
ক্যারেন আর্মস্ট্রং তার ‘স্রষ্টার ইতিবৃত্ত’ বইতে লিখেছেন, ‘অলৌকিক বিষয়াদি দ্বারা এখন আর মানুষ পরিবেষ্টিত থাকে না ফলে অনেকেই ধর্মকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করতে পারছে। আমাদের বিজ্ঞানভিত্তিক সংস্কৃতি আমাদের চোখের সামনে থাকা ভৌত ও বস্তুজগতের দিকে মনোযোগ দিতে শেখায়’। মানে আমরা যখন অলৌকিক বিষয়ের মধ্যে থাকবো তখন আমাদের বিজ্ঞানমনষ্ক হওয়া সহজ হবে না। তবে আমরা বিজ্ঞানমনষ্কতা দিয়ে যাচাই করতে পারি অলৌকিকতাকে।
মহাভারতে কৃষ্ণ অর্জুনকে বহু উপদেশই দিয়েছেন। একটি উপদেশ এমন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি মিথ্যা কথা বলা সম্পূর্ণ ধর্মসম্মত। বিবাহ, রতিক্রীড়া, প্রাণবিয়োগ ও সর্বস্বাপহরণকারে এবং ব্রাহ্মণের নিমিত্ত মিথ্যা প্রয়োগ করলেও পাতক হয় না’। ব্রাহ্মণের হিতের জন্য মিথ্যাকথনকে কিভাবে সমর্থন করি। কৃষ্ণ অর্জুনকে সমস্ত জ্ঞাতিনিধনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করাই ছিল মূল লক্ষ্য। এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে কৃষ্ণ নিজে অসংখ্য ছলনার আশ্রয় নিয়েছিলেন। মহাভারত জুড়েই রয়েছে বহু ছলনা। উদাহরণ দিচ্ছি-

দ্রোণাচার্য আর একলব্যের বিষয়টি কি নৈতিক?
আমরা গুরুর প্রতি একনিষ্ঠ ভক্তির উদাহরণ দিয়ে একলব্যকে ধন্যবাদ দেই। তিনি গুরুদেব দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়েছিলেন যুদ্ধবিদ্যা শিখতে। একলব্য ক্ষত্রিয় ছিল না বলে তাকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হলেন না দ্রোণ। একলব্য দ্রোণকেই গুরু মেনে একমনে যুদ্ধবিদ্যা শিখতে লাগলেন। একদিন দ্রোণ যখন জানতে পারলেন তিনি একলব্যের মানসগুরু। তিনি ছলনার আশ্রয় নিলেন। গুরুদক্ষিণা হিসেবে একলব্যের হাতের বুড়ো আঙুল চেয়ে বসলেন যাতে তার ক্ষত্রিয় শিষ্যরাই বিজয়ী হয়।
জতুগৃহে পুড়িয়ে মারা কি নৈতিক?
দুর্যোধন পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার জন্য জতুগৃহ নির্মাণ করে সেখানে পাণ্ডবদের পাঠান। যুধিষ্ঠির আগেই জেনে যান ষড়যন্ত্রের কথা। তারা নদীতীর পর্যন্ত একটি সুড়ঙ্গ খনন করেন। পঞ্চপাণ্ডবের মা কুন্তি একটি ভোজসভার ব্যবস্থা করেন। নিষাদ জননী ও তার পঞ্চপুত্রদের আপ্যায়ন করে ঘরের মধ্যে রেখে আগুন লাগিয়ে দিয়ে তারা সুরঙ্গ পথে পালিয়ে যান। ঘরে থাকা নিমন্ত্রিত লোকেরা মারা যায়। তাদের লক্ষ্য ছিল- এতে দুর্যোধন আগুনে পুড়ে যাওয়া মৃতদেহ দেখে ভাববেন যে পাণ্ডবরা সবাই মারা গেছে।
দ্রৌপদীকে মিথ্যা পরিচয়ে বিয়ে করে পাঁচ ভাইর বউ বানানো কি নৈতিক?
