আবু লুলাহ কর্তৃক আহত হবার পর খলিফা উমর বুঝতে পারলেন যে তিনি আর বাঁচবেন না।তখন তিনি খেলাফত বিষয়ক একটি পরামর্শ কমিটি গঠন করলেন। তবে তিনি বারবার জনগণকে এই বলে হুশিয়ার করেছিলেন যে, আবু বকরকে একজনের একক সিদ্ধান্তে খলিফা করা হয়েছিল যা সঠিক পদ্ধতি ছিল না। আল্লাহ আমাদের সেই ভুল থেকে বাঁচিয়েছেন! এরকম যেন দ্বিতীয়বার করা না হয়। যদি কেউ করে তবে দু’জনকেই যেন হত্যা করা হয়। তার মানে দাড়ালো খলিফা ওমরের এই বক্তব্য অনুসারেই প্রথম খলিফা নির্বাচন পদ্ধতি সঠিক ছিল না।
অন্যদিকে খলিফা উমরের আহত হওয়ার কথা শুনে মা আয়েশা উমরকে বানী পাঠালেন,
”ইসলামী উম্মাহকে নেতাবিহীন অবস্থায় রেখে যাবেন না । একজন খলিফা মনোনয়ন করুণ।অন্যথায় আমি অমঙ্গল ও সমস্যার আশংকা করছি।”
প্রশ্ন হলো ইসলামী উম্মাহকে নেতাবিহীন অবস্থায় রেখে গেলে যেখানে মা আয়েশা অমঙ্গল ও সমস্যার আশংকা করেণ সেখানে রাসুল (সা) তার নিজের তিল তিল করে গড়া ইসলামী উম্মাহকে কিভাবে নেতাবিহীন অবস্থায় রেখে যান ? মা আয়েশা কি রাসুল (সা) এরচেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন ?
যাইহোক, কমিটিতে তিনি আলী ইবনে আবু তালিব, উসমান ইবনে আফফান, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, জুবায়ের ইবনে আওয়ান, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহকে সদস্য মনোনীতি করলেন।তিনি পরামর্শক কমিটিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করালেন যেন তার মৃত্যুর তিনদিন পর তাদের মধ্য হতে একজনকে খলিফা হিসাবে নিয়োগ করেণ এবং এ তিনদিন সুহাইব খলিফার কাজ চালিয়ে যাবে। আলীর যোগ্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা সত্বেও উমর পরামর্শক কমিটি গঠন করেছিলেন।তার উদ্দেশ্য ছিল খেলাফত যেন তার ইচ্ছার অনুকুলে যেতে পারে ( অর্থাৎ আলীকে বঞ্চিত করা) ও সেভাবেই তিনি পরামর্শ কমিটি মনোনয়ন ও কার্যপ্রণারী নির্ধারণ করেছেন। একজন সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরও একথা বুঝতে অসুবিধা হবে না যে, কমিটি গঠন ও কার্যপ্রণালী নির্ধারণের মধ্যেই উসমানের জয়ের সকল উপাদান নিহিত ছিল। কমিটির সদস্যগণের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় আব্দুর রহমান ইবনে আউফ উসমানের ভগ্নিপতি, সাদ ইবনে ওয়াক্কাস আব্দুর রহমানের আত্মীয় ও জ্ঞাতি এবং সে সর্বদা আলীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত। তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ ওসমানের প্রতি অনুরক্ত ছিল এবং সেও আলীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত কারণ সে তায়েমী গোত্রের। আবু বকরের খেলাফত দখলের ফলে তায়েমী ও হাশেমীয় গোত্রের মধ্যে সম্পর্ক ভাল ছিল না।এমতাবস্থায় জুবায়ের আলীল পক্ষে ভোট দিলেও উসমানের জয়ের জন্য তার একটি ভোট কোনো বাধা হয়ে দাড়ায় না। কেউ কেউ লিখেছেন, পরামর্শক কমিটির বৈঠকের দিন তালহা মদিনায় উপস্থিত ছিলেন না। তার অনুপস্থিতে তাকে যদি আলীর পক্ষেও ধরা হয় তবুও উসমানের জয় অনিবার্য ! কারণ উমর তার বিচক্ষণতা দিয়ে কমিটির যে কার্যপ্রণালী নির্ধারণ করে দিয়েছে তাতে উসমানের জয় সুনিশ্চিত। কার্যপ্রণালীটি নিম্নরুপঃ
যদি দুজন সদস্য একজন প্রার্থীর পক্ষে যায় এবং অপর দুজন সদস্য অন্য এক প্রাথীর পক্ষে যায় তবে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর মধ্যস্থতা করবে।আব্দুল্লাহ যে পক্ষকে নির্দেশ দিকে সে পক্ষ থেকে খলিফা নিয়োগ করা হবে।আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের রায় যদি তারা মেনে না নেয় আব্দুর রহমান ইবনে আউফ যার পক্ষে থাকবে আব্দুল্লাহ সে পক্ষকে সমর্থন করবে এবং অপরপক্ষ এ রায় অমান্য করলে তাদের মাথা কেটে হত্যা করতে হবে। ( তারাবি ১ম খন্ড, পৃঃ ২৭৭৯-২৭৭৮০, অছীর ৩য় খন্ড, পৃঃ৬৭)
এখানে আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের রায়ে অসম্মতির কোনো অর্থ হয় না কারণ অসম্মতি জানালেও আব্দুর রহমান ইবনে আউফ যে পক্ষে থাকবে সে পক্ষকে সমর্থন করার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে উমরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আর সে পক্ষ থেকেই খলিফা নিয়োগ করা হবে। তাই আব্দুর রহমানের আদেশের অপেক্ষায় পঞ্চাশটি রক্ত পিপাসু লোক তরবারি নিয়ে প্রস্তুত ছিল বিরোধী পক্ষকে হত্যা করার জন্য।
