
আমার নাম কাইকর। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমি। কলেজ জীবনে ক্লাস করেছি মাত্র তিনদিন। টেস্ট পরীক্ষায় চার বিষয়ে ফেল করার জন্য কোনোভাবেই কলেজ কৃর্তপক্ষ আমাকে পরীক্ষা দিতে দিবেনা। বাসা থেকে কোনোভাবেই বাবাকে রাজি করাতে পারলাম না। বাবাকে তো কোন কিছু বলার নেই।কারণ- আমি সে মুখ রাখিনি। কোন উপায় না পেয়ে, এলাকার বড় ভাইকে ধরে ম্যানেজ করে পরীক্ষা দিয়ে কোনরকম এইসএসসি পাস করলাম। সেই থেকে বড় ভাই সুমনের কাছে আমি বাঁধা। এক সময়ে ভাইয়ের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়ে গেলো আমরা। প্রতি রাতে দুজন ছাদের উপরে বসে ইয়াবা গলাতাম!এভাবে ইয়াবা গলাতে গলাতে কবে যে ইয়াবা জগতে ঢুকে পড়লাম বুঝতেই পারলাম না! শহরের সবচেয়ে বড় বড় ভদ্রসমাজের অভদ্র মুখোশধারী সমাজসেবকদের সাথে পরিচয় হয়ে গেল আমার।এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা, টাকা-পয়সা, নারী এগুলো আমাকে মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধ বানিয়ে ফেলল।এখন আমি এক পৃথিবীর রাজা। বাড়ি-গাড়ি রাতারাতি হয়ে গেল। রাত-বিরেতে নারী আর দামি গাড়ী হাকিয়ে বেড়াই রাস্তার মাঝে। পুলিশ-প্রশাসন সব হাতে! আমাকে ঠেকায় কে!!!
কলেজ জীবনে ভালবাসতাম অপ্সরাকে। সে আমাকে এক পৃথিবী ভালোবাসতো। নিজের সবটুকু দিয়ে আমাকে আগলে রাখতো। দুজন কলেজ ফাকি দিয়ে কত যে ঘুরেছি তার হিসেব নেই! একদিন আমি ও অপ্সরা কলেজ ফাকি দিয়ে শহরের যান্ত্রিক যে লাল-নীল গাড়ি আছে বড় বড় সেগুলোর মধ্যে উঠে পড়ি। পুরো ফাঁকা গাড়ির মধ্যেও আমরা গিয়ে বসি পিছনের সিটে। সেদিন প্রথম অপ্সরা আমাকে বুনো আদর দিয়েছিল। আমি তখন তার ভালবাসায় বুদ হয়ে আদর নিয়েছিলাম।সামনে থেকে ড্রাইভার মামা তখন হর্ন বাজিয়ে বাজিয়ে পুরো শহরকে জানিয়ে দিচ্ছিল আমাদের ভালোবাসার কথা।সেদিন সবার গন্তব্য স্থান ছিল। কিন্তু আমাদের ছিলনা!এক শহর আদর পাবার জন্যই সেদিন হয়তো উঠেছিলাম যান্ত্রিক ওই নীল বাসে।শেষ অব্দি গাড়ীর চাকা গিয়ে থামে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে। আমরা আবার ফিরতি বাসে উঠে আমাদের লাল-নীল সংসারের কথা বলছিলাম। অপ্সরা তার মাথা আমার কাঁধে রেখে প্রশান্তির শ্বাস ফেলছিল আমার লোমহীন বুকে।জানালা দিয়ে মৃদু বাতাস এসে অপ্সরার চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছিল। আমি তার চুলের গন্ধ নিচ্ছিলাম খুব করে। হঠাৎ কি মনে হয়ে অপ্সরা আমার লোমশহীন বুকের উপর মাথা রেখে কিন্নর মুখে বলল,আমাকে ছেড়ে যাবে না তো কোনদিন? সেদিন রাস্তার সমস্ত ধূলিকণা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি ল্যাম্পপোস্ট ও যান্ত্রিক গাড়িগুলোকে সাক্ষী রেখে বলেছিলাম, ভালোবাসি তোমাকে অপ্সরা, ভালোবাসি। এই শহর জানে আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমার কথা শুনে অপ্সরার চোখের কোণায় জল জমে এলো। আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আমার বুকের উপর মাথা রেখেই বাকি পথ আসলো।
ব্যাগের মধ্যে চার হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে তেজগাঁওয়ের ফুটপাত ধরে হাঁকিয়ে পা ফেলছি।হঠাৎ অপ্সরা ফোন দিয়ে বলল, আমি দেখা করব।কোথায় তুমি? আমি কাঁপা গলায় উত্তর দিলাম, তেজগাঁও একটি জরুরী কাজে এসেছি। কাল দেখা করব।অপ্সরা উঁচু স্বরে বললো, তুমি তেজগাঁও থাকো আর চাঁদের দেশে থাকো আমার সমস্যা নেই। আমি আসতেছি। অপ্সরা জানে আমি এসব খারাপ ব্যবসার সাথে জড়িত। এটা নিয়ে একদিন অনেক ঝগড়া হয়েছিল আমাদের দুজনের। এক রাতে অপ্সরা তার এক হাতে ইয়াবা রেখে আমাকে কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিল, এই জীবনে তুমি কাকে চাও? সেদিন তার হাত থেকে ইয়াবা ফেলে দিয়ে শক্ত করে বুকের মধ্যে নিয়ে জড়িয়ে ধরে কথা দিয়েছিলাম,আমি তোমাকে চাই।আমি কখনো এই খারাপ পথে হাঁটবো না।
