somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

১৫-২১ এপ্রিল সপ্তাহব্যাপী জাতীয় গুম উত্সব

১৯ শে এপ্রিল, ২০১৪ দুপুর ১:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো/বর্গী এলো দেশে। অষ্টাদশ শতকের অশ্বারোহী লুটেরা মারাঠা সৈন্যদলের নাম বর্গি। বলা যায় ডাকাতের প্রতিশব্দ। কিন্তু অষ্টাদশ শতকের সেই দিন আর নেই। যার কারণে বর্গী শব্দটার সঙ্গেই নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হচ্ছে। সভ্যতার(!) উত্কর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে দস্যুবৃত্তির প্যাটার্ন। গুম, খুনের জন্য আজ আর খোকা ঘুমানো কিংবা পাড়া জুড়ানোর দরকার হয় না। যখন তখন চাইলেই যাকে তাকে হাওয়া করে দেয়া যায়। লোকমুখে শুনা যায়, বহু সংখ্যক মানুষের এই হাওয়া হওয়ার পিছনে নাকি বিশেষ পোশাকের একদল সুঠামদেহীর হাত আছে। এই সুঠামদেহীদের আবার নিয়ন্ত্রণ করে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী, ব্যাপক ক্ষমতাধর এক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের হাতেই রাজদণ্ড। অবশ্য এই গুম কালচারটাকে খুব নেতিবাচকভাবে দেখারও কিছু নেই। একজন রাজা নিজের সুরক্ষার জন্য চাইলে যে কাউকে গুম করতেই পারেন। বরং রাজার নির্দেশে গুমের বিরুদ্ধে কথা বলার দায়ে লাখ খানেক মানুষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহের দায়ে হুলিয়া জারি হওয়াও অসম্ভব নয় বৈকি। যাই হোক রাজাকে সুরক্ষিত রাখা তো নাগরিকদের একান্ত কর্তব্য। কতক লোকের গুম-খুনে কিইবা যায় আসে?

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বাসায় ফেরার পথে গাড়ির চালক আনসার আলীসহ নিখোঁজ হন বিরোধীদলের এক কেন্দ্রীয় নেতা। নাম এম ইলিয়াস আলী। বাংলাদেশের জন্য মরণফাঁদ টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে নিজ এলাকায় ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করেছিলেন জাঁদরেল এ বিএনপি নেতা। ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির ঠিক একদিন আগে গত ১৬ এপ্রিল আবু বকর সিদ্দিক নামের একজন গার্মেন্ট কর্মকর্তা হঠাত্ই হাওয়ায় মিলে গেলেন। ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম দিবস হলেও বাংলাদেশে যেন ১৫-২১ এপ্রিল পালিত হয় জাতীয় গুম উত্সব। যাই হোক তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সন্ধান মিলছিল না আবু বকর সিদ্দিকের। রাতে নারায়ণগঞ্জের জামতলা এলাকার আবুল কালাম নামের এক ব্যক্তি জানালেন দুপুর বেলায় তার সামনেই জনৈক ব্যক্তিকে নীলরঙা গাড়িতে তুলে নেয় টি-শার্ট পরা কতক যুবক। নিখোঁজ আবু বকর সিদ্দিকের স্ত্রী এশিয়ার নোবেলখ্যাত ম্যাগসাইসাই পুরস্কার জয়ী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বরেণ্য এ পরিবেশ আইনজীবির স্বামীর চিন্তায় ঘুম হারাম হয় নাগরিক সমাজের। নাগরিকদের চাপে শেষ পর্যন্ত নিখোঁজের ৩৫ ঘণ্টা পর খুঁজে পাওয়া যায় নিপাট ভদ্রলোক আবু বকর সিদ্দিককে। স্বামীকে উদ্ধারে পাশে থাকার জন্য গণমাধ্যম, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রধানমন্ত্রী ও আরেক বৃহত্ রাজনৈতিক দল বিএনপি নেত্রীকে ধন্যবাদ জানান রিজওয়ানা।