অবস্থাদৃষ্টে আলী তার আগেই চাচা আব্বাসকে বলেছিলেন, উসমান খলিফা হতে যাচ্ছে কারণ উমর সে পথ পরিস্কার করে দিয়ে গেছে।
যাইহোক, উমরের মৃত্যুর পর আয়েশার ঘরে নির্বাচনী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সভা চলাকালে আবু তালহা আল আনসারীর নেতৃত্বে পঞ্চাশজন লোক উন্মুক্ত তরবারী নিয়ে দাড়িয়ে ছিল।তালহা সভার কার্য শুরু করলেন ও উপস্থিত সকলকে সাক্ষী রেখে উসমানের পক্ষে ভোট প্রদান করলেন। এতে জুবায়েরের আত্ম সম্মানে আঘাত লাগে কারণ তার মা ছিল আব্দুল মুত্তালিবের কন্যা ও আলীর ফুফু। তাই তিনি আলীর পক্ষে ভোট প্রদান করলেন। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস তার ভোট আব্দুর রহমানের পক্ষে প্রদান করল। এতে তিনজনই প্রত্যেকে এক ভোট করে পেয়ে সমান হল।সুচতুর আব্দুর রহমান একটি ফাঁদ পেতে বলল, আলী ও উসমান তাদের দুজন থেকে একজনকে খলিফা মনোনীতি করার ভাড় যদি আমার উপর অর্পণ করে তাহলে আমি আমার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করব অথবা তাদের দু’জনের যে কোনো একজন প্রাথীতা প্রত্যাহার করে খলিফা মনোনয়ন অর্জন করতে পারে। আব্দুর রহমানের এ ফাদ আলীকে সবদিক দিয়ে জড়িয়ে ধরল। কারণ এ প্রস্তাবে হয় তাকে নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়ে খলিফা মনোনয়ন করতে হবে, না হলে আব্দুর রহমান ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে যা করবে তাই মেনে নিতে হবে। কিন্তু নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়ে উসমান অথবা আব্দুর রহমানকে খলিফা মনোনীতি করা আলীর পক্ষে সম্ভব ছিল না।প্রথম হতে বঞ্চিত হয়েও তিনি কখনও তার অধিকার ছেড়ে দেননি।কাজেই তিনি এবারও নিজের অধিকার আকড়ে ধরলেন।
সুতরাং আব্দুর রহমান নিজ মনোনয়ন প্রত্যাহার করে খলিফা নিয়োগর দায়িত্ব অর্জন করল এবং আলীকে বললেন, “আপনি যদি কোরান, সুন্নাহ ও পুর্ববর্তী দুই খলিফার রীতি নীতি ও কর্মকান্ড মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেন তাহলে আমি আপনার বায়াত নেব।”
প্রত্যুত্তরে আলী বললেন, আমি কোরান ও সুন্নাহর আলোকে আমার বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করব।তিনি তিনবার জিজ্ঞাসিত হলেন ও তিনবারই একই উত্তর দিলেন। এরপর আব্দুর রহমান উসমানকে বললেন, আপনি কি শর্তগুলো মেনে চলতে পারবেন ? উসমান খুশিচিত্তে তা মেনে নিলেন এবং আব্দুর রহমান তার বায়াত গ্রহন করল। আলীর দাবি ও অধিকার পদদলিত হলে তিনি বললন,
এটা প্রথম দিন নয় যে তোমরা আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছো।আমাকে শুধু ধৈর্য ধারণই করতে হবে।তোমরা যা কিছু বল আল্লাহ তার বিরুদ্ধে সাহায্যকারী। আল্লাহর কসম তুমি এ আশা ব্যতিত উসমানকে খলিফা বানাওনি যে সে তোমাকে খেলাফত ফিরিয়ে দিবে। এরপর আলী দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ”আল্লাহ তোমাদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করুণ।” পরবর্তীতে তাই হয়েছিল। দুজনের দুজনের শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। মৃত্যু পর্যন্ত কেউ কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলেননি।
যাহোক, স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, শুরা বলতে প্রথমত ছয়জন, তারপর তিনজন ও অতঃপর একজনকে বুঝিয়েছে কি ? পূর্বের দুই খলিফার কর্মকান্ড মেনে চলার শর্ত কি খলিফা উমর আরোপ করেছিলেন ? নাকি আলী ও খেলাফতের মধ্যে পর্দা টানতে আব্দুর রহমান এ চাল চালিয়েছিলেন ? তাহলে আরো প্রশ্ন জাগে, প্রথম দুই খলিফা কি কোরান ও সুন্নাহ অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করেণনি ? যদি করতেন তাহলে আলী আব্দুর রহমানের শর্ত মানলেন না কেন ? কারণ আলী তো বারবার বলেছেন, তিনি কোরান ও সুন্নাহ অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন ! তাছাড়া কোরান ও সুন্নাহর সাথে দুই খলিফাকে অনুসরণের যৌক্তিকতা কী যদি দুই খলিফা কোরান ও সুন্নাহ অনুসারেই শাসনকার্য পরিচালনা করে থাকেন ?
চিন্তাশীল মানুষজন চিন্তা করবেন। বিবেক দিয়ে ভাবুন। যারা চিন্তা করতে জানে না বিবেককে কাজে লাগায় না তার চিরজীবন অন্ধকারেই দেখবেন। ধন্যবাদ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


