somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আঙ্গুল

১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সমগ্র পৃথিবী যখন আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবিশ্রান্ত অগ্রগতির সহিত তাল মিলাইয়া আত্মোন্নতির উপায় অনুসন্ধানে ব্যস্ত, তখন আমাদের বঙ্গদেশে কতিপয় মহাশয় যে আপন হস্তের পঞ্চ আঙ্গুলের একটিকে কতজনের পশ্চাৎদেশে প্রবিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন, তাহার হিসাব লইতে বসিলে বোধ করি, গণিতশাস্ত্রেরও পরাভব ঘটিবে।বিষয়টি ঘৃণাজনক হইলেও ইহাতে তাঁহাদের পরমানন্দের সীমা নাই। পরের পশ্চাৎদেশে আঙ্গুল প্রবিষ্ট করিয়া কেহ কামড়াইতেছেন, কেহ বা চাটিয়া চলিয়াছেন; আর এই মহৎ কর্মে আত্মনিয়োগ করিয়া তাঁহারা এমনই পুলকিত যে, জগৎসংসারের অন্য সমস্ত কর্তব্য তাঁহাদের নিকট তুচ্ছ বলিয়া প্রতীয়মান হয়।
একবার যদি তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করি,“মহাশয়! বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিকগণের সাহিত্যসাধনা হইতে কি অর্জন করিলেন ? জাতির উন্নতিকল্পে আপনাদের অবদানই বা কী?” অমনি তাঁহারা চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া, মুখমণ্ডলে ঘোরতর বিস্ময়ের ভাব ফুটাইয়া বলিবেন“হায়! এ যে সাক্ষাৎ সাহিত্যবিরোধিতা! সাহিত্য আমাদের প্রাণ, সাহিত্য আমাদের বাঁচিয়া থাকিবার অবলম্বন; সাহিত্য ব্যতীত জাতির অস্তিত্বই বা কোথায়? আহা, কী অপূর্ব বাগ্মিতা! কী অপরিসীম সাহিত্যপ্রীতি! কিন্তু মহাশয়, আমার জিজ্ঞাসা তাহা নহে। সাহিত্য আপনাদের প্রাণ কি না, তাহা লইয়া আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নাই। আমার প্রশ্ন এই যে, আপনারা জাতির জন্য করিয়াছেন কী? আপনাদের নিকট হইতে জাতি কী প্রাপ্ত হইল? পরস্পরের সহিত কলহ, বিবাদ, কুৎসা ও ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ব্যতীত আপনাদের অবদান আর কী?
তদুপরি, সেই বিবাদও নিজের কোনো আবিষ্কার, নিজস্ব কোনো মতবাদ কিংবা স্বকৃত কোনো কর্মের ফল নহে; অপরের বিষয় লইয়া, অপরের কীর্তি লইয়া, অপরের জীবন ও সাহিত্য লইয়া আপনাদের এই নিরবচ্ছিন্ন কোলাহল!
স্বহস্তে কিছু সৃষ্টি করিয়া, নূতন কোনো তত্ত্ব আবিষ্কার করিয়া, কিংবা সমাজের কল্যাণার্থে কোনো কার্য সম্পাদন করিয়া যদি আপনারা তদ্বিষয়ে তর্ক-বিতর্কে প্রবৃত্ত হইতেন, তাহা হইলে না হয় বলিতাম যাক, মহাশয় অন্তত কিছু একটা করিয়াছেন। তাঁহার বক্তব্যে ভ্রান্তি থাকিলে তাহা সংশোধন করা যাইবে; তাঁহার আবিষ্কারে ত্রুটি থাকিলে তাহা নির্দেশ করা যাইবে। এইরূপ বিতর্কের দ্বারা সত্যের অন্বেষণ হইতে পারে, জ্ঞানের প্রসার হইতে পারে, জাতিরও কল্যাণ সাধিত হইতে পারে।
কিন্তু যাঁহারা নিজেরা একটি তৃণও উৎপাদন করিতে অক্ষম, তাঁহারাই অপরের রোপিত মহীরুহের শাখা-প্রশাখা লইয়া দিনরাত্রি কাড়াকাড়ি করিতেছেন! কেহ এক দিকে টানিতেছেন, কেহ অন্য দিকে; কেহ বলিতেছেন, ইহা আমার, কেহ বলিতেছেন, না, ইহা আমার প্রতিপক্ষের। অথচ বৃক্ষরোপণ করিবার সময়ে তাঁহাদের একজনকেও কোথাও দেখা যায় নাই।
যে স্থানে আপনারা আঙ্গুল প্রবিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন, অনুগ্রহপূর্বক সেখান হইতে আঙ্গুলখানি বাহির করুন। কারণ, যাঁহাদের লইয়া আপনাদের এত বিবাদ, তাঁহারা আপন আপন কর্ম সম্পাদন করিয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের সৃষ্টি তাঁহাদের সৃষ্টিই থাকিবে; আপনাদের চিৎকারে তাহার প্রকৃতি পরিবর্তিত হইবে না। তাঁহাদের রচনা পাঠ করুন। অধ্যয়ন করুন। তাহা হইতে জ্ঞান আহরণ করুন, শিক্ষা গ্রহণ করুন, নিজেদের চিন্তাশক্তিকে শাণিত করুন। ভালো না লাগিলে, যুক্তিসহকারে তাহা প্রত্যাখ্যান করুন। কাহারও সাহিত্যকর্মের সমালোচনা করিতে কেহ নিষেধ করে নাই। বরং যুক্তিপূর্ণ সমালোচনা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করিতে পারে। কিন্তু সমালোচনার নামে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, নীচতা ও কদর্যতাকে সাহিত্যের আসনে প্রতিষ্ঠিত করিবার এই দুরভিসন্ধি কেন? মতের বিরোধ থাকিলেই কি মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিতে হইবে? সাহিত্যিকের রচনার বিরোধিতা করিতে গিয়া সাহিত্যিকের ব্যক্তিসত্তাকে পদদলিত করিতে হইবে কেন?আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে ইহা বোধগম্য হয় না যে, পৃথিবীর আর কোন্ দেশে মনুষ্য আপন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদিগকে লইয়া এমন কুৎসিত ক্রীড়ায় মত্ত হয়। সমালোচনা সর্বত্রই আছে, মতভেদও সর্বত্রই আছে; কিন্তু তাহাকে এমন নোংরামির পর্যায়ে নামাইয়া আনিবার প্রয়োজন কী? জাতির মনীষীগণ আমাদের জন্য যাহা রাখিয়া গিয়াছেন, তাহা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করাই কি শ্রেয় নহে? তাঁহাদের ভুল থাকিলে তাহা নির্দেশ করুন; তাঁহাদের সীমাবদ্ধতা থাকিলে তাহা আলোচনা করুন; তাঁহাদের চিন্তাধারার সহিত দ্বিমত থাকিলে নিজের যুক্তি উপস্থাপন করুন। কিন্তু তাঁহাদের উত্তরাধিকারকে উপলক্ষ্য করিয়া নিজেদের হীন ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার বাজার বসাইবেন না। পরের পশ্চাৎদেশে আঙ্গুল প্রবিষ্ট করিয়া রাখিলে নিজের হস্তের উন্নতি হয় না; বরং আঙ্গুলেরই অপচয় ঘটে!
পরিশেষে, এক কবির কণ্ঠে যেন সমগ্র মৃত সাহিত্যিকসমাজের পক্ষ হইতে এক অসহায় আর্তনাদ ধ্বনিত হইতেছে,

