অতীতের সেই সোনাঝরা দিনগুলিকে খুব খুব মনে পড়ে, যখন মনের আনন্দে বেড়াতাম এখান হতে ওখানে। এ জেলা হতে অন্য জেলায়।পাহাড়ে-পর্বতে, গহীন অরণ্যে, নদীতে-সাগরে-ঝর্ণায়! আহ্! কি নস্টালজিক ছিল সেই দিনগুলি! অতীতের সেই সময়ের কথা মনে এলে হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠে। আফসোস! সময়ের দিক বদলে এখন আর তেমন সুযোগ আর পাই-না বললেই চলে। তবে,চলমান ব্যস্ত সময়ে যখনই সংক্ষিপ্ত পরিসরে কোন বেড়ানোর সুযোগ পাই, সেটা কাজে লাগানোর চেষ্ঠা করি। আজ আপনাদের এমনই একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেব- এটা কিন্তু কোন গল্প নয়!
৩১ আগস্ট দুপুর ১২ঃ ২৫ টা এইমাত্র বিরামহীন ম্যারাথন চার চারটি হার্ড সাবজেক্ট পাঠদান শেষে শিক্ষক রেস্টরুমে বসলাম।গলা শুঁকিয়ে কাঠ! ভিষম তেষ্ঠা পেয়েছে। পানি পান করছি, হঠাৎ পিয়ন এসে খবর দিল অধ্যক্ষ মহোদয় সালাম দিয়েছেন। সালাম দিয়ে প্রবেশ করলাম। প্রিন্সিপ্যাল বললেন জরুরী কাজে ঢাকায় যেতে হবে, যেতে পারবেন? আমি রাজি হয়ে গেলাম। বললাম যাব। তিনি বললেন ক্লাস শেষে অফিস থেকে টাকা নিয়ে যাবেন আর সাথে দিক নির্দেশনা। আমি সালাম দিয়ে ফিরে গেলাম।
ছবিঃ ইকো পার্ক, বাঁশখালী,চট্টগ্রাম। এখন শুধুই অতীত; কারণ, বেচারা কানা রাজনীতির শিকার!

বাসায় ফিরে খাওয়া দাওয়া বিশ্রাম শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে বাড়ি হতে বের হলাম। খুব কাছেই ডিসট্রিক্ট কানেকটিং সড়ক। একটা সিএনজি দিয়ে উপজেলা সদরে নেমে সেখান থেকে আরেকটা সিএনজিতে আরোহন করলাম। বলে রাখা ভালো এটা দক্ষিণ চট্টলার বাঁশখালী উপজেলা। এখান থেকে সন্ধ্যা সাতটার পর কোন বাস চাঁটগা যায় না। একান্তই যদি সন্ধ্যার পর বন্দর নগরী যেতেই হয়, তবে আপনাকে সিএনজিতে করেই যেতে হবে। এই উপজেলায় বাংলাদেশের অন্য কোন উপজেলার বাস প্রবেশ করেনা। শুধুমাত্র বাঁশখালী টু চাঁটগাঁ এবং চাঁটগাঁ টু বাঁশখালী। আর, হ্যাঁ বাঁশখালী স্পেশাল নামক কুখ্যাত বাস সার্ভিস ছাড়া আর কোন ধরণের বাস বা মাইক্রোবাস সার্ভিস এখানে চলাচল করেনা। বলতে পারেন এই বাঁশখালী স্পেশালটি এক্কেবারে ত্যাক্ত বিরক্ত করাইন্যা মার্কা বাস সার্ভিস(সাফারিং)।
যাইহোক, সেই সিএনজির মাধ্যমে রাত সাড়ে নয়টায় চাঁটগাঁ শহরে পৌঁছুলাম।
ছবিঃ দেশের প্রথম কেবল স্ট্রেইড ব্রিজ, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর উপর শাহ আমানত সেতু।

