পর্ব -দুই
ছেলেকে এইভাবে বাথরুম এর দরজায় রক্তমাখা অবস্থায় পরে থাকতে দেখে বাবার এর অজ্ঞান হওয়ার মত অবস্থা হলো l চিত্কার চেচামেচি শুরু করলো করলো হাহাকার এর মত করে আলিফ আলিফ বাবা বলে হাত ধরে পালস দেখল, হার্টবিট আছে।
ও যাক হার্টবিট আছে বলে জোরে চিত্কার দিল উত্তেজনায়, তারপর দপ্তরীর দিকে ফিরে এক কড়া ধমকের সুরে বলল " কি ধরনের দায়িত্বহীনের মত কাজ কর তুমি, তোমার স্কুল, তোমার প্রিন্সিপাল, তোমার দরজা বন্ধ করার আগে একবার সব কিছু চেক করা উচিত ছিল না?
সরি স্যার এরকম এই প্রথম হলো , কখনো তো এরকম হয়না, আজকে একঘন্টা আগে ছুটি হওয়াতে এই গন্ডগোল টা হইলো স্যার।
এটা কোনো কথা হলো, বাচ্চার মুখে রক্ত মারের দাগ এসব কিভাবে হলো, তোমরা বাচ্চাদের খেয়াল করে রাখবেনা l
তিনি স্বভাবে অনেক শান্ত মেজাজ এর ভদ্র মানুষ, কারো সাথে চেচামেচি করার অভ্যাস কখনো নাই, কিন্তু আজকে ছেলেকে এই অবস্থায় দেখে জ্ঞান শুন্য এর মত হয়ে গেছে l তাড়াতাড়ি ছেলেকে পাজাকোলা করে গাড়িতে উঠালো, ইশ এখন ড্রাইভার দরকার ছিল, আলিফ ধরে রাখতে হবে।
ফোন করার চেষ্টা করলো পিজি হাসপাতাল এর ইমার্জেন্সি তে, তার হাত থেকে ফোন পড়ে গেল হাতের কাপুনিতে.। হে আল্লাহ আমার ছেলেটাকে ঠিক রেখো, ভিতরে সে ফুফিয়ে উঠল।নিয়ে
দপ্তরী এসে তার হাত ধরল,
স্যার আমি পিছনে ভাইয়া রে নিয়া বসি, আপনি তাড়াতাড়ি গাড়ি চালান, অ্যাম্বুলেন্স এর জন্য অপেক্ষা করলে দেরী হইব স্যার , হাসপাতাল কাছে আছে চলেন।
দুজনে আলিফ কে নিয়ে রওয়ানা করলো হাসপাতাল এর দিকে, গাড়ি ছুটল ঝড়ের গতিতে।
আলিফ এর মা অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে আলিফ আর বাবা এর জন্য, দুজনের চারটার মধ্যে বাসায় চলে আসার কথা , এখন বাজে ছয়টা , অশান্তি আর অস্ত্থিরতায় সে বারান্দায় পায়চারী করছে, যতবার ফোন করছে বার বার, কেন যে ফোন ধরছেনা l।টেনশন আর ধরে রাখতে পারছেনা তিনি ।
তোর বাবা ফোন ধরছেনা কেন রে? মেয়ের ঘরে এসে জিজ্ঞাসা করে, এই মেয়েটার যে কি হয়েছে সারাক্ষণ মুখ ফুলিয়ে থাকে।
এই তুই কি ঠিক আছিস, সারাক্ষণ মুখ গম্ভীর দেখি কেন? ভাত ও তো খেলিনা কলেজ থেকে এসে
বাবা র সঙ্গে নিচ্চয় ঝগড়া করছ, এইজন্য বাবা রাগ করে ফোন ধরছেনা, বলে একটু হাসলো মেয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে ।
যাক মেয়ে ঠিক ই আছে মা নিচ্চিন্ত বোধ করলো , সে ও হেসে জবাব দিল তোর বাবা আর আমাকে ঝগড়া করতে দেখেছিস পাজি মেয়ে ।
দেখত ফোন করে পাস কিনা, আমি এর মধ্যে দশবার ফোন দিলাম, আমাকে তো একবার ফোন দিবে যত বিজি থাকুক
ও মা বাবার তো আলিফ কে নিয়ে শপিং এ যাওয়ার কথা,
তাই বলে কি ফোন ধরবেনা, কোনদিন এমন হয়নি যে তোর বাবা আমার ফোন পিক করেনি ,
জানি তুমি বাবার লাইলী, শিরি জান প্রাণ সব বলল মেয়ে কৌতুকের স্বরে ।
মারব থাপ্পর বাবা মার সাথে এভাবে মজা করে, মা ও মজা করে চুল টেনে দিল মেয়ের ।
