
দিনে দুপুরে একটা জেলা শহরে দুই দল সন্ত্রাসীর মধ্যে যদি গুলি বিনিময় হয় – তাহলে ঘটনাকে কিভাবে দেখা হবে?
আমি বিশ্বাস করি না যে, আমাদের মানবিক বা সামাজিক গুনাবলী এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে, আমরা এটাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে উপেক্ষা করতে পারি।
এরকম একটা ঘটনার পরে, কোন জাতীয় দৈনিক যদি সেটা প্রকাশে ব্যর্থ হয় - তাহলে ঐ পত্রিকার পেশাদারিত্বের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার দায় আমার মত সাধারন পাঠকের উপর কতটুকু বর্তাবে তা অবশ্য আমার জানা নেই। আমার এই অজ্ঞানতা স্বীকার করতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধাও নেই।
আমি এও জানি না যে, যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি কোন কারনে এমন একটি সংবাদ চেপে গিয়ে থাকেন বা প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহনে বিরত থকেন – তাহলে মানবিক গুণাবলীর মানদণ্ডে তার নৈতিকতা আর পেশাদারিত্বের নিক্তিতে তার সততা ও আন্তরিকতার পাল্লা হালকা বলে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ কতটুকু আছে।
এক্ষেত্রে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার যথার্থতা কিংবা পেশাদারিত্বের মানের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা করা কিংবা আলোচনা/সমালোচনা করা হলে, তাও আবার খোলা মনে মেনে নেয়ার মানসিকতা কোন পর্যায়ে কতটুকু আছে – সে বিষয়ে বিস্তর সন্দেহ আমার নিজেরই আছে।
আমার উপরের কথাগুলো, দুই দল সন্ত্রাসীর মধ্যে গতকাল খাগড়াছড়ি শহরে সংঘটিত গুলি বিনিময়ের ঘটনাকে নিয়ে লেখা। স্থানীয় কয়েকটি সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে, গত ২২ মে ২০১৮ তারিখে, আনুমানিক দুপুর দেড়টার দিকে, অন্তত ৩০/৩৫ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্যে প্রায় শতাধিক রাঊন্ড গুলি ছুড়ে। ভয়ে বাজারের সকল দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং বাড়ী-ঘর ছেড়ে পালিয়েও যায় অনেকে। সাথে সাথেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পুরো এলাকায় তল্লাসী শুরু করে।
যদিও সংবাদে উল্লেখ করা ছিল - এই ঘটনায় কারা জড়িত থাকতে পারে। কিন্তু, আমি ইচ্ছে করেই তা চেপে গেলাম। কারণ, ঐ সন্ত্রাসিরা আমার লেখার প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। আমি আপনাদের দৃস্টি আকর্ষণের চেস্টা করছি অন্য দিকে।
আমার দৃস্টিতে যারা এটা ঘটিয়েছে, তারা সন্ত্রাসী – সে যে দলেরই হোক না কেন।
তাদের পরিচয় সাধারন মানুষের জানা দরকার।
কিন্তু, তার চেয়েও বেশি দরকার এটা জানা যে, আমাদের অনেক বহুল প্রচারিত সংবাদ পত্র এই ঘটনাটি বেমালুম চেপে গেছে।
যারা দিনে দুপুরে জেলা শহরের একটা বাজারে গোলাগুলি করল, তারা অবশ্যই অপরাধী।
তাদেরকে কি বলা যায়, যারা জানা সত্ত্বেও এবং দায়িত্বের মধ্যে পড়া সত্ত্বেও এটা অন্যদের কাছ থেকে গোপন করল?
আমাদের দেশের বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা সম্ভবত আমাদেরকে তেমন একটা নাড়া দেয় না আজকাল।
ব্যাপারটা অনেকটাই ট্র্যাফিক জ্যাম বা বর্ষাকালের রাস্তায় জলাবদ্ধতার কাছাকাছি পৌছানোর পর্যায়ে হয়ত চলে যেতে পারে একটা সময়।
আর এখন যদি দেখি যে, দুই দল সন্ত্রাসীর গোলাগুলির ঘটনা, তাও আবার আড়ালে বা লুকিয়ে নয় রীতিমত জেলা শহরে এবং প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটছে। অথচ সংবাদ পত্রে স্থান পাচ্ছে না।
ধরুন এই ঘটনাটি সমতলের কোনো জেলায় ঘটেছে- তাহলে কী হতো? সাথে সাথে টিভি চ্যানেল, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও জাতীয় পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে ব্রেকিং চলে আসতো। টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত লাইভ বা পরবর্তী নিউজ বুলেটিনেই খাগড়াছড়ি থেকে স্থানীয় প্রতিনিধিদের লাইভ বক্তব্য ও ফুটেজ প্রচার করা হতো। রাতের টকশোগুলোতে দেশের বিদগ্ধ আলোচকরা কথা বলতেন এ নিয়ে। তাদের সাথে লাইভ যুক্ত করা হতো স্থানীয় প্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের। কিন্তু খাগড়াছড়ির এ ঘটনায় কিছুই ঘটেনি। শুধু খাগড়াছড়ি বলে নয়, পাহাড়ে এরকম বা এর চেয়েও আলোচিত শত শত ঘটনার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত একই প্রতিক্রিয়া দেখানো হয় গণমাধ্যমে।
কাজেই এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে পারে যে, যে গণমাধ্যম সমতলে এতো ভাইব্রান্ট, সে গণমাধ্যম পাহাড়ের ক্ষেত্রে এতোটা উদাসীন কেন? কিম্বা যেসব গণমাধ্যমের প্রতিনিধি সমতলে ব্যাপক সক্রিয় তাদেরই পাহাড়ের প্রতিনিধিরা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এতোটা নিস্ক্রিয় থাকে কী করে?
এর কারণ কিন্তু অনুমান করা কঠিন নয়, বরং অনেকেই তা ভালোমত জানেন।
আমাদের দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর পার্বত্য অঞ্চলের বেশিরভাগ প্রতিনিধিই পাহাড়ী।
তাদের অনেকেই সন্ত্রাসীর ভয়ে, কেউ কেউ আবার আর্থিক বা বৈষয়িক সুবিধার প্রেক্ষিতে আর গুটিকয়েক আবার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মতাদর্শের বেড়াজালে আটকে প্রকৃত সত্য এর আগেও অনেক সময় প্রকাশে দ্বিধায় ভুগেছেন।
তাই, অবশ্যম্ভাবী ভাবে একটা কথাই শুধু বলা যেতে পারে – এ শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব !

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
