
বাংলা রূপান্তর ©
'অনেক ভালো ভালো জেলে আছে । তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনতো খুবই বিখ্যাত । এসব আমি জানি। কিন্তু মাছ শিকারের কলাকৌশলে তোমার তুল্য কেই নাই ' - বলে বালকটি।
'ধন্যবাদ। শুনে খুশি হলাম। আমাদের কলাকৌশলকে ফাঁকি দিতে পারে এমন মাছের জন্ম হয় নি।'
'না, এমন মাছের জন্ম হয় নি, তবে তোমার শরীরের শক্তি যদি তোমার মনের জোরের সাথে পাল্লা দিতে পারে' - বলল বালকটি।
'হতে পারে বয়সের কারণে আমার শারীরে শক্তি অতটা নেই। তবে আমি অনেক কলাকৌশল জানি আর আমার মনোবল আর সাহস অনেক বেশি' - বলল বুড়ো।
'তোমার এখনই ঘুমিয়ে যাওয়া দরকার। আরাম করে একটা ঘুম দিলে সকালে অনেক তরতাজা হয়ে উঠবে। আমি তোমার মালপত্র পৌঁছে দিয়ে আসবো।'
'এখন তাহলে শুভরাত্রি। সকালে তোকে আমি জাগিয়ে দিবো। '
'তুমি তো আমার এলার্ম ঘড়ি' - কৌতুক করলো বালক।
'আর আমার এলার্ম ঘড়ি হলো আমার বয়স। আচ্ছা বলতে পারিস, বুড়োদের ঘুম এতো কম হয় কেন? সকাল সকাল উঠে একটি দীর্ঘ দিন লাভের জন্য কি?'
'আমি জানি না। আমি শুধু জানি যে ছোট ছেলেরা দেরিতে ঘুমায় আর বেঘোরে ঘুমায়' - বলল বালকটি।
'হুম, ছেলেবেলার সেসব কথা এখনও আমার মনে পড়ে। যাক আমি তোকে সময়মত জাগিয়ে দেবো' - বলল বুড়ো।
'আমি চাই না আমার নৌকার মহাজন আমকে জাগাক । এটা আমার জন্য অপমানজনক। আমার ভালো লাগে না' - বলল বালকটি।
'আমি জানি।'
'ভালোমত ঘুমাও। আমি গেলাম' - বলে বালকটি বুড়োর কুটির থেকে বের হয়ে গেলো।
খাওয়ার সময় তাদের টেবিলে কোনো বাতি ছিল না। ছেলেটি চলে যাওয়ার পর বুড়ো অন্ধকারের মধ্যে তার পরনের পাজামাটি খুলে খবরের কাগজটি ভিতরে দিয়ে সেটাকেভাঁজ করে বালিশ বানিয়ে নিলো। তারপর কম্বলটি গায়ে পেঁচিয়ে শুয়ে পরলো। অমসৃণ খরখরে বিছানায় চাদর হিসেবে ছিল আরও কিছু পুরনো খবরের কাগজ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বুড়ো গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো। ঘুমের মধ্যে ফিরে এলো তার ছেলেবেলায় দেখা আফ্রিকা। সেই দীর্ঘ সৈকত। সোনালী ও সাদা বেলাভূমি। চকচকে সাদা বেলাভূমি চোখ ধাঁধিয়ে দিতো। উঁচু অন্তরীপ আর বিশাল সব বাদামি পাহাড়। বুড়ো এখন ঘুমুলেই চলে যায় সমুদ্র সৈকতে। এখন প্রতি রাতেই তার স্বপ্নগুলোতে থাকে সমুদ্র-তরঙ্গের গর্জন আর সেই তরঙ্গে ভেসে আসা তার চির চেনা জেলে নৌকা। ঘুমের মধ্যেও সে নৌকার তলা থেকে আসা আলকাতরার গন্ধ পায়। সেসময়ে আফ্রিকার উপকূলে ছুটে চলা সকালের বাতাসে ভেসে আসা গন্ধটা সে এখনো ঘুমের মধ্যে পায়।
একটা বাতাস আছে যেটা স্থল থেকে সমুদ্রের দিকে ছুটে যায়। ভোর রাতে সমুদ্রের দিকে ছুটে চলা সেই বাতাসের গন্ধ বুড়ো টের পায়। সাধারাণত সেই গন্ধেই তার ঘুম ভাঙ্গে। কিন্তু আজ যখন স্বপ্নে সেই গন্ধটা পেলো বুড়ো যেন ঠিকই বুঝতে পারলো যে এটা স্বপ্ন। তাই যেন সে ঘুম থেকে না জেগে তার স্বপ্ন দেখাটা চালিয়ে গেলো আর বিভোর হয়ে দেখতে থাকলো সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে উঠে আসা দ্বীপে চূড়াগুলো। তারপর সে দেখতে থাকলো ক্যানারী দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন বন্দর, পোতাশ্রয় আর রাস্তাঘাট।
সে এখন আর ঝরের স্বপ্ন দেখে না, দেখে না কোনো নারী কিংবা মহৎ কোনো ঘটনার স্বপ্ন। তার স্বপ্নে এখন আর থাকে না বড় বড় মাছ, যুদ্ধ কিংবা শক্তিমত্তার প্রদর্শন। এমনকি তার স্ত্রীকেও এখন আর স্বপ্নে দেখে না। তার স্বপ্নে এখন কেবল ভূ-দৃশ্য আর সমুদ্র উপকূলে বিচরণরত সিংহ। যেন সন্ধ্যার আলো আঁধারীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট বিড়াল ছানা। সেগুলোকে সে ভালবাসে যেমন ভালোবাসে বালকটিকে। অথচ বালকটিকে কিন্তু সে কখনও স্বপ্নে দেখে নি।
এক সময় ঘুম ভাঙলো বুড়োর। খোলা দরজা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদটা দেখলো। ভাঁজ করা পাজামার ভাঁজটা খুলে পরে নিলো। তারপর কুটিরের পাশেই প্রশ্রাব শেষ করে বালকটির বাড়ির পথ ধরলো তাকে জাগানোর জন্য। সকালের ঠান্ডা বাতাসে বুড়ো কাঁপছিলো। কিন্তু সে জানে যে, কিছুক্ষণ পর দাঁড় বাওয়া শুরু করলেই তার শীত চলে যাবে।
চলবে...............................
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুলাই, ২০১৪ সকাল ১০:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




