অবশেষে ক্লান্ত শ্রান্ত অবসন্ন আমি বাড়ি ফিরলাম। এ আমি হইত আমি, অথবা টি ভি ক্যামেরার সামনে আমার মত অসংখ্য মানুষ, যারা (সবাই হয়ত নয় তবে অধিকাংশ) ১০ দিন পর জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবেনা চলতি বাংলা মাসের তারিখটি, প্রশ্ন টা বেমালুম সাধারন ও নেহায়েত গোবেচারা!! যেখানে গ্রেগরিয়ান দাপটে রোমান অনেক আগেই বিদায় সেখানে আপাত নিরীহ ও সাধারণ ফসলি সন মনে রাখা এ ডিজিটাল যুগে সত্যি বেমানান।
আমার দাদি এবং অতি সাম্প্রতিক আমার মামা ও বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ হিসেব করে যাবতীয় কাজ করতেন অথবা প্লান করতেন, আমি অসব বুঝতামনা বা বোঝার চেষ্টা টাও করতাম না, কেবলি বুঝতাম ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ফাইনাল পরীক্ষা শেষ, হাল্কা হাল্কা শীত আর দাদা বাড়ি যাওয়ার প্রহর গোনা। হলদে সর্ষে খেতের আলে ছোট ছোট খেজুর গাছে মাটির ঠিলা, আমার ছোট ছোট চাচাত ভাইদের সাথে পাটখড়ির নল বানিয়ে রস চুরির মহড়া- পরে বুঝেছি ওটা পৌষের বিকেল ছিল। দাদা বাড়ির বিকেলগুলো মৌ মৌ করে উঠত ছোলা পোড়ানোর গন্ধে, শহুরে লেখাপড়ার টেবিল থেকে ওই বিকেল গুলো ছিল বহুদুর। তারপর জ্যৈষ্ঠের শেষে আবার দাদা বাড়ি, পাকা আমের আহ্বান!!
বৈশাখ বলতে মনে পড়ে বাবার হাতধরে মিষ্টি খাওয়ার লোভে হালখাতা খেতে যাওয়া, নিশিনাথ তলার মাস জুড়ে শনি-মঙ্গল বারের মেলা, আর কালে ভদ্রে টিনের ফুটো দিয়ে বিনে পয়সার সোনার বাংলা সার্কাস।
তখনও বাংলা মাসের হিসেব মনে রাখার মত কোন কারন ঘটেনি। বিপত্তিতা বাধল বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে, ঠিক ভোল পাল্টে সাধু সাজার মতন।
অতি সম্প্রতি বৈশাখের আকার ও প্রকৃতি যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে তাতে কিছু কিছু প্রস্ন ও সংশয় সামনে আসে বৈকি! এখানে পক্ষে অথবা বিপক্ষে বলার অভিপ্রায়ে নয় আমরা আসলে কোথায় যাব সেটাই ভাবনার বিষয়।
আজ ও গতকালের পত্রিকা ও টি ভি তে কিছু মতামত বিষয়টাকে আরও জটিল ও ভাবনার বিষয় করে তুলেছে। আজকের প্রথম আলোর বিশেষ সংখ্যায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, "তার কিছু সহকর্মী ও বন্ধুদের দ্বিমত সত্তেও অতি সাম্প্রতিক ইলিশ - পান্তার প্রচলনকে তিনি দোষের কিছু দেখছেন না, বরং ভোজন নাকি উৎসবের একটা অনুষঙ্গ।" কাল কোন একটা চ্যানেলে দেখলাম অধ্যাপক মঞ্জুরুল ইসলাম বলছেন যে, "ইলিশ - পান্তার এ নব্য প্রচলন এক অর্থে বাংলাদেশের কৃষক সমাজকে অপমান করার নামান্তর। কৃষকদের ফসল বোনা ও উত্তোলনের সুবিধারতে যে সনের প্রচলন, কালের বিবর্তনে তা এখন প্রহসনে পরিনত হচ্ছে।" ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু অধ্যাপক দু রকম মন্তব্য করছেন এবং তারা সাদা দল বা অতি জামাতিও নন। বিষয়টা ভাবনার দাবি রাখে।
এবার আসি বাংলা সংস্কৃতির শেকড়ের দিকে।
ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের ইতিহাসের শুরু ধরা হয় আর্যদের আগমন দিয়ে, তার আগে অনার্যদের ইতিহাস স্বীকৃত নয়, অনেকটা পৌরনিক। তবে ৫ হাজার আগেকার ইতিহাস মোটামুটি স্বীকৃত। আদি ভারতীয়দের উপর আর্যরা এমন প্রভাব বিস্তার করে যে অনার্যদের নিজস্বতা ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে শূদ্র ও আরও নিচু জাতের উদ্ভব হলে ব্রাহ্মণগনই আর্যদের সম্মান রক্ষার ভার নিজ কাঁধে তুলে নেয়। এভাবে চলেছিল ১ হাজার বছর। মৌর্য দের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত এটার ব্যত্যায় হয়নি। তারপর এই অঞ্চলে বৌদ্ধদের আধিপত্য কেমন ছিল তা সবায় জানে, বরং এটায় আশ্চর্যের যে এই অঞ্চল থেকে বুদ্ধের একতরফা বিদায়!
