somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিয়ে হয় শোনা যায় না বিয়ের গীত!

২৩ শে এপ্রিল, ২০১৫ রাত ১১:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যদিও দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে এখনও মেয়েলী গীত চলে বিয়ের আসরে কিন্তু শহর এলাকায় বিলুপ্তির পথে। সাধারণত: সামাজিক এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানে মেয়েলী গীত দলবেধে মহিলারা গায়। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমাদের সে ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। আমরা ১৫ থেকে ২০ বছর আগে দেখেছি, কোন বাড়িতে বিয়ে হলে মহিলারা দলবেধে সারা রাত গীত গাইতো। শুনতেও খুব মজা লাগতো। মাঝে-মধ্যে সেখানে আমরা যেতাম। দেখতাম তাদের আনন্দ। এখনও যে, মেয়েলী গীত নেই তা নয়। তবে তা চোখে পড়ার মত নয়। কারণ, আধুনিক যুগের মেয়েরা সেসব গীত পছন্দ করে না বললেই চলে। তারা পছন্দ করে নাচতে। ব্যন্ড সংগীতের তালে তালে নাচকে খুবই ভালবাসে।
বিয়ের আসরেই বর-যাত্রী বা ডুলিবিবিরা আসলেই কনের পক্ষের মেয়েরা দলবেধে গাইতো,
“ডুলিবিবি আইসাছে পান খাইবার লালচে।“
যখন কনে বা বরকে কিছু খাওয়ানো হতো তখন বলতো,
“বসবো না, বসবো না, ছিঁড়া ছোপে আমরা বসবো নারে,
আরশের বাবা কি জানে নারে।“
শালিকারা গাইতো, “দুলা ভাই গিয়েছে শহরে, আনবে নাকের নথরে, সেই নথ নাকে দিয়ে নাক ঘুরিয়ে নাচবো রে।“
মাঝে মধ্যে গীত গাইতে গাইতে নাচতো মহিলারা। আর কয়েক বছর পর হয়ত মেয়েলী গীত হারিয়ে যেতে পারে বাংলার ঘর থেকে। কারণ, এখনকার মেয়েরা পশ্চিমা কালচারের বিশ্বাসী। পশ্চিমা ঢঙে সাজতে পেলে তরুণদের নাকি বেশি আকৃষ্ট করা যায়। সে জন্য এখন অতীতকে আর কেউ আঁকড়ে ধরে রাখতে চাচ্ছে না। গীতের পরিবর্তে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান পরিবেশন করে বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।
অথচ মেয়েলী গীতের সুর এত করুণ ও আবেগধর্মী যে, কেউ শুনলে সে গীতের কথা ভূলতে পারে না। জেলা শহরে বিয়ে হলেই ব্যন্ড দলকে ভাড়া করে নেওয়া হয়। এতে ব্যয়ও বেশি। কিন্তু গ্রামের সহজ-সরল মেয়েদেরকে ভাড়া করা হয় না। তাদের চাওয়া পাওয়াও খুব বেশি নয়। তাদের দু’ চার টাকা দিলেই তারা খুশি থাকে।
বিয়ের ৪ থেকে ৫ দিন আগেই চলতো বিয়ের গীত। সারা রাত গীত শুনেই ভালই মজা পাওয়া যেত। ঢেঁকিতে ধান ভাঙার সময় জুড়ে দিতো বিভিন্ন ধরনের গীত। ধান ভাঙার পর বর বা কনের জন্য তৈরী করতো ঐতিহ্যবাহী খাবার যাকে বলা হতো ‘থুবড়া’ । ধুবড়া’র তালিকায় রাখতো রসগোল্লা,অন্ধাসা, ক্ষীর, ফিরনী এবং ভাপা পিঠা। আদর করে কনে এবং বরকে খাওয়ানোর সময় জুড়ে দিতো গীত। পাশ্ববর্তী গ্রাম থেকে শোনা যেত বিয়ের গীত। ওই গীত এতো মধুর ছিল যার কথা ভুলা যায় না। বরের আগমন,কনেকে গোসল করা, কনেকে বিদোয়ের বেলা যেসব গীত গাওয়া হতো তা এখনও মানুষের মন-প্রাণকে আকুল করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা হারিয়ে যেতে বসেছে। আমাদের শ্রদ্ধা কমে গেছে ঐতিহ্যের প্রতি। তবে একটা