বাবা হাসপাতাল এসেছে প্রায় পচিশ মিনিট হয়ে গেল, সে পাগল এর মত ছোটাছুটি করছে, কোনো ডিউটি ডাক্তার নাই, একজন নার্স কাম রিসেপশনিস্ট এর মত বসে আছে, সে অনবরত ফোন এ কার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে ,। দুইবার সামনে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করে ও পারেনি, সে হাত ইশারা করে বুঝাতে চাইল একটু পড়ে শুনছি।
আর বলিসনা তোর ভাই এর যে পেট হইছে তারপর খাওয়া দাওয়া র কোনো কন্ট্রোল নাই, প্রতিদিন টেবিল এ মাংশ লাগবে, ওপাশে অন্য জন কিছু বলছে আর সে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে ।
তিনি আর ধৈয্য ধরে রাখতে পারলনা, সে গিয়ে নার্স এর সামনে ডেস্ক এ জোরে হাত দিয়ে শব্দ করে বলে ফেলল , তোমাকে পে করা হচ্ছে কাজ করার জন্য, ফোন এ গল্প গুজব এ মেতে থাকার জন্য না , সে জোরে চিত্কার করে ধমকের সুরে কথা বলতে লাগলো।
so irresponsible careless আমাদের হাসপাতাল এর ডাক্তর নার্স, একজন মানুষ মারা যাচ্ছে, তাদের কোনো ফীলিংস নেই.।
তার চেচামেচিতে আশেপাশে নার্স , ওয়ার্ড বয় রা উকি ঝুকি মারতে লাগলো.।
নার্স ভয় পেয়ে গেল এবার , তাড়াতাড়ি ফোন এর ওপাশে ব্যক্তিকে বলল পরে ফোন দিচ্ছি বলে ফোন কেটে দিল, একটা ফর্ম বাড়িয়ে দিল, এটা ফিল আপ করুন আগে.।
এবার ওনার এর মাথায় পুরা আগুন ধরে গেল , সে বিরাট এক ধমক দিল, নার্স টা কেপে গেল , কবে হবে তোমাদের সেন্স, দেখো ও আমার ছেলে , ও একঘন্টা ধরে অজ্ঞান, ব্লিডিং হচ্ছে, তুমি স্টুপিড আমাকে ফর্ম দিচ্ছ ফিল আপ করার জন্য.। আগে আমার ছেলেকে এডমিট কর, ফার্স্ট এইড এর ব্যবস্থা কর, আমি তো চলে যাচ্ছিনা, ফর্ম ফিল আপ করতে পারব.।
সরি স্যার এটা রুলস এর কারণে , আপনার টেনশন বুঝতে পারছি, দেখি তাড়াতাড়ি কি করা যায়
ফোন এ কাকে বলল "নিতাই তাড়াতাড়ি স্ট্রেচার নিয়ে অস, সঙ্গে ইমার্জেন্সি ফার্স্ট এইড ..কুইক
এবার খুব শোরগোল সুরু হয়ে গেল হাসপাতাল এ ওয়ার্ড বয় এবং দুজন এসে তাড়াতাড়ি স্ট্রেচার এ আলিফ কে শুইয়ে দিল, তাড়াতাড়ি এমার্জেন্চি তে নিয়ে ব্যান্ডেজ করলো, আলিফ এখন ও অচেতন, একই সঙ্গে সালাইন আর অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে দেওয়া হলো.।
বাবা হাউ মাউ করে কিছুক্ষণ কাদলো, মাথা নিচু করে একমনে দোয়া করতে করতে শুনলো কেউ একজন ডেকে কিছু বলছে
তাকিয়ে দেখে ফ্রন্ট ডেস্ক এর সেই রিসেপশনিস্ট তার হাতে এক কাপ কফি আর প্লেট কিছু সিঙ্গারা সমুচা , মেয়েটি বলল নিন কফি টা খেয়ে নিন, নিচ্চয় কাজ থেকে সরাসরি ছেলের স্কুল এ গিয়েছেন , রিলাক্স হওয়ার সুযোগ হয়নি ।
থ্যান্কস এখন খেতে পারবনা, প্লিস নিয়ে যান আসব
টেনশন করবেননা ডাক্তার চলে এসেছে, উনি দেখছেন এখন আপনার ছেলে কে , কিছুক্ষণের মধ্যে তার জ্ঞান ফিরে আসার কথা, আপনি ফ্রেশ হন, হাত মুখ ওয়াশ করুন ,আপনার ফামিলি কে জানিয়েছেন ?