আবার সনাতন পৌত্তলিক শক্তির উদয় ঘটে সেন রাজাদের হাত ধরে। মধ্য ও দক্ষিন ভারতে এটা আবার জৈন ধর্মের ইতিহাস। পশ্চিম ভারতে এই ইতিহাস প্রাচীন পশতু, তুর্কি ও পারস্যের। সুতরাং ভারতে কোন কালচারের একক আধিপত্য কখনোয় ছিলনা। তবে সম্মিলিত রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি একক ও কেন্দ্রীয় শাসন লক্ষ্য করা যায় মুসলিম সুলতান ও মোঘল শাসনামলে।
সেই সুত্র ধরে বাংলার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একি ভাবে দেখা যাবে অনার্যদের বিতাড়িত একটা অংশ এখানে বসতি স্থাপন করেছিল। তবে বৌদ্ধ পূর্ব কোন বিশ্বাস যোগ্য ইতিহাস আমরা পায়না। চর্যাপদে আমরা কেবলি বৌদ্ধ সংস্কৃতিটায় পাই। সুতরাং সেখান থেকেই আমাদের শুরু করা উচিত। কৃষি উদপাদন ও কৃষি সমাজের কথা সেখানেও আছে। তারপর সপ্তদশ শতক থেকে মৌলিক সামাজিক গঠন শুরু হয়, সুলতানি আমলে পারস্য কালচার, মুঘল আমলে তুর্কি ও ইসলামি কালচার ও তদপরবরতি মিশ্রিত ও বিবর্তিত অনার্য কালচার মিলে নিশে তৈরি হয়েছিল অন্য এক কালচার যার পূর্ণতা পায় মধ্য যুগের বাংলা সংস্কৃতিতে। এই সময় আমরা দেখতে পায় গাজি কালু ছম্পাবতি ও বৈষ্ণব গীতি। দেখা যায় চণ্ডিদাস আবার দেখা যায় লাইলি - মজনু। সুতরাং জুগ পরম্পরায় কোন একক সংস্কৃতি এদেশে স্থায়ী হয়নি। বরং ইয়েমেন, ইরান, আফগান, আরব, তুরস্ক, বার্মা, থাইল্যান্ড এমনকি চীন থেকেও সংস্ক্রিতিক উপাদান এসেছিল। সে সবেরও প্রভাব আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে।
এবার আসি আধুনিক যুগে, নবাব জুগ যখন শেষ হয় তখন এখানকার জাতীয়তাবাদ ছিল অনেক টা ইসলামী রঙের। সেই প্রভাবটা এসেছিল আর আগেকার সুলতান ও মোঘল বাদসাদের কাছ থেকে। সেই প্রভাবেই ভাগ হল বাংলা দু বার। প্রথম বার এক্ক পক্ষ বিপুল বিক্রমে ভাঙ্গার বিরোধিতা করেছিল, আরেকবার সেই একি পক্ষ বিপুল উৎসাহে ভেঙ্গেছিল। সেই অশুভ শক্তি জোড়াসাঁকোর বাড়ি ঘিরে দানা বেধেছিল- টা বলার অপেক্ষা রাখেনা। বাংলা ভাগ ও ঢাকা বিঃ প্রতিষ্ঠা প্রচেষ্টার প্রতিবাদে কলকাতার হিন্দু সভার (১৯১৮, জুন) সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঘোষণা করলেন ঢাকায় বিঃ হতে দেয়া হবেনা। তারপরও হল, নবাব খাজারা করলেন। পাকিস্তান হল, সবায় হাপ ছেড়ে বাঁচল, এপার অপার হল, শুধু সহ্রাওয়ারদি কলকাতায় দাঙ্গা ঠেকাতে থেকে গেলেন, লাভ হলনা। যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে নববর্ষ করল, তাতেও সমস্যা। রবীন্দ্র সঙ্গিত বন্ধ।
.।.।.।.।.।.।.। তারপর ইতিহাস। ছায়ানট, উদীচী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট.। ইত্যাদি ইত্যাদি।
কথা হল, কিছুতেই বুঝতে পারছিনা, কিভাবে পান্তা ইলিশ আমাদের মধ্যে ঢুকল, মঙ্গল শোভা এল, হালখাতা গেল, দুর্গা পুজার ঢাকের বাজনা এল? ইতিহাসে কোথাও বাঙালি কালচার বলতে এসব পেলামনা, জুক্তিও পেলামনা। শুধু ব্রিটিশ সৃষ্ট আধুনিক হিন্দু কালচার কি সর্বজনীন বাঙালি কালচার- এ প্রশ্নের সথিক উত্তর পেলামনা, পাচ্ছিনা। আমাদের শেকড় এটা বলে কিনা তাও বুঝতে পারছিনা, অথবা আমাদের নিজস্ব কোন কালচার আদৌ আছে কিনা সেটা নিয়েই সংশয়ে পড়ে গেছি। আর আরও একটা প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে আমরা কি বাঙালি না বাঙালি মুসলমান? আর খাটি বাঙালি সংস্কৃতি কি আমাদের বন্ধু প্রতিম হিন্দুদের থেকে আগত?
আপাত আমি শিরোনামহীন। সবায় ক্লান্ত, এখন ঘুমের সময়, সবায় ঘুমাক। আর যারা কৃষক, যারা আজ সারা দিন টি ভিতে ঢাকার উপর চোখ রেখে বসে ছিল চায়ের দোকানে, তারাও ঘুমাক।
ঘুম সকলের জন্য শান্তির।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