চাঁটগাঁ হলো আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা। শহরে পৌঁছেই সোজা রেল স্টেশনে গেলাম। বলে রাখি আমি শৈশব হতেই ট্রেইন ভ্রমণকে খুব খুব ভালবাসি। বাসযাত্রা বরাবরই আমার কাছে মহা বিরক্তির মনে হয়। তাই, ট্রেইন স্টেশনে গিয়ে প্রথমেই খোঁজ নিলাম ঢাকাগামী তূর্ণানিশীতায় আসন পাওয়া যায় কী না? কিন্তু, আফসোস! আসন নেই, সব বুক্ড!(যদিও দালালদের হাতে পাওয়া যাচ্ছে অনেক চড়া দামে, আমি সেই চেষ্ঠা চালাইনি) তারপর একবার ভাবলাম রাত সাড়ে দশটায় ঢাকাগামী চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেইনেই যাব কি যাব না? মনটা খুব উশখুশ করছিল ট্রেইনেই যাবার জন্য।
হ্যাঁ, যেতাম তবে, সকাল নয়টার মধ্যেই আমাকে আমার গন্তব্যে পৌঁছে নির্দিষ্ট অফিসারের কাছে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। তাই, মেইল ট্রেনে যাওয়া বাদ দিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম ভালো না লাগলেও বাসেই যাব। সময় বাঁচানোটাই আসল কথা।বাস ঢাকা পৌঁছুবে ভোর ৫টায় আর ট্রেন পৌঁছুবে সকাল ৭টা বা আটটায়। তাছাড়া এরপর দিন আবার জামা'তের ডাকা হরতাল কর্মসূচী রয়েছে।ঐ হরতাল যদি আমার গন্তব্যে বাঁধা হয় আর ,দেরীতে ঢাকায় পৌছার কারণে অফিসে যেতে দেরী হয় তবে, বসের গালমন্দ শুনতে হবে। সুতরাং ট্রেনে না গিয়ে বাসেই টিকেট কাটলাম ৪৮০টাকা দিয়ে। ইউনিক বাসে চড়লাম। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে নন-এসি এই বাসটির সেবা প্রশ্নাতীত রকমের ভালো। কিন্তু, ভবিষ্যত কি কেউ বলতে পারে?
তাই, যা হওয়ার তাই হলো-
গতস্য সূচনা নাস্তি!
৫ঘন্টার বাস জার্ণি ১১ ঘন্টায় গিয়ে শেষ হলো! অবশেষে শেষ হলো? বহু প্রতিক্ষিত চার লেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের এ কি হাল!আল্লাহ, আমাদের এ দেশের অসহায় জনগণকে রক্ষা কর।

রাত সাড়ে দশটায় চট্টগ্রাম ছেড়ে যাওয়া আমাদের বাসটি কুমিল্লা কোটবাড়ি পৌঁছে ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে? সে কি জার্ণি!
মধ্যবর্তী এই জায়গা পৌঁছুল ছয়/সাড়ে ছয় ঘন্টায়। তারপর, আবার যাত্রা শুরু! এই যে শুরু! তার আর শেষই নেই! কোন কোন সময় সময় এমনি ভাবে থমকে যায়, যে মনে হয় আমরা সুপার গ্লুতে আটকা পড়ে গেছি মনে হতে থাকে। এই বিড়ম্বনার যেন কোন সমাপ্তিই নেই। চলতে চলতে এইযে থেমে যাওয়া, কেন হচ্ছে? তার কারণ ও জানা যাচ্ছেনা।
জ্যাম ছোটার পর কিসের জন্য বা কোন স্থানে এটা সংগঠিত হলো তা আর জানা যাচ্ছিলনা। কারণ, রাস্তায় কোন আলামতই নেই এই অনাকাংক্ষিত জ্যামের! আশ্চর্য! তাহলে, কি হচ্ছিল? সত্যিই বুঝার কিছুই নেই।
অবশ্য চলতে চলতে এই বুঝ পেয়েছি নিজ থেকেই যার উত্তর হয়ত আমার জানাই ছিল!
আমরা বাঙ্গালীরা কোন দিনই হয়তো শুধরাবোনা যদি না আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাবটাই না বদলাই।
সকাল নয়টা ৩০ মিনিটে ঢাকা প্রবেশ করি। পা-দুটো ফুলে গেছে ভিষম রকমের। হাঁটতে কষ্টই হচ্ছিল। যাক অবশেষে দেরীতে পৌঁছাই আমার গন্তব্যে। যা, আমি আগেই অধ্যক্ষ মহোদয়কে জানাই। যাক, আর তেমন সমস্যা হয়নাই। যদিও, টিপিক্যাল বাংলাদশী সরকারী অফিসারদের খাম-খেয়ালীপনার কারণে সময় মত কাজটা হয়নাই। এবং আফসোসের বিষয় এই একই বিষয় নিয়ে আবার হয়তো ঢাকা আসতে হবে।
এখান থেকে বের হয়ে কি করব কি করব ভাবছি। অবশ্য ঢাকায় যেহেতু এসেছি তাহলে একটু ঘুরে ফিরেই যাই। তাই, সময়ের সদ্ব্যবহারটাও করলাম। অনেক অনেক দিন পর ঢাকায় এসেছি বলে পথঘাট একটু একটু অচেনা অচেনা মনে হচ্ছিল। আর, তাই না হেঁটে রিকসায় চড়ে এখানে ওখানে গেলাম। প্রথমেই ঢাকা ভার্সিটির আশপাশ ঘুরলমা। পুরাতন বই পুস্তক ক্রয় বিক্রয় হতো যেসব স্থানে সেসব স্থানে গেলাম কিন্তু হতাশ হয়েছি সেসব আর না দেখে।
টিএসসি, অপরাজেয় বাংলা ঘুরে সবশেষে গেলাম জাতীয় যাদুঘর পরিদর্শনে। আহ্! পরাণটাই জুড়িয়ে গেল! দারুণ পরিকল্পনা আর নানান বিষয় বস্তুর নতুন নতুন অভিনবত্বের কারণে এ এক নতুন রূপ দেখলাম যাদুঘরের। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি রক্ষায় যে আয়োজন দেখলাম তা দেখে আমার চক্ষু ছানাবড়া! অসাধারণ! অনন্য!

