somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উল্লাসে বেদনা

০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শো খানেক লোক জোটলা হয়ে কি যেন করছে!!মাঝে মাঝে লোকের ভিড় থেকে ধর ধর মার মার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।নিশ্চই চোর ধরেছে।চোর পিটুনি দেখার জন্যই হয়তবা এত কৌতুহলী লোকের সমাগম!হঠাৎ করে ভিড়ের মাঝ থেকে বুটপড়া একজন দৌড়তে শুরু করলো।এবার নিস্তব্ধ ভিড় যেন ক্ষুধার্ত বাঘের মত ছুটতে শুরু করলো বুটপড়া মানুষটির পিছনে।কেউবা বাঁশ হাতে ছুটছে আবার কেউবা দা-কুড়াল,বটি হাতে ছুটছে।যেন সবারি চোখে মুখে প্রতিশোধের ক্ষোভ।এই বুটপড়া লোকটি ছিল আটকা পড়া এক পাকসেনা।

কিছুদূর যেতে না যেতেই সবাই যেন হুমড়ি খেয়ে পড়লো বুটপড়া লোকটির উপর।এখন শুধু মাইরের শব্দ আর বুটপড়া লোকটির আর্তনাদ কানে আসছে – "হামারে ছোটে ছোটে মাসুম বাচ্চে হে,আল্লাহকা নামপে হামারা জান্ বাকস দো"।

কে শুনে কার কথা!এখন শুধু প্রতিশোধের ক্ষোভ ছিল।জানের বদলা জান।কাউরো ভাই,কাউরো বাবা,কাউরো চাচাকে মেরেছে এই পাকসেনা।তাই সবার মাথায় শুধু প্রতিশোদের ক্ষোভ। জানের বদলা জান।
কিছুক্ষণ পর আর আর্তনাদ শোনা গেল না।

খবর আসলো পাশের পাড়ায় বড় আম গাছটাতে নাকি রাজাকার আলবদর বাহিনীর নেতাদেরকে ঝুলানো হয়েছে।পা উপরে মাথা নিচে করে ঝুলিয়েছে।মুক্তিফৌজের ছোট বড় সব সদস্য সেখানে উপস্থিত। শুধু মাইর আর মাইর। কারো আর্তনাদ সেদিন মুক্তিফৌজের মাইর আটকাতে পারে নি।আধমরা অবস্থায় মুক্তিফৌজ তাদের ছেড়েছিল বটেই কিন্তু সমাজের লাঞ্চনা তাদের পিছু ছাড়েনি।

সেদিন মুক্তিফৌজের সাথে যোগ দিয়েছিল হোসেন মিয়াও।লম্বা চওড়া মানুষ ছিলেন বটে।প্রায় ৫ ফুট ১৩ ইঞ্ছি কম ছিল না।এই লম্বা হওয়ার সুবাদে তাকে অনেক বিড়ম্বনাও পোহাতে হয়েছিল।এমনকি মুক্তিযোদ্ধা হয়েও মুক্তিফৌজের বন্দুকের গুলির সামনে দাড়াতে হয়েছিল তাকে।এমন বিড়ম্বনা!

মুক্তিফৌজের ক্যাম্পে কে যেন বলেছিল হোসেন মিয়া পাকি দালাল একটা।এই নিয়েই তুলকালাম কান্ড।সবাই নিমেশেই বিশ্বাস করল যেন।শুধুমাত্র লম্বার কারনে এই বিড়ম্বনা!

পাকিরাও লম্বা হোসেন মিয়াও লম্বা বেটা নির্ঘাত গোয়েন্দার কাজ করে।শেষমেষ তার কোমরে দড়ি লাগিয়ে গুলি করতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।এমন সময় ক্যাম্পের গৃহহীন,স্বজনহারা উতসুক জনতা হোসেন মিয়াকে যেন কটাক্ষ করে বলছিল-
হাতে ঘড়ি,
কোমরে দড়ি,
যাচ্ছে বেটা শ্বশুর বাড়ী!!
হোসেন মিয়া রাগে ক্ষোভে যেন স্বজাতির ভাইদের হতবুদ্ধিতে অবাক হচ্ছিল।লাইনে দাঁড় করেছিল তাকে গুলি করার জন্য।বন্দুক থেকে গুলিও বের হয়েওছিল ২ টা।কিন্তু হোসেন মিয়াকে নিঃশেষ করতে পারেনি তখনো।

এরি মাঝে একজন তড়িঘড়ি করে এসে বলতে শুরু করল –“আরে এতো হোসেন মিয়া!EPR বাহিনীতে ছিল।আমরাতো একসাথে মুক্তিফৌজের ট্রেনিং নিয়েছি।তোমাদের কোথাও ভুল হচ্ছে।থামাও এসব”।
এ যাত্রায় পার পেয়ে গিয়েছিল হোসেন মিয়া।

হোসেন মিয়ার পাশের বাড়ীর জহির বসির দিন সাতেক বন্দী ছিল পাক বাহিনীর জেলে।আজ ছাড়া পেয়ে ফিরেছে।তাই লোকে ভিড় করেছে তাদের বাড়ির উঠোনে।পাক বাহিনীর নির্মমতার কাহিনী শুনছে।জহির মিয়ার কানটা কেটে নিয়েছিল পাক বাহিনী।বসির মিয়াকে নাকি তারা দাড় করিয়েছিল বন্দুকের সামনে!চাকরির সুবাদে পরিচিতি এক সুবাকাঙ্ক্ষির মারফতে বেচে এসেছিল বসির।সে ছিল আর্মিতে।পাকিদের জয়ের জন্য মুক্তিফৌজে যোগ দেয়নি।কিন্তু তবুও পাক বাহিনী তাকে ছাড় দেয়নি।

