কন্যা বললো, কাল্পনিক সংখ্যা কী, বাবা?
আমি বললাম, বাস্তব নয় যেসব সংখ্যা। তুমি এবার বলো, বাস্তব সংখ্যা কী?
— 1, 0, −7, 8.62, 4/5, √2-এর মতো সংখ্যা হচ্ছে বাস্তব সংখ্যা, কারণ এদের সাহায্যে আমরা বিভিন্ন বাস্তব জিনিসের পরিমাণ নির্দেশ করতে পরি।
— ব্যাখ্যা করো।
— উদাহরণস্বরূপ, আমরা বলতে পারি, গোয়ালে 1টি গরু, পকেটে 0 টাকা (অর্থাৎ কোনো টাকা নেই), ব্যাংক হিসেবে নীট −7 টাকা (অর্থাৎ ব্যাংকের নিকট 7 টাকা দেনা), 8.62 মিটার চওড়া রাস্তা, একটি রুটির 5 ভাগের 4 ভাগ, 1 মিটার বাহুবিশিষ্ট বর্গক্ষেত্রের কর্ণের দৈর্ঘ্য √2 মিটার ইত্যাদি।
— চমৎকার বর্ণনা করেছ।
— তাহলে কাল্পনিক সংখ্যা কি কাল্পনিক জিনিস নির্দেশ করার জন্য?
— দেখা যাক ব্যাপারটি। (+3)-এর বর্গ কত?
— (+3)^2 = (+3) × (+3) = +9
— (−3)-এর বর্গ কত?
— (−3)^2 = (−3) × (−3) = +9
— (০)-এর বর্গ কত?
— (০)^2 = (০) × (০) = ০
— তার মানে, বাস্তব সংখ্যার উপর গাণিতিক প্রক্রিয়ার নিয়মাবলি থেকে আমরা দেখি, যেকোনো বাস্তব সংখ্যাকে তার নিজের সঙ্গে গুণ করলে, অর্থাৎ সংখ্যাটিকে বর্গ করলে, ফলাফল কখনও ঋণাত্মক হয় না, তাই নয় কি?
— জ্বি।
— স্বাভাবিকভাবে এমন কোনো সংখ্যা পাওয়া যাবে কি যাকে বর্গ করলে ফলাফল ঋণাত্মক হতে পারে?
— না, এ অসম্ভব!
— মনে করো, আমার কাছে কিছু-সংখ্যক আম আছে যে সংখ্যাটিকে তার নিজের সঙ্গে গুণ করে 4 যোগ করলে ফলাফল হয় 3। আমার কাছে তাহলে কয়টি আম আছে?
— মনে করি, আমের সংখ্যা x। তাহলে x-এর জন্য নিচের সমীকরণটি পাওয়া গেল x^2 + 4 = 3। সমীকরণটির সমাধান হবে
x^2 = 3 − 4
⇒ x^2 = −1
এরকম আম তো অসম্ভব, বাবা!
— প্রথম দিককার গণিতবিদদের নিকটও এই ধরণের সমীকরণ ছিল অবাস্তব, কারণ তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না, এমন কোন সংখ্যা আছে যাকে বর্গ করলে ফল ঋণাত্মক হতে পারে। ফলে তাঁরা সমীকরণের সহগ রাশির উপর কিছু শর্ত প্রয়োগ করে দিতেন যাতে গ্রন্থ রচনায় কিংবা আলোচনায় এরকম সমীকরণ সৃষ্টি না হয়। ঘটনাক্রমে যদি এসেই পড়ত, তাহলে অবাস্তব অসম্ভব উদ্ভট প্রভৃতি বলে এদের তাঁরা এড়িয়ে যেতেন।
— তারপর কী হলো?
— মধ্যযুগে ইতালির কিছু গণিতবিদ, হিয়েরোনিমো কারদানো ও রাফায়েল বম্বেললি তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বিষয়টি নিয়ে আরেকটু ভাবতে লাগলেন।
x^2 = −1
⇒ x = √−1
তাঁরাও বুঝতে পারছিলেন না √−1 আসলে কীরকম সংখ্যা, কিন্তু তাঁরা দেখলেন যে, উচ্চঘাতী সমীকরণ সমাধান প্রক্রিয়ায় মধ্যবর্তী ধাপে √−1 জাতীয় সংখ্যা প্রায়ই আসছে এবং উদ্ভট হলেও এদের উপেক্ষা না করে কাজ চালিয়ে গেলে চূড়ান্ত পর্যায়ে সমীকরণের সঠিক এবং বাস্তব সমাধান পাওয়া যাচ্ছে। অবশ্য বানানো সমীকরণের সমাধান ছাড়া বাস্তব জগতে এদের প্রয়োগ কী হবে, এ ব্যাপারে তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন না। তখনকার পরিচিত বাস্তব সংখ্যার বিপরীতে এরা অসম্ভব ও গোলমেলে দেখে গণিতবিদ রেনে ডেকার্ত অবজ্ঞার্থে এদের নাম দিলেন কাল্পনিক সংখ্যা, ফলে আজও এদের এই নামে আমরা অভিহিত করি।
— তাহলে, বাবা, কাল্পনিক সংখ্যা হচ্ছে নিছক সমীকরণের সহগ বিভ্রাটের বলে সৃষ্ট সংখ্যা?
—ব্যাপারটি শুধু এরকম হলে সত্যিই কাল্পনিক বলে এদের উড়িয়ে দেয়া যেত। কিন্তু আজকে আমরা জানি, তথাকথিত কাল্পনিক এই সংখ্যারাও বাস্তব জগতের অনেক রাশিকে সফল ও সহজভাবে প্রকাশ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বৈদ্যুতিক বর্তনীর ভেতর যে এসি তড়িৎ প্রবাহিত হয়, কাল্পনিক সংখ্যার সাহায্যে এদের খুব সহজে নির্দেশ করা যায়, হিসেবনিকেশ করা যায় বিভিন্ন বর্তনী থেকে জড়ো হওয়া বা ছড়িয়ে পড়া তড়িতের উপর। অর্থাৎ 0, 1, √2 প্রভৃতির মতো √−1, √−2 এসব সংখ্যাও জগতের বাস্তবতা নির্দেশ করতে পারে, নামে অবাস্তব বা কাল্পনিক হলেও।
— তাহলে কাল্পনিক সংখ্যা ঠিক কাল্পনিক নয়!
— ঠিক ধরেছ। কাল্পনিক সংখ্যারা প্রায়োগিক দিক থেকে 1, 0, −7, 8.62, 4/5, √2 থেকে ভিন্ন তো নয়ই, বরং বাস্তব জগতকে প্রকাশে এদের ক্ষমতা আরও অনেক বেশি। অথচ বাস্তবতাকে নির্দেশ করতে পারলেও √−2 কাল্পনিক! কেন? 2টি মেষ আর সংখ্যা 2-এর মধ্যে কী পার্থক্য? আরেক দিন আমরা বিশদ আলোচনা করব গণিতের নিগূঢ় এই বিষয়গুলো: গণিতশাস্ত্র কি মানুষের উদ্ভাবন না আবিষ্কার, গণিতের মূল স্বরূপ কী, গণিতের দর্শন কী।
লেখকের প্রকাশিতব্য গণিত গল্প-নাটক গ্রন্থ "ভয়ংকর সারাসিন জাদু"-এর পাতা থেকে, কিছুটা পরিবর্তিত
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুলাই, ২০১৮ দুপুর ২:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