কিছুক্ষণ পরেই অপ্সরা আমার সামনে এসে হাজির। এসেই আমাকে কান ধরে বলল, এই যে সাহেব? কোথায় আপনার কাজ? রাতবিরেতে ঘোড়ার বদ-অভ্যাস যাবেনা বুঝি। আমি থরথর করে কাঁপছি। কাঁপা ঠোঁটে তাকে উত্তর দিলাম,লক্ষী আমার। তুমি আজকে যাও। আগামীকাল সারাদিন তোমার। এক পৃথিবী আদর দিব তোমাকে। কথা দিলাম। সে ভ্রু কুঁচকে বলল, আমার আজকেই আদর লাগবে। বাসা থেকে সব ম্যানেজ করে তবেই এসেছি। তোমার সমস্ত কাজ শেষ করে দুজনে যাবো আজ চাঁদের দেশে।আমার খদ্দর আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।কিন্তু তার জন্য দিতে পারছিনা।অপ্সরাকে কোনোভাবেই বোঝাতে পারলাম না। রাত প্রায় দুটো বেজে গেল! আমি কোন উপায় না পেয়ে চোখের ইশারা দিয়ে খদ্দর সাহেবকে পাঠিয়ে দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম ফুটপাত ধরে।
ল্যাম্পপোস্টের আধো আলোতে আজকে অপ্সরাকে আরো বেশী সুন্দর লাগছে। আকাশে আজ চাঁদ ঝলঝল করছে। অপ্সরা ছেলেমানুষী করতে করতে ফুটপাত ধরে ছোট ছোট পায়ে দৌড়াচ্ছে। আমি পিছন থেকে এক মায়াবিনী নারীকে দেখছি। ভাবতে ভাবতে ভবঘুরে চলে গেলাম কিছু সময়ের জন্য। এই পাগলীটা এত কেন আমাকে ভালবাসে?আর যাইহোক, এক জীবনে আর এমন পাগল কিসিমের মেয়ে পাবনা আমি। প্রশান্তি এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ মেলতেই দেখি তল্লাশি চালাচ্ছে র্যাব। আমি কোন কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অপ্সরাকে পিছন থেকে ডাক দিয়েই দৌড় দিতে বললাম। অপ্সরা হয়ত বুঝতে পেরেছিল খারাপ কোন কিছু হতে যাচ্ছে। তাই অপ্সরা পিছন পিছন দৌড় শুরু করলো আমার। কালো ব্যাটেলিয়ান পোশাক পরা সাহেবরা বুঝতে পেরে গুলি ছুড়তে ছুড়তে আমাদের পিছু নিল। আমি মোড় ঘুরে ছোট কুড়ে ঘরে ঢুকতেই এক মায়াবীনি নারীর চিৎকার শুনতে পেলাম। গুলির শব্দ।চারদিক নৈঃশব্দে পরিণত হলো।গাছের ডালে বসে থাকা পাখিগুলো ডানা মেলে শহর ছেড়ে পালালো।আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কুরেঘরের ফাঁক দিয়ে দেখতে পাচ্ছি কয়েকজন কালো ব্যাটেলিয়ান পোশাকধারী মানুষ আমার অপ্সরাকে টেনে টেনে গাড়িতে উঠাচ্ছে। রাস্তার মধ্যে পড়ে থাকা মানবীক রক্তগুলো আমার দিকে প্রহসনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে। আমি চিৎকার দিতে গিয়েও দিতে পারছিনা।
ভোর হতে না হতেই টেলিভিশনের পর্দায় ইয়াবা ব্যবসায়ী অজ্ঞাতনামা এক নারীর মুখ দেখানো শুরু করল তারা। দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায়, অপ্সরার ছবি দিয়ে বড় বড় করে লিখে ছাপালো তারা, ইয়াবা ব্যবসায়ী নারী র্যাবের গুলিতে নিহত। সমাজের সবাই তাকে ছিঃছিঃ বলে দেশের কলঙ্ক বলতে থাকলো। হয়তো টেলিভিশনের পর্দায় অপ্সরার বাবা তাকে দেখেও দেখেননি। হয়তো অপ্সরার মা চোখ ভিজিয়ে কাটিয়ে দিবে কয়েক মাস। আমার নির্দোষ অপ্সরা দেশের শত্রু হয়ে বিদায় নিল।সবাই তো জানে না যে, আমার অপ্সরা নির্দোষ। সে দেশের কলঙ্ক ছিল না। সে দেশের শত্রু ছিল না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