রাজকন্যা দ্রৌপদীকে বিয়ে করার জন্য সয়ম্বরা সভায় শর্ত ছিল- শূন্যে ঘুরন্ত মাছের চোখে জলে প্রতিবিম্ব দেখে যে তীর বিদ্ধ করতে পারবে তাকেই স্বামীরূপে বরণ করবে। কর্ণ এই কাজ সম্পাদন করতে পারতেন। কিন্তু দ্রৌপদী আপত্তি করেন, সূতজাতকে বরণ করব না’। কুন্তির বিয়ের আগের পুত্র কর্ণ অর্থাৎ অর্জুনের সৎ ভাই। অর্জুন ছলনার আশ্রয় নেয়। নিজেকে ব্রাহ্মণপুত্র ঘোষণা দিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে এবং বিজয়ী হয়ে দ্রৌপদীকে বিয়ে করে নিয়ে আসে। কুন্তী বলে, যা এনেছো তাই পাঁচ ভাই ভাগ করে নেও। সে কথাতেই দ্রৌপদী হয়ে গেল পাঁচ ভাইর বউ।
অর্জুনের কি বনবাসের প্রতিজ্ঞা সম্পন্ন হয়েছিল?
যুধিষ্ঠির যখন দ্রৌপদীর সঙ্গে সহবাস করছিলেন তখন অর্জুন ঘরে ঢুকে পড়ে। অর্জন পূর্বশর্ত পালনের জন্য বারো বৎসর বনবাসের প্রতিজ্ঞা করে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি প্রথমে গঙ্গাদ্বারে গিয়ে নাগকন্যা উলুপীকে বিয়ে করলেন। এরপর মণিপুরে গিয়ে রাজকন্যা চিত্রাংগদাকে বিয়ে করে তিন বছর মণিপুর রাজপ্রসাদেই বাস করলেন। শেষে দ্বারকায় গিয়ে সুভদ্রাকে হরণ করে বিয়ে করলেন এবং এক বছর তার সঙ্গেই দ্বারকায় থাকলেন। এটাকি বনবাস হল?
ভীমের জরাসন্ধকে হত্যা কি নৈতিক ছিল?
জরাসন্ধ ছিলেন তখন সবচেয়ে পরাক্রমশালী রাজা। তিনি জীবিত থাকতে যুথিষ্ঠির পক্ষে রাজসূয় যজ্ঞ করা সম্ভব ছিল না। এর আগে কৃষ্ণ ও তার জ্ঞাতিরা জরাসন্ধের কাছে বারবার পরাজিত হয়েছেন। কৃষ্ণ, অর্জুন ও ভীম ব্রাহ্মণের বেশ ধরে পেছনের দরজা দিয়ে জরাসন্ধের রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে তার সামনে উপস্থিত হন এবং তারপর নিজেদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করে জরাসন্ধকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করেন। জরাসন্ধ তাদের এই ছলনার নিন্দা করলেও ভীমের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে সম্মত হন এবং চৌদ্ধ দিন ধরে যুদ্ধ চলাকালে কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুনকে নিরাপদে অতিথি হিসেবে নিজ প্রাসাদে রাখেন। ক্ষত্রিয়রীতিতে ক্লান্ত এবং যুদ্ধবিমুখ যোদ্ধাকে বধ না করে সময দেবার প্রথা ছিল। কিন্তু এরকম অবস্থাতেই কৃষ্ণের কুটিল ইংগিতে ভীম জরাসন্ধকে বধ করেন।
কৃষ্ণ কর্তৃক শিশুপালকে হত্যা করা কি নৈতিক ছিল?
যুধিষ্ঠির তার রাজসূয় যজ্ঞে কৃষ্ণকে শ্রেষ্ঠ অতিথি হিসেবে অর্ঘদান করেছিলেন। শিশুপাল এর বিরোধীতা করে বলেন, যেহেতু কৃষ্ণ রাজাও নন, ব্রাহ্মণও নন তাই এই অর্ঘ্য পাবার কোন অধিকার তার নেই। এছাড়া কৃষ্ণ অন্যায় উপায়ে জরাসন্ধকে বধ করেছেন। তাকে শ্রেষ্ঠ অতিথি করা যুধিষ্ঠির ধর্মাত্মা পরিচয়ই নষ্ট হল। যজ্ঞে উপস্থিত অনেক রাজাই শিশুপালকে সমর্থন করলেন। শিশুপালের সাথে কৃষ্ণের পূর্ব থেকেই শত্রুতা ছিল। সয়ম্বরা সভায় কৃষ্ণের স্ত্রী রুক্মিণীর পাণিপ্রার্থী ছিলেন শিশুপালও। কৃষ্ণ শিশুপালকে সুদর্শন চক্র দিয়ে শিরশ্ছেদ করেন।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কি কৃষ্ণ ও পাণ্ডবরা নৈতিক ছিল?
