাই যাচ্ছিল, এই লোক অনায়াসে আরো কিছুদিন খেলে যেতে পারতেন । শেওয়াগ স্ট্যাইলে করলেন, বাইশ বলে পঞ্চান্ন । ড্যানিয়েল ভেট্টরীর আর্মারে সরাসরি বোল্ড হয়ে ফিরে যাওয়ার আগে, বিনোদিত করে গেলেন স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শকদের । পনের বছরের খেলোয়াড়ি জীবনে যা নিত্য-ই করে এসেছিলেন ।
‘দ্যা গ্লাস ম্যান’ ড্যানিয়েল ভেট্টরী । এই লোক বুঝি কখনো বুড়ো হবেন না । পঁচিশ বছরের টগবগে তরুণ যেন ! বোলিংয়ের ধার কমেনি এতটুকু !
পঞ্চাশোর্ধ ওয়াসিম আকরাম দেখালেন, বুড়ো হাঁড়ে এখনো একটুও মরচে ধরেনি ! চার ওভারে ষোল রান দিয়েছেন । তার চেয়েও বড় কথা, সে কী লাইন-লেংথ ! চাইলেই যেন অফ স্ট্যাম্পের বাইরে ইচ্ছামতো ইয়র্কার করে যেতে পারবেন, এখনো !

কোর্টনি ওয়ালশ ও কার্টলি এমব্রোস । এই দুই ক্যারীবিয়ানের মাঠের সময়টা হয়তো ভালো যায়নি । হয়তো দুই জন দুই দলে খেলছেন বলে ! তবু বলতে হয়, এই বয়সে তাদের বল হাতে দৌড়াতে দেখার মতো সুখকর আর কিছু বুঝি হয় না !
লক্ষণ, লারারা ঠিক নামের প্রতি সুবিচার হয়তো করতে পারেননি । কিন্তু এত দিন পর তাদেরকে ব্যাট হাতে দেখাটা-ই ছিল অনেক বড় পাওয়া । যাতে মনে হয়েছে, লক্ষণের ওজন কিছু বেড়ে গেছে । কিন্তু লারা যেন সেই আগের মতোই আছেন ।
জন্টি রোডস ব্যাটিংয়ের সময়, সুইপের মতো করে কি এক ছক্কা হাঁকালেন । বোঝার উপায় নেই, এই লোক প্রায় এক যুগ আগে ব্যাট তুলে রেখেছেন । পন্টিং বুঝি, মাঠেই নেমেছিলেন নিজেকে প্রমাণ করতে ! সেই পুরনো পন্টিং-ই যেন ছিলেন, পুরো ইনিংস জুড়ে । হাস্যরসে মেতে থাকা হেইডেন সেই ‘ভি’ অঞ্চলকে টার্গেট করার আগেই শোয়েবের শিকারে পরিণত হলেন !
কুমার সাঙ্গাকারা ! এই লোক অবসরে গেল কেন, এটা একটা গবেষণার বিষয় বস্তু হতে পারে । অনায়াসে খেলে যেতে পারতেন, আরো কিছুদিন । খেললেন তাঁর মতো করেই রাজসিক কিছু শট !

আমেরিকান দর্শকদের কাছে ভাল একটা কুইজ হতে পারে, শেন ওয়ার্নের বয়স কত ? থুরথুরে বুড়ো হয়ে গেলেও, এই লোক নির্ঘাত বলকে নাইন্টি ডিগ্রী বাঁক খাওয়াতে পারবেন । শচীন, লারা, লক্ষণ... তিনজনকেই ফেরালেন ‘দ্যা ম্যাজেশিয়ান’ । অবস্থাটা একবার দেখুন, খেলোয়াড় জীবনে ওয়ার্নিকে ঘোল খাওয়ানো তিনটা প্লেয়ারকেই ঘোল খাইয়ে ফেরালেন তিনি ! শৈল্পিক বোলিংয়ের সাথে ছিল, পুরো মাঠ জুড়ে তাঁর সপ্রতিভ অধিনায়কত্ব । এর সঙ্গে যোগ করতে পারেন, ওয়ার্নির ‘এভারগ্রীন’ টাইপ লুক । ম্যাচ চলাকালে শিবানির সাথে ছোট্ট এক ইন্টারভিউতে অংশ নিয়েছিলেন । সেই সময় ভাবছিলাম মাঠের ওয়ার্নি ফিরছেন যখন, তখন সেই ‘রোমিও’ ওয়ার্নিও কি ফিরবেন ?

সারাটা সময় হাসিটা যেন, শচীনের মুখে আঠা দিয়ে সাঁটা ছিল ! কখনো কখনো উচ্ছল হাসিতে মেতে উঠেছেন । ওয়ার্নির বলে আউট হয়ে যাওয়ার পরও, তাঁর হাসিটা মুখ থেকে কেউ কেঁড়ে নিতে পারেনি । খেলেছেনও মোটামুটি, তবে তাঁর মতো হয়তো ছিল না । যা খেলেছেন, মুগ্ধ হওয়ার জন্য তা-ই ছিল যথেষ্ট ।

বাংলাদেশ সময় রাত বারোটায় শুরু হয়েছে, তারাদের এই মিলনমেলার উৎসব । ঠিক মধ্যরাত । খেলা দেখে মনেও হলো তাই । যেন মধ্যরাতের কোন এক সুখস্বপ্ন ! একটা মোহ, একটা ঘোর, একটা বিভ্রম, একটা মায়া... একটা কি যেন !
হঠাৎ ক্রিকেটাকাশের সব নক্ষত্ররা আকাশ ছেড়ে যেন ক্রিকেট মাঠে (পড়ুন, বেসবল মাঠে) নেমে এলেন ! কাকে রেখে কাকে দেখি ! সেই বোলিং এ্যাকশন, ব্যাটিং স্ট্যান্স, মাঠে হঠাৎ খুব পরিচিত ছুটোছুটি । কেমন যেন লাগে ! মুগ্ধতা নেমে আসে দু’চোখ জুড়ে । বড় বড় তারাদের আকাশে দেখার অনুভূতিই এতদিন সঙ্গী ছিল, মর্ত্যে দেখার অনুভূতি ছিল না । অবশেষে পেলাম সেই কখনো না-পাওয়া স্বাদ । মুগ্ধতার রেশ যেন কাটছেই না ।

______
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৫৫
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×