“আমি তো মরিয়া গিয়াছি, বাছা,
কোথায় পাইবে মোর পাছা?
তবু কেন, হে অর্বাচীন,
বারে বারে দাও আঙ্গুল?”


সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩০
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এ আগুন আপনাদেরও একদিন গ্রাস করবে।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১৩


আজ যারা ধর্ম, জাতীয়তা ইত্যাদির ভিত্তিতে ও তাঁর কথিত “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা”, “মুসলিম বিদ্বেষী” সহ নানা মিথ্যা অভিযোগ আর অজুহাতে রবীন্দ্রনাথ বিদ্বেষের ব্যাপারে চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি ও ইতরামি দেখিয়ে বেড়াচ্ছে তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাটায় - পুটায় ঘষাঘষি, মাঝখানে মরিচদের জীবন শেষ?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩১

আওয়ামী তথা ভারতীয়দের নমস্য রবী বাবুর চিত্রে কালিমা লেপন।
দুই দিন পরে, আওয়ামী বিরোধীদের 'রবী' ইউনুস সাহেবকে গালাগালি!!!
এ যেন পাটাপুটায় ঘষাঘষি করে অভাগা মরিচদের জীবন শেষ করার চেষ্টা?
কিন্তু, রবী বাবু কিংবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা প্রেমিকদের কলমে সময়ের বিবেক : বিশ্ব কবি রবিন্দ্র নাথ ঠাকুরের গ্রাফিতেতে কালী লেপন প্রসঙ্গ

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৩৪


যে কবির গানে ভোরের আকাশ জেগে ওঠে প্রতিদিন
যাঁর সুরে আজও অশ্রু ঝরে হাসে হৃদয় রঙিন
সেই রবীন্দ্রনাথের ছবির বুকে কালি মাখায় যারা
তারা কি জানে তাঁরই গানে বাঙালির প্রাণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাসূল (সা.), আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের (রা.) অনুচিত কাজের সমালোচনা ও সমর্থন করা যাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৪১




সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

রঠার মুসলিম বিদ্বেষ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১৮



রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর সংক্ষেপে রঠা এর ছোট গল্প "রীতিমত নভেল" এ রঠা মুসলমান শব্দের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘যবন’। যবন অর্থ অসভ্য, ম্লেচ্ছ, অপবিত্র, বর্বর জাতি, যেকোনো বিদেশি ইত্যাদি ইত্যাদি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×