somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দি ভলান্টিয়ার্স অব রাঙামাটি (পার্ট-৩)

১৮ ই জুলাই, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তিন

সন্ধ্যায় ডি সি অফিসে যাওয়ার সময় শাফিন যখন পাভেলকে বলে,
- “চল, তোর গাড়ীতে তো তেল ঢুকাইছস, তুইই যাবি আমার সঙ্গে।“
তখন, পাভেল খুশীমনেই রাজী হয়ে যায়। শাফিনের সাথে তার ছোট বেলা থেকে বন্ধুত্ব বলেই শুধু নয়। বরং, তার কাছ থেকেই সে প্রথম জানতে পারে, যে, রাঙ্গামাটির অবস্থা খুবই খারাপ। রাস্তাও ভেঙ্গে গেছে, চট্টগ্রাম থেকে যাওয়ার আপাতত কোন উপায় নাই।

বাড়ি রাঙামাটি হলেও পাভেল কাজিনের সাথে চট্টগ্রামে চাদ্গাও আবাসিক এলাকায় থাকে। প্রিমিয়ার ভার্সিটিতে এলএলবিতে পড়ার সুবাদেই তার এখানে থাকা। রাঙামাটিতে বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ করে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে মোটেও দেরী হয়নি। বাবাই তাকে পরামর্শ দিলো যে, ঘুরপথে হলেও কাপ্তাই হয়ে নৌকা দিয়ে রাঙামাটি পৌঁছানো সম্ভব। তার বোন ছিল চট্টগ্রামে, সেও সাথে যাবে। দুই ভাইবোন তখন চট্টগ্রাম থেকে প্রথমে কাপ্তাই, পরে কাপ্তাই থেকে নৌকায় করে রাঙামাটিতে নিজেদের বাড়ীতে ফিরে।

চট্টগ্রাম ছাড়ার আগেই বন্ধুরা অনুরোধ করেছিল – সে যেন কিছু তেল (পেট্রোল/অকটেন) নিয়ে আসে। কারণ রাঙামাটিতে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিস রাংগামাটিতে তখন মহামুল্যবান হয়ে দাঁড়িয়েছে – গাড়ির জ্বালানি ছিল অন্যতম। কারণ, পেট্রল পাম্পের স্টক শেষ। আর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সাপ্লাই বন্ধ। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা বাইক চালাতে সমস্যায় পড়েছে। তাই, সে কাপ্তাই থেকে ২০ লিটার পেট্রোল একটা প্ল্যাস্টিক জ্যারিকেনে ভরে রাঙামাটি নিয়ে গিয়ে অন্য সবার সাথে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়।

ডি সি অফিস থেকে বেরিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চলে কিছুক্ষণ।
তারপরে অন্যদের সাথেই জোন হেডকোয়ার্টারে যেতে হয়। সেখান থেকে রাঙামাটি কলেজের মিটিং শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে মধ্যরাত পেরিয়ে যায়।

পরের দিন সকালে প্রচুর বৃষ্টির মধ্যেই পাভেল এসে প্রথমে বাপ্পিকে তুলে নেয়। তারপরে যায় জুয়েলের কাছে। তাদের জন্য নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্র ছিল কাপ্তাই রোডে – ভোয়াল্লা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। তারা কেউই এটা চিনে না। কতদুরে তাও জানে না। খালি শুনেছে যে, এটা কাপ্তাই রোডে। বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় তেমন লোকজনও নেই যে, কাউকে জিজ্ঞেস করবে। অনেকক্ষণ পরে একজনকে পেল। সে জানালো, সামনে আরো প্রায় কমপক্ষে ১০ মিনিটের রাস্তা।
যাওয়ার পথে সবাই বিস্মিত হয় ধ্বংসযজ্ঞ দেখে। তাদের পরিচিত রাস্তা। অথচ, নিজেদের কাছেই অপরিচিত মনে হচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার রাস্তার প্রায় অর্ধেকই গায়েব হয়ে গেছে। প্রতিদিন যাতায়াত করার পরেও তাঁরা কিছু কিছু স্থানে রাস্তা চিনতে ব্যর্থ হয়েছে কয়েক জায়গায়।