ওহ মাই গড আমি ওদের কথা পুরাপুরি ভুলে গেছি, প্যান্ট এর পকেট হাতড়ে বের করে দেখল, অনেক বার বাসা থেকে ফোন , কিভাবে াআলিফ এর মা কে কে বলবে বুজতে পারছেনা , ভাবতে ভাবতে বাসার নম্বর ঘুরালো ।
এবার মা মেয়ে দুজনে অনেক টা পাগলের মত হয়ে গেল, এখন বাজে রাত নয়, এখন ও স্বামীর এবং আলিফ এর কোনো খবর নেই, তিনি একে একে স্বামীর এর যত কলিগ এর নম্বর তার কাছে আছে ফোন বুক এ সবাইকে ফোন করলো, সবাই খুব বিস্মিত কন্ঠে বলল উনি তো ৪ টার আগে বের হয়ে গেছেন আজকে অফিস থেকে l
আয়েশা আলিফ এর সব বন্ধু দের কে একে একে ফোন করলো কেউ কিছু বলতে পারলনা , একজন সৌরভ ও বলল আমি তো ওকে আমাদের গাড়িতে আসতে বলেছিলাম, ও বলল বাবার জন্য ওয়েট করছে l
দুজন একজন বারান্দায় আরেকজন সিড়ি তে গিয়ে বারবার দেখে আসছে l
হটাত দুজনকে চমকে দিয়ে টেলিফোন বেজে উঠলো জোরে ,
স্ত্রী হ্যালো বলতে শোনা গেল ওনার এর গলা , তার গলার স্বর অনেক ক্লান্ত, বিদ্ধস্ত মনে হছে, বাবার মনে হচ্ছে হাপাচ্ছে, তার হার্টবিট এর শব্দ পরিস্কার শুনতে পাচ্ছে স্ত্রী
কি হয়েছে মা প্রায় চিত্কার দিয়ে উঠলো, সে আর উত্কন্ঠা চেপে রাখতে পারলনা, তোমরা কোথায়? দুর্বলতা আর টেনশন এ বাবার এর হাত থেকে ফোন পড়ে গেল l
নার্স টি তাড়াতাড়ি ফোন নিয়ে বলল , আমি হাসপাতাল থেকে বলছি, আপনার স্বামী আর ছেলে এখন এই হাসপাতাল এ ।ফোন এ স্ত্রীর কান্নার আওয়াজ শুনে বাবা নার্স এর হাত থেকে ফোন নিয়ে বলল , কেয়া তোমরা খাওয়া দাওয়া করে দরজা ভালো করে বন্ধ করে শুয়ে পড়, আমি ঠিক আছি, আলিফ এর ছোট একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে স্কুল এ , আমি ওকে নিয়ে এখন হাসপাতাল এ.
এ তুমি কি বলতেছ কাদতে কাদতে মাটিতে বসে পড়ল সে , আয়েশা এসে ফোন ধরল
মা তুমি ফোন এর কাছে থেক, আমি কতক্ষণ পর পর খবর জানাব, তুমি তোমার মাকে খেয়াল কর, কোনরকমে বলল বাবা ।
বাবা কোন হাসপাতাল বল আমরা ও আসব, কথা শেষ না হতে ই মিজান এর ফোন কেটে গেল বা রেখে দিল.।
অজু করার পর একটু হালকা বোধ করলো, সে হাসপাতাল এর ভিতরে মসজিদ এ গিয়ে ইশা র নামাজ পড়ল, নামাজ পড়া শেষ করে সে মোনাজাত করতে করতে মনে হলো, আল্লাহ তার অলিফ কে সুস্থ ভাবে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরিয়ে দিবে তার কাছে, মনে এই assurance আসাতে সে অনেকক্ষণ পর বেশ নিচ্চিঁত বোধ করলো.।
আলিফ এর রুম এর কাছে আসতে জানালা দিয়ে দেখল সে কথা বলছে ডাক্তার এর সঙ্গে অল্প অল্প করে
দয়াময় আমার আল্লাহ , সেন্স ফিরিয়ে দিয়েছে আমার ছেলের.।
খুশিতে আবার ফোন করলো বাসায়, এর পরে আলিফ এর রুম এ ঢুকে পাশের বেড এ গভীর ভাবে ঘুমিয়ে পড়ল বাবা সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে.।
রাত দশটা। আলিফ এর জানালার পাশে কেও একজন এসে দাড়ালো। দেখতে চেষ্টা করল ভিতরের মানুষের উপস্থিতি। কাওকে দেখা যাচ্ছেনা। চারিপাশের পরিবেশ নিস্তব্ধ। সারা হাসপাতাল এ ঝিম ধরা একটা ভাব। জানালা খুলে ভিতরে লাপ দিয়ে নামল মুখোশধারী এক লোক।
(পরবর্তীতে )
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুন, ২০১৪ রাত ১০:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