কথা না বলে পারছি না যে, ব্যন্ড তারকাদের সাথে সুন্দরীরা তালে তালে নাচলেও তেমন মজা লাগে না। কিন্তু তারপরেও কেন সেটা গ্রাম ও শহরের মানুষ বেশি উপভোগ করছে? আমার মনে হচ্ছে,ব্যাণ্ড সংগীতের তালে তালে নাচ দেখে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তারচেয়ে শত গুণে বেশি আনন্দ পাওয়া যেত মেয়েদের কণ্ঠে বিয়ের গীত শুনে। ধীরে-ধীরে সে ঐতিহ্য ধব্বংস হচ্ছে সে দিকে কারো খেয়াল নেই।
নারীদের হৃদয়ের আবেগ-উৎকন্ঠা, দুৰখ-কষ্ট, হাসি–কান্না, আনন্দ-বিরহের প্রকাশ ঘটে বিয়ের গীতে । সাধারণত কয়েকজন বিভিন্ন বয়েসের নারী গোল হয়ে এক সাথে বসে খালি গলায় বিয়ের গীত পরিবেশন করত। গ্রামের বিয়েতে বিশেষ করে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য ‘গীত গাওয়ানি’ মধ্যবয়সী মহিলাদের ডাক পড়ত। অথচ তাদের অধিকাংশ ছিল নিরক্ষর । সুরও তারাই দিতো । বিয়ের গীত সমূহ গীত গাওয়ানি’রা বংশক্রমে নিজেরা সহজে আয়ত্ত্ব করতো। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, “কন্যা ডাক দেও তোর জননী না মাইরে/মাও দিয়া যাওক সোনা মুখে হলদিরে/হলুদা, ডাক দেও তোর জনমদাতা বাপেরে/বাবা দিয়ে যাউক তোর সোনা মুখে হলদিরে।“ বোনেরা গাইত, “হামার ভাইয়ের হলদি মাখিবার, মনে নাহি ছিলরে/জোর বেজোর হলদি মাখলে, জোনাকু শালার বহিনরে।“
বর বা কনেকে থুবড়া হিসেবে ক্ষীর খাওয়ার সময় দল বেঁধে মহিলারা গাইত, “আলুয়ার চালে কাঞ্চন দুধে ক্ষীরোয়া পাকালাম, সেই না ক্ষীরোয়া খেতে গরমি লেগেছে। কোথায় আছ বড়ভাবি পাক্কা হিলোয়রে।“
বিয়ে শেষে নিজ বাড়িতে ফিরে আসার সময় বরের প্রতি লক্ষ্য করে গীত গাইত, “কী গহনা আনিছেন দুলা মিয়া দেখানতো হামাকে / সবই জিনিসি আনিছি গুলজান বিবি নথুয়া ছারিছি দেশে।“
বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সময় কনেকে হাজার স্মৃতি, বেদনা ভুলে যেতে হচ্ছে । যেতে হচ্ছে নতুন বাড়িতে । গুছিয়ে নিতে হবে সংসার । তখন গীতের মাধ্যমে বলত, “মন বিন্দাইলাম বনে বনে, আরো কান্দন কান্দে গো মায়-ও বনে বনে/ আরো কান্দন কান্দে গো মায়-ও নিরলে বসিয়া।“ এ ধরনের অসংখ্য বিয়ের গীত মা-বোনেরা মুখস্ত করে রাখতো । বর্তমান সময়ের মহিলারা এ ধরনের বিয়ের গীত আর চর্চা করে না। অনেকের জানা বিয়ের গীত সমূহ ভুলে গেছে। ফলে ‘গীত গাওয়ানি’দের কদর কমে গেছে সমাজে। আধুনিকতার যান্ত্রিক যুগে ধনাঢ়্য পরিবারে বিয়ের আয়োজন করা হলে লক্ষ্য লক্ষ্য টাকা দিয়ে ভাড়া করা ব্যণ্ড দল। তারা বিভিন্ন মিউজিক বাজিয়ে আধুনিক গান পরিবেশন করে। আর যারা গরিব মানুষ তারাও বিয়ের আসরে বিয়ের গীতের আয়োজন করে না। তারা সাউণ্ডবক্স ভাড়া করে গান জুড়ে দেয়। সে গানের তালে তালে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা নাচে।
আমাদের লোকজ ঐতিহ্য আমাদের রক্ষা করা উচিত। আমরা বাঙালি। আমরা যতই পশ্চিমা বিশ্বের ঐতিহ্যকে লালন করি না কেন আমরা বাঙালি। আমাদের ঐতিহ্যকে আমরা সহজেই হারাতে পারি না।


লেখক-
আজমাল হোসেন মামুন
সহকারী শিক্ষক, হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×