ঢাকা জাতীয় যাদুঘর পরিদর্শন উপভোগ শেষে রাত্র নয়টায় কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছুলাম। সেখানে চিরাচরিত সেই পুরণ পদ্ধতিতে টিকেট সংগ্রহ করার অভিযান! পরানটা এক্কেবারে ভাজিভাজি হয়ে গেল! লাইনে দাঁড়ালাম তীর্থের কাকের মতো। পিলপিল করে এগুচ্ছি আর এগুচ্ছি কিন্তু আমার পালা যেন আর শেষ হয়ই না। এর মাঝে ঢুকে গেল সিভিল ড্রেসে বিজিবি আর বাহিনী টিকেট কাটার জন্য। এতক্ষণ টিকেট বুকিং অফিসার আলসে ভাব দেখাচ্ছিলেন হঠাত দেখি গতি সঞ্চার উনার দেহে। তারপর উনাদেরকে নিয়ে সেকি কসরৎ! পুরাই মজা আর মজা! আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখে পুরো একঘন্টা কাবার আর আমরা রাগে দুঃখে পুড়ে কাবাব!
যাক, অনেক দুখের পর খুশি লাগলো যখন টিকেট পেলাম তূর্নানিশীতার আসন সহ। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এরপর যথারীতি অভ্যাস ও শখের বসে রেলওয়ের বুক কাউন্টার থেকে কিছু বই এবং পত্রিকা কিনলাম। কিছুক্ষণ বই ওয়ালার সাথে গল্প করলাম। কারণ, অপেক্ষা! ট্রেইন্ ঢাকা ছাড়বে হলো রাত সাড়ে এগারোটায়। সবশেষে এগারোটায় হাল্কা নাস্তা করে স্টেশন প্ল্যাটফর্মের এরিয়ায় প্রবেশ করে ওখানে আরো কিছুক্ষণ বসে ৩ নং প্ল্যাটফর্মে আমাদের ট্রেইন দাঁড়ানো ছিল তাতে চড়লাম।
** উপলব্দিঃ চারলেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে এত জ্যাম কেন?
কারণ, আমরা বাঙ্গালীরা হলাম চরম খেয়ালী আর হঠকারী। সবাই হুড়োহুড়ি বেশ পছন্দ করি। পড়িমরি ছুটি। নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভংগ করি।তাই, কোটি কোটি টাকা খরচ করে এইসব আয়োজন করা হলো তা কিন্তু কোন শুদ্ধ-স্বচ্ছ পরিকল্পনার অভাবে ভালো ভাবে কাজ করছেনা।
*** ফলাফলঃ দূর্ঘটনা ও অপমৃত্যু আর পঙ্গুত্ব! আর এসবের পিছনে যেসব বিষয় কাজ করে সেসব হলো-
*** অসুস্থ্য অভারটেকিং ম্যানিয়া!!

*** চার লেনে বিভাজ্য হলেও গাড়িগুলো ক্যাটাগোরাইজ করা নেই। অর্থাৎ যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী গাড়িগুলোর জন্য আলাদা ট্রেক ঠিক করে না দেয়া।

***জ্যাম প্যাক্ড চৌমুহনী!

*** কমগতির গাড়ি দ্রুতগতির গাড়ির মিছিলে-

*** এবং রাস্তার উভয় পাশে কার পার্কিং ও মালামাল ফেলে রেখে অনিয়মের মাধ্যমে কৃত্রিম যানঝট সৃষ্টি।
যাহোক এসবের নিশ্চয়ই সমাধান আমাদের দেশে কোনদিনই হবেনা!!
*** আশা তবু এবং সাথে দোওয়াঃ আল্লাহ্ আমাদের মতো এই অবলাদের শুভ বুদ্ধি দান করুন। আমিন।
সবাই ভালো থাকুন। সুখে থাকুন। শুরুর সাথে শেষের মিল না থাকায় মাইন্ড করবেননা!!
ছবি সংগ্রহঃ ইন্টারনেট।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০১৬ বিকাল ৪:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