জীবন সঙ্গীকে ফিরে পেয়ে এই বোনের হূদয়ের রক্তক্ষরণ কিছুটা হলেও কমেছে। কিন্তু দুই বছরেও রক্তক্ষরণ থামছে না ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনার। আবু বকর সিদ্দিকের মতো ইলিয়াস আলীও ফিরে আসবেন— এমন আশায় হয়তো এখনো বুক বেঁধে আছেন ইলিয়াস পরিবারের সদস্যরা। ভিন্নমতের রাজনীতিক ছাড়াও গুম হচ্ছেন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ছাত্র, শিক্ষক তথা নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। ফলে একটা অজানা আতঙ্কে দিন কাটছে বহু পরিবারের। যে আতঙ্কের সর্বশেষ শিকার আবু বকর সিদ্দিক। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার গত ১৫ এপ্রিল তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ৩৫ জন নাগরিক গুম হয়েছেন। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আরো ৬ জন গুম হয়েছেন অভিযোগ তাদের স্বজনদের।

আবু বকর সিদ্দিক অপহরণকারীদের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এটা অবশ্যই সুসংবাদ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গুম হওয়া শতাধিক মানুষের কথা চিন্তা করে আমি তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারছি না। তাহসিনা রুশদীর লুনার মতো আমরাও আশায় থাকবো গত ৪ বছরে গুম হওয়া ১৮৭ জনের পরিবার শিগগিরই তাদের প্রিয়জনকে ফিরে পাবেন। ১২ বছরের মেয়ে সাইয়ারা নেওয়ালকে কোলে তুলে ইলিয়াস আলী বলবেন— তোমার জন্যই আমার ফিরে আসা মামনি। আর তোমাকে আমার অপেক্ষায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে মন খারাপ করতে হবে না। এভাবেই প্রিয়জনকে মন খারাপের রাজ্য থেকে ছুটি দেবেন বহু দিন, মাস, বছর ধরে হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া মানুষেরা।

গুমরাজ্য থেকে প্রত্যাবর্তনকারী মানুষদের সঙ্গে নিয়ে আমরা একটি নিরাপদ সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে এগিয়ে যাবো। তখন আর কেউ বলবে না— ১৫ থেকে ২১ এপ্রিল বড্ড খারাপ সময়। কারণ এ সপ্তাহটা জাতীয় গুম উত্সব। সময়টা আতঙ্কের, বিভত্সতার, সভ্য সমাজে অসভ্যতা, বর্বরতা ফিরিয়ে আনার। আমরা বলবো সাইয়ারা নেওয়ালদের চোখের পানিতে আর কোনো মহাসাগর সৃষ্টি হবে না। গুম উত্সব বলে কিছু থাকবে না। কেউ কেউ হয়তো তখন ‘গুমরাজ্য বিদায় সপ্তাহ’ পালন করবেন। সবার মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হোক। নতুন করে আর একটি মানুষও যেন কোথাও হারিয়ে না যায়।
facebook.com/JournalistMesbahPatwary
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০১৪ দুপুর ২:১০
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রীবর্গের দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত নয় কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪

"হে কাবা! তুমি কতই না উত্তম, তোমার সুঘ্রাণ কতই না চমৎকার! তোমার মর্যাদা কতই না মহান! তবে সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একজন মুমিনের জান,... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পর্শে_ _ _ _ _

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০০

-কি পাও আমার মাঝে ?
-দুটি চোখ।
যেখানে আমার সর্বসুখ নিহিত,
ছমছমে সন্ধ্যা, ভয় জাগানিয়া অন্ধকার রাত,
এসব বৃথা হয়ে যায়,
তোমার একটি ছোঁয়ায়।
তোমার চোখের একটি পলক, আমার হাজার বছর,
আর কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরীচকাি ও নক্ষত্র

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:১০


মেয়েটি অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে টিস্যু পেপার দিয়ে ঠোঁটের কোণ মুছে নিল। তারপর সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে অবলীলায় বলল, "নীল, আমি প্রেগন্যান্ট!"
আমি তখন চায়ের কাপে সবেমাত্র একটা অসতর্ক চুমুক দিয়েছি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেসুরো গলায় গান গাওয়ার অপরাধে

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৯


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে

যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পপুলিস্ট দিক ও ন্যায়বিচারের দিক উভয়ই খেয়াল রাখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নীল গ্রহের শেষ প্রেম // কেয়া এবং আমি।

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৪ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯



আমি ভেসে আছি মহাশূন্যে।
আমার শরীরে রূপালী স্পেসস্যুট।
চারপাশে অসীম অন্ধকার।
আর আমার সামনে দূরে জ্বলছে এক নীলাভ-সবুজ গ্রহ—
Earth-666।
এই গ্রহেই আমার জন্ম।
এই গ্রহেই আমি প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম।
আর এই গ্রহই আমার কাছ থেকে সবকিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×