দুজনকে নামিয়ে দিয়ে চলে আসে শাফিনের কাছে।
তাকে নিয়ে জোন সদরে যেতে হবে। বৃষ্টি তখনো চলছে। তীব্রতা মোটেও কমেনি। মুষলধারেই বৃষ্টির মধ্যেই জোন সদরে ভলান্টিয়ার্সদের নামের লিস্ট জমা দেয়। তারপরে তাকে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে নামিয়ে দিয়ে পাভেল চলে যায় নিজের আশ্রয়কেন্দ্রে। শুধুমাত্র এই কয়দিনই নয়, বরং ভলান্টিয়ার্সদের পরবর্তী সবগুলো দিনেই পাভেলের বাইকটা অনেক কাজে দিয়েছে।

চার

গতকাল রাত থেকেই ইকবালের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে।
‘ইয়ুথ’ এর পক্ষ থেকে না হলেও যে কোন ভাবে রাঙ্গামাটি’র জন্য কিছু একটা করতে প্রাণ আকুপাকু করছিল।
তিনদিন আগে রেইনবো রেস্টুরেন্টে মিটিং করলেও, কাজের কাজ হয়েছে গতরাতে জোন কমান্ডারের সাথে মিটিং-এ। তারপর থেকেই সে ভলান্টিয়ার্সের খোঁজে ব্যস্ত। ইতোমধ্যে অনেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাদের সাথে যোগ দেয়ার। এমনকি চট্টগ্রাম থেকেও আসতে চেয়েছে কয়েকজন। তবে, আরো কয়েকজন ভলান্টিয়ার্স দরকার।

তাই, এই ভর সন্ধ্যায় তবলছড়ি বাজারে অনেশকে দেখে কিছুটা খুশীই হয়। কুশলাদি বিনিময়ের পরপরই সে ভলান্টিয়ার্সদের প্রসঙ্গ তোলে। অনেশকে পুরো ব্যাপারটা বিস্তারিত জানিয়ে তাকে অনুরোধ করে ভলান্টিয়ার্স হিসাবে কাজে নেমে পড়তে। কোন কিছু না ভেবেই অনেশ রাজী হয়ে যায়। তার দায়িত্ব পরে ‘অভিলাষ ক্রিকেট ক্লাব আশ্রয়কেন্দ্রে। বাসা থেকে হাটা পথে মাত্র ৮-১০ মিনিটের পথ । বাড়তি সুবিধা হলো, তার স্কুল ফ্রেন্ড হৃদয়ও এই কেন্দ্রের ভলান্টিয়ার্স হয়েছে। অবশ্য, কয়েকদিন পরেই অনেশকে চলে যেতে হয়েছিল আমানতবাগ আমানতবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে।

চৌধুরী অনেশ বড়ুয়ার গল্পটা কিছুটা ভিন্ন ধরনের।
পরলোকগত বাবা ছিলেন একজন সরকারী কর্মকর্তা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মাকে ঘিরেই এখন তাদের দু’ভাইয়ের সমস্ত কিছু আবর্তিত হয়। ভাইদের মধ্যে সে ছোট। স্বাভাবিকভাবেই সকলের বাড়তি ভালোবাসা আর স্নেহের মধ্যেই তার বেড়ে উঠা। পড়ে রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে, ডিগ্রী ১ম বর্ষে। বাসা বেশি দূরে নয়। রাঙ্গামাটির সদর পুলিশ ফাঁড়ি এলাকার কাছে। জায়গাটা স্থানীয়দের কাছে মাঝেরবস্তি এলাকা নামেই পরিচিত।

ব্যক্তিগত কিছু প্রয়োজনে তাকে চট্টগ্রামে যেতে হয়েছিল।
তবে, ১১ জুন তারিখে রাঙামাটি ফিরে আসে। সারাটা দিন বৃষ্টির প্রচন্ডতায় যাত্রাপথে নাকাল হতে হয় বেশ কয়েকবার।
পরেরদিনও বৃষ্টির তীব্রতা কমে না। মুষলধারে একটানা বৃষ্টিতে ঘরে বন্দী অবস্থায় কাটে সারাটা দিন। বৃষ্টি আর বজ্রপাতের শব্দের মধ্যেই রাতে শুয়ে পড়ে।

হঠাৎ কানে তালা লাগানো বজ্রপাতের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়।
প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে সে। ঘড়িতে মধ্যরাতের কাছাকাছি।
বৃষ্টি তখনো আগের মতোই অঝোরে ঝরছে। কেন যেন মনের মধ্যে কু ডেকে উঠে। আর ঘুম আসছে না এখন।
যদিও ভয় কিছুটা কমেছে।

সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরীই করে ফেলে অনেশ। অভ্যাসবশত প্রথমেই মোবাইল হাতে নিয়ে ফেসবুকের নোটিফিকেশন দেখে। তখনি চোখে পড়ে রাঙামাটিতে ল্যান্ড স্লাইড সংক্রান্ত কিছু পোস্ট। খেয়াল করে দেখে জাবেদের কল মিস করেছে সে। কল ব্যাক করে সাথে সাথেই। তার কাছ থেকেই জানতে পারে যে, শিমুলতলী,রেডিও ষ্টেশন সহ বিভিন্ন জায়গায় পাহাড় ধ্বস হয়েছে এবং অনেক মানুষ ধ্বসের ফলে মাটির নিচে চাপা পড়েছে। এমনকি, মানিকছড়িতে ধ্বসের ফলে রাস্তায় মাটি পরিষ্কার করার সময় সেনাবাহিনীর সদস্যরাও নাকি মাটি চাপা পড়েছে। সব শুনে অনেশের আতংক বেড়ে যায়। কপাল ভালো যে, তাদের বাড়ীর কিছু হয়নি। পরিবারের সবাই ভালো আছে।

অনেশের সমবয়সী আরো কয়েকজনের সাথে মিলে সে একটা সংগঠনের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। মূলত গিটার বাজানো শিখতে গিয়েই ধীরে ধীরে অন্যদের সাথে পরিচয়, আড্ডা এবং শেষে ‘ইয়ুথ’ নামের এক সামাজিক সংগঠনে যোগ দিয়ে ফেলে সে।

(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুলাই, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:০৪
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পুলিশও মানুষ, তাদেরকে সাহায্যের জন্য আমাদেরও এগিয়ে আসা জরুরী

লিখেছেন মাহমুদুল হাসান কায়রো, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ রাত ১:৪৩

রাত বারোটা বেজে ১০ মিনিট। কাকরাইল চৌরাস্তায় একটা “বিআরটিসি এসি বাস” রঙ রুটে ঢুকে টান দিচ্ছিলো। কর্তব্যরত ট্রাফিক অফিসার দৌড় গিয়ে বাসের সামনে দাড়ালেন। বাস থেমে গেল। অফিসার হাতের লেজার... ...বাকিটুকু পড়ুন

অবশেষে দৈত্যের পতন

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ রাত ২:৩১



ট্রাম্প দেশের ক্ষমতা হস্তান্তরকারী সংস্হাকে কাজ শুরু করার অর্ডার দিয়েছে; আজ সকাল থেকে সংস্হাটি ( জেনারেল সার্ভিস এজনসীর ) কাজ শুরু করেছে, নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের লোকেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটার তো বাহাদুরি মমিনরা নিল, বাকি ভ্যাকসিন গুলোর বাহাদুরি তাহারা নেয় না কেন?

লিখেছেন এ আর ১৫, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ৮:৫২



বাহাদুরির বিষয় হলে যারা ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু করেন, তারা জবাব দিবেন কি?
কার্দিয়ানিরা মুসলমান নহে কিন্তু যেহেতু বাহাদুরির বিষয় তাই ডঃ সালাম হয়ে গেলেন মুসলমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

নভোনীল পর্ব-১৪ (রিম সাবরিনা জাহান সরকারের অসম্পূর্ণ গল্পের ধারাবাহিকতায়)

লিখেছেন ফয়সাল রকি, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:৫১



- ময়ী, ময়ী! আর কত ঘুমাবি? এবার ওঠ।
দিদার ডাকতে ডাকতে মৃনের রুমে ঢুকলো। মৃন তখনো বিছানা ছাড়েনি। সারারাত ঘুমাতে পারেনি। ঘুমাবে কী করে? রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা ভর করেছিল ওর... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৌষের চাদর – মাঘের ওভারকোট

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৩৬




চাদর ম্যানেজ করতে পারতাম না বলে কায়দা করে প্যাচ দিয়ে একটা গিটঠু মেরে দিলে আমি দৌড়ানোর উপযুক্ত হতাম । লম্বা বারান্দা দিয়ে ছুটতাম । অবাক চোখে পৌষের কুয়াশা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×