ভীষ্মকে পরাজিত করতে পারছিলেন না। ভীষ্মের মহানুভবতার সুযোগ নিয়ে তাকে বধের উপায় জেনে নিয়ে- স্ত্রীলোককে সামনে রেখে আড়াল থেকে অর্জুন শরাঘাতে ভীষ্মকে শরশয্যায় শায়িত করেন।
দ্রোণকেও পাণ্ডবরা পরাজিত করতে পারছিলেন না। কৃষ্ণ বললেন, দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা নিহত হয়েছে এমন সংবাদ পেলেই দ্রোণ যুদ্ধ থেকে বিরত হবে আর তাকে হত্যা করা যাবে। যুধিষ্ঠির উচ্ছকণ্ঠে ‘অশ্বত্থামা হত’ ঘোষণা করে অস্ফুট স্বরে ‘ইতি কুঞ্জর’ বললেন। এতে দ্রোণ অস্ত্র ত্যাগ করে যোগস্থ হলে তার শিরশ্ছেদ করা হয়। অথচ যুদ্ধের নিয়ম বন্ধনের সময় ঠিক হয়েছিল যে, অস্ত্রহীন কিংবা যুদ্ধে বিমুখ কোন ব্যক্তিকে আঘাত করা হবে না।
যুদ্ধের রীতি ছিল সূর্যাস্ত হলে যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। জয়দ্রথের পরাক্রম পাণ্ডবেরা সহ্য করতে পারছিলেন না। তখন কৃষ্ণ মায়া দ্বারা তমসা সৃষ্টি করে সূর্যকে আচ্ছন্ন করলেন। সূর্যাস্ত হয়েছে মনে করে যুদ্ধের রীতি অনুয়ায়ী জয়দ্রথ অস্ত্রসংবরণ করে আকাশের দিকে তাকালেন। আর সেই সুযোগে অর্জুন জয়দ্রথের শিরশ্ছেদ করলেন।
যুদ্ধের আরেকটি রীতি ছিল- অপরের সাথে যুদ্ধরত ব্যক্তিকে তৃতীয় কেউ আঘাত করবে না। কিন' সাত্যকিকে পরাজিত করে তার মুণ্ডচ্ছেদনে উদ্যত ভুরিশ্রবাকে অর্জুন আক্রমণ করলেন এবং কৃষ্ণের উপদেশে ভুরিশ্রবার ডানহাত কেটে ফেললেন। এর প্রতিবাদে ভুরশ্রবা অস্ত্র ত্যাগ করে যোগস্থ হলে অর্জুন নিয়ম ভঙ্গ করে তাকে হত্যা করে।
কর্ণ যখন নিরস্ত্র অবস্থায় রথ থেকে নেমে মাটিতে বসে যাওয়া রথের চাকা তুলবার চেষ্টা করছিলেন, তখন অর্জুন কৃষ্ণের পরামর্শে আবার যুদ্ধের নিয়মভঙ্গ করে শরাঘাতে তাকে বধ করলেন।
ভীম ও দুর্যোধনের মধ্যে গদাযুদ্ধ চলছিল। কৃষ্ণ বললেন, ন্যায় যুদ্ধে দুর্যোধনকে পরাজিত করা যাবে না। তখন অর্জুনের ইংগিতে দুর্যোধনের উরুভেঙ্গে দেয়া হয় যুদ্ধের নিয়ম লংঘন করে।
দুর্যোধন কৃষ্ণকে দোষারোপ করলে তিনি বলেন, কৌরব বীরগণ অসাধারণ সমরবিশারদ ও ক্ষিপ্রহস্ত ছিলেন এবং পাণ্ডবেরা কখনো তাদের ন্যায়যুদ্ধে পরাজিত করতে পারতেন না। আমি যদি ঐরূপ কুটিল ব্যবহার না করতাম তাহলে তোমাদিগকে জয়লাভ, রাজ্যলাভ ও অর্থলাভ কখনই হইত না।
এখানে স্পষ্ট যে কৃষ্ণ ও পাণ্ডবরা ন্যায়যুদ্ধ করেননি। এটা স্পষ্ট হয় তারা একটি মহাকাব্যের চরিত্র বলেই এমনটা করতে পেরেছেন। তাই প্রমাণও করা হয় যে মহাভারত অবশ্যই মহাকাব্য- যেখানে ছলনা ও শঠতা থাকবে, যুদ্ধ জয়ের জন্য মিথ্যাচার ও প্রতারণা থাকবে।
তথ্যসূত্র:
মহাভারত- বেদব্যাস
স্রষ্টার ইতিবৃত্ত- ক্যারেন আর্মস্ট্রং
মহাকাব্য ও মৌলবাদ- জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