কাছিম মোল্লার বাড়িতে কান্নার স্বর থামেনি এখনো।শহরে কাপড়ের দোকান ছিল কাছিম মোল্লার।দোকানের মালগুলো সরাতে গিয়েছিল শহরে।আর ফিরেনি সে।হয়তবা তাকেই সরিয়ে দিয়েছিল পাক বাহিনী!কাছিম্ মোল্লার বড় ছেলেটাও বেশ বড় হয়ে উঠেছে।এবার পাচে পা দিয়েছে।এইতো ক’মাস আগে মধ্যরাতে ঘুম থেকে উঠে চিল্লাতে শুরু করে-“আম্মা আম্মা পুয়া খাম,আম্মা আম্মা পুয়া খাম” ।
সেদিন তার কচি কন্ঠের আওয়াজ শুনে শরণার্থী শিবিরের ঘুম ভেঙ্গেছিল সবার।বড্ড জেদি ছেলেটা।

একটা মাস নাকি শহরটাতে বেশ তান্ডব চলেছে।পাক বাহিনী যাকে পেয়েছে তাকেই মেরেছে।তবে শহরের বিহারীপট্টিটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা।শোনা যায় রাতের আধারে তাদেরকে নাকি ট্রাকে করে নদীর ধারে নিয়ে যাওয়া হত।আর গুলি করে মারা হত।তাই তাদের সংখ্যাটা বেশ কমেছে!

চারিদিকে বিজয়ের উল্লাস।

এরি মাঝে বন্যপশুরা দেশ ছেড়েছে ঠিকই কিন্তু তাতে কি!!শকুনিরা তখনো আত পেতে বসে ছিল।বন্যপশু তাড়িয়ে যখন এদেশ স্বাধীন তখনি হামলা করলো শকুনিরা। ব্যাংকের দালালরা বেরিয়েছিল তাদের দেয়া লোন(ঋন) আদায় করতে।যখন সারা দেশে দুর্ভিক্ষ তখনি এই শকুনিদের হামলা!!

ওদিকে ইন্ডিয়ান আর্মিরা ফিরছে।সাথে যাচ্ছে মাল বোঝাই করা ট্রাকগুলো।রাতের আধারে দিনের আলোতে এদেশের অবশিষ্ট রত্নগুলো যেন কেউ লুট করছিল।যেন নিরবে অন্তঃসারশূন্য হচ্ছিল এদেশ।তখন প্রতিবাদীরা কেউ ছিলনা।যারা ছিল তারা বরাবরই নির্বাক শ্রোতা ছিল।আর যেই দু-একজন ছিল তারাও আবার কৃতজ্ঞ ছিল!!

যুদ্ধের ডামাডোল শেষ হতে না হতেই বসির মিয়া বিয়ের পিড়িতে বসলো।হয়তবা স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বিয়ে এটিই ছিল!গরুগাড়ী চেপে বরযাত্রী দল বের হল কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে।পথ অনেকটা।প্রায় একদুপুর পথ।

গরুগাড়ী চলছে।মাঝে মাঝে হেলে-দুলে উঠছে।পথ অনেকটা বাকি।পথের মাঝে বন্য পশুদের নির্মমতার চিহ্ন এখনো ছিল।পথের পাশে মানুষের লাশ।একটা নয় দুইটা নয় হাজারটা।কাক-কুকুর টেনে ছিড়ে খাচ্ছে।যেন লাল পিঁপড়ের স্রোত নেমেছে। লাশগুলো থেকে বিদঘুটে গন্ধ বের হচ্ছে। অনেকে লাশের গন্ধে নাক ঢাকছে।

সামনের গরুরগাড়ীতে চুলপাকা বয়ঃজ্যেষ্টদের আসর।সেই গাড়ীতে কথার শব্দ কম,যাবর কাটার শব্দ বেশি।কেউবা হাসিরসুরে বলছে –“অই মিয়া একটা আতর মাইরা(সুগন্ধি যর্দা) পান বানাইয়া দেনতো”!

এরিমাঝে দু-একজন বয়ঃজ্যেষ্টদের বিরক্তির স্বরে বলে উঠছে-"আর কতদুর? "
কেউবা সান্তনা দিয়ে বলছে "এইতো বগলেতে”(আর অল্প বাকি, সামনেই গন্তব্য)।

পাশেই মসজিদ।আজান শোনা যাচ্ছে।মুয়াজ্জিন আজ বেশ শ্রুতিমধুর কন্ঠেই আজান দিচ্ছে।গরুগাড়ী চলছে।মাঝে মাঝে হেলে-দুলে উঠছে।

দূরে একটা পুকুর।দুটো হাস সাতার কাটছে।আর আড় চোখে বার বার তাকাচ্ছে!
হয়তবা তারাও চিরায়ত বাঙালীর বেদনায় উল্লাস দেখছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:৩৭
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৫ আগস্ট-পরবর্তী ৩ দিনের বাংলাদেশ-

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৯



৫ আগস্ট-পরবর্তী ৩ দিনের বাংলাদেশ-

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বাংলাদেশ জুড়ে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তার ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। সংবাদমাধ্যম ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×